Thursday, 4 May 2017

মহারাজ পৃথ্বিরাজ চৌহান ও খাজা মইনুদ্দিন চিশতী (রঃ)

0 Comments
হযরত খাজা মইনুদ্দিন চিশ্তী (রঃ) সিস্তান রাজ্যের সন্জ্ঞর গ্রামে ৫৩৩ হিজরী ১১৩৮ ইংরেজি সালে জন্ম গ্রহন করেন।
উনার পিতার নাম গিয়াসুদ্দিন মাতার নাম সৈয়দা উম্মুল ওয়ারা।পরে স্বপরিবারে খোরাসান শহরে( বর্তমান আফগানিস্তান) হিজরত করেন।মাত্র ১৫ বৎসর বয়সে বাবামা উভয়কেই হারান।
একদিন নিজ জমিতে কাজ করে পরিশ্রান্ত অবস্তায় বিশ্রাম নিছিছলেন।এমন সময় সেখানে এসে উপস্হিত হলেন এক অচেনা আগন্তুক। কিশোর খাজা মইনুদ্দিন তাকে বাগানের কিছু আঙ্গুর এনে আপ্যায়ন করলেন। আগন্তুক ছিলেন আল্লাহর এক অলিআল্লাহ,হজরত ইব্রাহিম কান্দুযী(রঃ)।খুশী হলেন কিশোরের আপ্যায়নে।হাত তুলে দোয়া করলেন অনেকক্ষন।তারপর ঝুলি থেকে বের করলেন এক টুকরো শুকনো রুতি।রুটির একাংশ কিছুক্ষন চিবুলেন তারপর অন্য অংশটুকু মইনুদ্দিনকে খেতে দিলেন।আদেশ পালন করলেন মইনুদ্দি একটু পরেই উছ্ছিষ্ট রুটির প্রতিক্রিয়া প্রকাশিত হতে শুরু করলো।বিস্মিত হলেন ।অন্তরের আছছাদন যেন উবে যাছেছ একে একে।অদ্ভুত এক জ্যোতির্ময় অনুভব এসে ধীরে ধীরে আলোকিত করছে হৃদয়ের সর্বত্র।দরবেশ চলে গেলেন।অন্তরে জ্বালিয়ে দিয়ে গেলেন আল্লাহ প্রেমের
অনন্ত অনল।এই হলো অলিআল্লাহদের তাওয়াজ্জোহ এর ফল। মইনুদ্দিন বাগান ভিটে বাড়ি সহ সবকিছু বিক্রি করে দিয়ে বেরিয়ে পরলেন তিনি
আল্লাহর পথে।প্রথমেই জাহেরী এলেম শিক্ষার জন্য হাজির হলেন বোখারা,সমরখন্দে।দীর্ঘ দিন সেখানে অবস্হান করে বুৎপত্তি অর্জন করলেন জাহেরী এলমের সমস্ত শাখা প্রশাখায়। তারপর বেরিয়ে পরলেন বাতেনী ইলম অর্জনের উদ্দেশ্যে।
হাদিস শরীফে উল্লেখ আছে, ”জ্ঞান দুই প্রকার।জবানী ইলম বাতেনী ইলম।” (মেশকাত শরীফ)।ইমাম মালিক (রঃ) বলেছেন-”যে ব্যক্তি
বাতেনী জ্ঞান অর্জন করলো কিন্তু ইলমে শরীয়ত শরীয়ত গ্রহন করলো না সে নিশ্চিত কাফের ,আর যে ব্যক্তি শুধু ইলমে শরীয়ত গ্রহন করল কিন্তু
বাতেনী ইলম গ্রহন করলো না সে নিশ্চয় ফাছেক।আর জ্ঞান অর্জন করা প্রতিটি মোসলমানের উপর যেহেতু ফরয তাই বাতেনী এলেম অর্জন করাও
ফরয।এই বাতেনী জ্ঞান অর্জনের জন্য আবার খাজা মইনুদ্দিন চিশ্তী (রঃ) বের হয়ে গেলেন বাতেনী জ্ঞান সম্পন্ন শিক্ষক অন্যেশনের উদ্দেশ্য।
৫৫০ হিজরি সাল।বাগদাদে এসে সাক্ষাৎ পেলেন হজরত বড় পীর আব্দুল কাদের জিলানী (রঃ) এর।কয়েক মাস উনার সাথে অবস্হানের
পর আবার নুতন শিক্ষকের সন্ধানে বের হলেন।বিদায়ের সময় বড়পীর(রঃ) বললেন,’হে মইনুদ্দিন ।তুমি যখন হিন্দুস্হানে সফর করবে ,তখন পথে পরবে ভাতীসা রমন্ত নামে এক স্হান।সে স্হানে আছে সিংহতুল্য এক মর্দে মুমিন।তার কথা মনে রেখ তুমি।
শুরু হল নুতন শয়েখের সন্ধান।পথে বিভিন্ন অলির সাথে সাক্ষাতের পর এসে উপস্হিত হলেন খোরাসান এবং ইরাকের মধ্যবর্তী নিশাপুর অন্চলের হারুন নগরে। এই শহরেই বসবাস করেন আউলিয়া সম্প্রদায়েরমস্তকের মুকুট হজরত ওসমান হারুনী(রঃ)।উনার নিকট বায়াত হবার দরখাস্ত পেশ করলে মন্জুর হল।উনার সাথে বিশ বৎসরের অধিক সময় অতিবাহিত করে কামালিয়াতের সর্বোচ্চ স্তরে পৌছলেন।
এবার দাওয়াতের পালা।অলী আল্লাহগন হলেন নবী রাসুলদের প্রকৃত উত্তরসুরী।সেই দায়িত্বের ভার এসে পড়ল খাজা মইনুদ্দিন চিশ্তী (রঃ) এর উপর।ইতিমধ্যে নুতন এক ছাত্র এসে হাজির হয়েছে খাজার দরবারে। খাজা মইনুদ্দিন চিশ্তী (রঃ) ছাত্র জনাব কুতুবুদ্দিন বখতিকে সাথে নিয়ে হজ্ব পালনের উদ্দেশ্যে রওনা হলেন মক্কায়।হজ্ব পর্ব শেষ করে মদীনা শরীফ এসে হজরত খাজা মইনুদ্দিন চিশ্তী (রঃ) রসুলে পাক(সাঃ) এর কাছ থেকে এক অবিস্মরনীয় সুসমাচার।হযরত রসুলে পাক(সাঃ) জ্যোতির্ময় চেহারায় আবির্ভুত হয়ে জানালেন,”প্রিয় মইনুদ্দিন।তুমি আমার ধর্মের মইন(সাহায্যকারী)।আমি তোমাকে হিন্দুস্হানের বেলায়েত প্রদান করলাম।হিন্দুস্হান বুৎপরোস্তির অন্দ্ধকারে নিমজ্জিত।তুমি আজমীরে যও।সেখানে তোমর মধ্যমে পবিত্র ইসলামের ব্যাপক প্রসার ঘটবে।
সুসমাচার শুনে পরিপৃপ্ত হলেন খাজা মইনুদ্দিন চিশ্তী (রঃ)
পরক্ষনেই চিন্তিত হলেন তিনি।কোথায় আজমির? বিশাল হিন্দুস্হানের কোন দেশে আছে রসূল নির্দেশিত আজমীর?
চিন্তিত অবস্হায় তন্দ্রাছ্ছন্ন হয়ে পরেছিলেন খাজা খাজা মইনুদ্দিন চিশ্তী (রঃ)।সেই অবস্হায় তিনি দেখলেন,হজরত মোহাম্মদ(সাঃ) তার শিয়রে উপবিষ্ট।তিনি তাকে আজমীর শহরের দৃশ্য দেখিয়ে দিলেন।সেই সঙ্গে দিয়ে দিলেন প্রয়োজনীয় পথ নির্দেশনা।এরপর দয়াল নবী (সাঃ) তার হাতে দিলেন একটি সুমিষ্ট আনার।তারপর তার জন্য দোয়ায়ে খায়ের করে যাত্রা শুরু করবার নির্দেশ দিয়ে দিলেন।
সফর শুরু হলো আবার।সঙ্গে সাথী কুতুবুদ্দিন।চলতে চলতে এসে পৌছলেন লাহোর।মনে পড়ে গেল হজরত বড়পীর(রঃ) এর সেই মুল্যবান উপদেশমর্দেমুমিন সেই সিংহ পুরুষ এর কথা,সেই ভাতীসা রমস্হ জায়গার কথা। হজরত খাজা মইনুদ্দিন চিশ্তী (রঃ) জানতে পারলেন এই লাহোরেই আছে সেই সিংহতুল্য মর্দে মুমিনের মাজার শরীফ।তার মোবারক নাম হজরত দাতাগন্জ্ঞে বখশ(রঃ)।তিনি একাধারে দুই মাস অবস্হান করলেন।তারপর শুরু হল যাত্রা।এবারের যাত্রার গন্তব্য
দিল্লী।

এগিয়ে চলল হজরত খাজা মইনুদ্দিন চিশ্তী (রঃ) এর বেহেশতীকাফেলা।এখন আর কাফেলা দুইজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।বিভিন্ন স্হানে
বিরতির সময় সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন কিছু খাটি আল্লাহ অনুরক্ত ফকির দরবেশ।আস্তে আস্তে এর সংখ্যা এসে দারিয়েছে চল্লিশে।সঙ্গী সাথী সহ
দিল্লী এসে উপস্হিত হলেন হজরত খাজা মইনুদ্দিন চিশ্তী (রঃ)।দিল্লীর শাসক তখন হিন্দুরাজা খান্ডরাও।আজমীর অধিপতি পৃথ্বিরাজের ভাই ছিলেন তিনি।পৃথ্বিরাজই তাকে তার প্রতনিধি হিসেবে দিল্লীর শাসনভারঅর্পন করেছিলেন।
রাজমহলের অদুরেই নির্মিত হলো ফকির দরবেশদের ডেরা।নির্ভয়ে তরা শুরু করলেন তাদের নিয়মিত ইবাদত বন্দগী।ক্রমে ক্রমে ইসলামের আলো প্রসারিত হতে থাকলো।দিল্লীর আধ্যাতিক দৈন্যতায় এলো ইমানের জ্যোতির্ময় জোয়ার।পিতৃ ধর্ম ত্যাগ করে দলে দলে লোক এসে প্রবেশ
করতে থাকলো আল্লাহর মনোনীত একমাত্র ধর্ম ইসলামের সুবাসিত কাননে।বিরোধিতা যেমন বাড়তে লগলো।তামনি বাড়তে থকলো বিজয়ের বিরতিহীন অভিঘাত।কিন্তু গন্তব্যত এখানে নয় ।এগিয়ে যেতে হবে আরো সন্মুখে।রসুল পাক(সাঃ) এর নির্দেশিত সেই আজমীরের আকর্ষন একসময় উদ্বেলিত করে তুললো খাজা মইনুদ্দিন চিশ্তী (রঃ)
এর অন্তরকে।দিল্লীর কুতুব হিসেবে নির্বাচিত করলেন হযরত কুতুবুদ্দিন বখতিয়ার কাকী(রঃ) কে।দিল্লীর দ্বীন প্রচার নওমুসলিমের বিড়াট কাফেলার হেফাজতের দায়িত্ব হযরত কাকির উপর।
খাজা মইনুদ্দিন চিশ্তী (রঃ) তার আত্নোৎসর্গকারী ফকির দরবেশদের নিয়ে রওয়ানা হলেন আজমীর অভিমুখে।পিছনে পরে থাকলো দিল্লী,দিল্লীর শোকাকুল জনতা দিল্লীর নব নিযুক্ত কুতুব হযরত বখতিয়ার কাকী(রঃ)
আজমীর শহরের উপকন্ঠে এসে উপস্হিত হলেন খাজা মইনুদ্দিন চিশ্তী (রঃ) ।সফর সঙ্গীগন সবাই পরিশ্রান্ত।বিশ্রামের ব্যবস্হা করতেই হয়।এই সেই হিন্দুস্হানের বেলায়াতের প্রতিশ্রুত কেন্দ্রভুমি আজমীর ।চারিদিকে পাহাড়,পাথর মরুভুমি।নিকটেই বৃক্ষছায়া।এখানেই বিশ্রামের জন্য উপবেশন করলেন দরবেশদের কাফেলা।
স্হানটি ছিল রাজা পৃথ্বিরাজের উষ্ঠ্র বাহিনির বিশ্রামস্হল। রাজার লোকেরা কিছুক্ষন যেতে না যেতেই সবাইকে স্হান ত্যাগ করতে বলল।বিস্মিত হলেন খাজা মইনুদ্দিন চিশ্তী (রঃ) ।উটের দলতো এসে পৌছবে সেই সন্দ্ধাবেলায়।অথচ লোকগুলি তাদেরকে এখনই তাড়িয়ে দিতে চায়।তিনি বললেন, ”ঠিক আছে আমরা চললাম।তোমাদের উটই এখানে বসে বসে বিশ্রাম করুক।
পরিশ্রান্ত কাফেলা আবার এগিয়ে চললো সামনের দিকে।।অদুরেআনা সাগর সাগরতো নয় একটি বিশাল হ্রদ।লোকে বলে আনা সাগর।আনা সাগরের পাড় ঘেষে অজস্র মন্দির। খাজা মইনুদ্দিন চিশ্তী (রঃ) এই হ্রদেরই এক ছোট টিলার উপর বসবাসের স্হান নির্বাচন করলেন।সে রাতেই মুখে মুখে আগন্তুক দরবেশের আগমন সংবাদ ছড়িয়ে পড়লো সর্বত্র।সকালে মহা রাজ পৃথ্বিরাজও শুনতে পেলেন এক অদ্ভুত সংবাদ।উষ্ঠশালার কর্মচারীগন এসে জানালো।গতকাল সন্দ্ধায় যে উটগুলি উষ্ঠ্রশালায় আনাহয়েছিল সবগুলি এখনও শুয়ে আছে।কিছুতেই উঠবার নাম করছে না।সঙ্গে সঙ্গে মুসলমান দরবেশদলের ঘতনাও বর্নীত হলো রাজার কাছে।দরবেশদলের নেতা উষ্ঠ্রশালা পরিত্যাগের সময় বলেছিলেন , ”তোমাদের উটই এখনে বসে বসে বিশ্রাম করুক।
ইতিপুর্বে বিক্ষিপ্তভাবে মুসলমান ফকিরদের সম্পর্কে এরকম অনেক কথা রাজার কর্নগোচর হয়েছিল।চিন্তিত হয়ে পড়লেন রাজা পৃথ্বিরাজ।মনে পড়ে গেল তার রাজমাতার ভবিষ্যতবানীর কথা।তিনি বলেছিলেনএক মুসলমান ফকিরের অভিসম্পাদেই পৃথ্বিরাজের রাজ্য ধ্বংস হয়ে যাবে।
একি তবে সেই ফকির ? সম্ভবত এই ফকিরের কথাতেই এই অবস্হার সৃষ্টি হয়েছে।কর্মচারীদেরকে ফকিরদের কাছে ক্ষমা চাওয়ার
জন্য নির্দেশ দিলেন রাজা। রাজ আদেশ পালন করল শ্রমিকেরা
হযরত খাজা মইনুদ্দিন চিশ্তী (রঃ) বললেন যাও।এ অবস্হা আর থাকবে না।উটশালায় ফিরে এসে বিশ্বয়ের সঙ্গে সবাই লক্ষ্য করল উটগুলো স্বাভাবিকভাবে চলাচল শুরু করেছে।ফকিরের কারামতি দেখে সবাই অবাক হয়ে গেল।ধীরে ধীরে আজমীরের অবস্হান্তর ঘটতে লাগলো।কৌতুহল নিবারনের জন্য লোকজন যাতায়াত শুরু করে দিল হযরত খাজার আস্তানায়।তার পবিত্র চেহারা আর তার সাথীদের প্রানখোলা মধুর চরিত্রের প্রভাবে সম্মোহিত হতে লাগলো আজমিরবাসী। হযরত খাজা মইনুদ্দিন চিশ্তী (রঃ) এর সোহবতের(সাক্ষাৎ) বরকতে তাদের অন্তরের অন্দ্ধকার দুর হতে লাগলো।জেগে উঠলো আজমেরীর সত্যান্বেষী জনতা।কিন্তু আতংকিত হলো পুরোহিতরা,শোষক বর্নবাদী হিন্দু সমাজ।ভীত হলো হিংস্র রাজপুরুষগন এবং সামনতবাদী সম্রাট।
ইসলাম বিদ্বেসী ক্রোধান্দ্ধ শহর লোকজন রাজদরবারে গিয়ে হযরত খাজা মইনুদ্দিন চিশ্তী (রঃ) তার সহচরদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করলো।
অভিযোগ শুনে ক্রুদ্ধ হয়ে উঠলেন রাজা পৃথ্বিরাজ।অহংকারের নীচে চাপা পরে গেল মায়ের সদুপদেশবানী।রাজা একদল সৈন্যকে আদেশ দিলেন ফকির দরবেশদলকে এক্ষনি রাজ্য থেকে বিতাড়িত করতে। রাজার আদেশ পেয়ে ঝাপিয়ে পরলো অভিযানে। হযরত খাজা মইনুদ্দিন চিশ্তী (রঃ) নির্বিকার।আল্লাহ পাকের সাহায্য কামনা করলেন তিনি।সাথে সাথেই আক্রমনকারীদের কেউ হলেন অন্ধ,কারও শরীর হল নিঃসাড়।কেউ হলো ভুতলশায়ী।
নিরুপায় হয়ে পায়ে পড়ে ক্ষমা প্রার্থনা করলো তারা।দয়ার সাগর গরীবে নেওয়াজ হযরত খাজা মইনুদ্দিন চিশ্তী (রঃ) ক্ষমা করে দিলেন সবাইকে।
রাজা পৃথ্বিরাজ ভেবে কুল পান না কি করবেন তিনি।সমরাস্ত্র, সুসজ্জিত সৈন্যদল কোন কিছুই যে আর কাজে আসছে না।এক দুরাগত যবন ফকিরের নিকট পরাজয় বরন করতে হবে তাকে ?ঐশ্বরিক ক্ষমতাধর এই ফকিরের আনুগত্য স্বীকার করবেন নাকি তাকে বিতাড়নের প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখবেন। কি বিশ্বয়কর সংকট।চুপ করে থাকলেও বিপদ ।বিরুদ্ধাচরন করলেও সমস্যা।এদিকে দলে দলে লোকজন গ্রহন করছে ফকিরের প্রচারিত একত্ববাদী ধর্মমত।
রাজা ভেবে চিন্তে ঠিক করলেন ,হিন্দু ধর্মের আধ্যাধিক সিদ্ধপুরুষদের দ্বারা প্রতিরোধ করতে হবে ফকিরকে।তাই সিদ্ধপুরুষ বলে খ্যাতরামদেওকে অনুরোধ করলেন তার যোগমন্ত্র বলে এই যবন ফকিরকে বিতাড়িত করতে।রামদেও রাজী হলেন।তার ধীর্ঘ সাধনালব্দ্ধ আধ্যাধিক শক্তিতে হযরত খাজা মইনুদ্দিন চিশ্তী (রঃ) কে পরাস্ত করার বাসনায় হাজির হলেন হযরতের দরবারে।
হযরত খাজা মইনুদ্দিন চিশ্তী (রঃ) তখন ছিলেন ধ্যানমগ্ন অবস্হায়।কিছুক্ষন পর চোখ খুললেন হযরত।দৃষ্টিপাত করলেন রামদেও খাজা মইনুদ্দিন চিশ্তী (রঃ) এর জ্যোতির্ময় চেহারার দিকে।মুগ্ধ হয়ে গেলেন রামদেও।তার আধ্যাতিক শক্তি মুহুর্তের মধ্যে নিশ্চিন্ন হয়ে গেল।অন্ধকারে আলো জ্বললে মুহুর্তেই যেমন করে অন্ধকার অপসারিত হয়।হজরত খাজার কদম মোবারকে লুতিয়ে পড়লেন রামদেও।নির্দ্বধায় স্বীকার করলেন ইসলাম। খাজা মইনুদ্দিন চিশ্তী (রঃ) তার নাম রাখলেন মোহাম্মদ সাদী।
রামদেও এর ইসলাম গ্রহনের সংবাদ শুনে রাজা ক্ষোভে দঃখে অস্হির হয়ে উঠলেন।কিন্তু বিদূষী মায়ের উপর্যুপরি উপদেশের বাধ্য হয়ে সংযত হলেন রাজা।কিন্তু কিছুদিন পরই দেখা দিল আরেক বিপদ।
আনা সগরের পানি শুধুমাত্র উচ্চ বর্নের হিন্দু এবং পুরোহিত সম্প্রদায়
ছারা অন্য কেও ব্যবহার করতে পারতো না।নিম্ন বর্নের হি্ন্দুরা এটা তাদের ধর্মীয় বিধান বলে মনে করত।কিন্তু মোসলমানরা কি আর বর্নভেদের ধার ধারে ? একদিন আনাল সাগরে অজু করতে গেলন হজরত খাজার একজন সাগরেদ।পুরোহিতরা অপমান করে তাড়িয়ে দিলো তাকে।সাগরেদ সমস্ত ঘটনা বর্ননা করলেন খাজা মইনুদ্দিন চিশ্তী (রঃ) কে।হযরত খাজা মোহাম্মদ সাদীকেআনা সাগরথেকে এক ঘটি পানি আনার নির্দেশ দিলেন।নির্দেশ মত মোহাম্মদ সাদীআনা সাগরথেকে এক ঘটি পানি আনতেই দেখা গেলো এক আশ্চর্য দৃশ্য।কোথায় সাগর ? সব পানি তার শুকিয়ে গিয়েছে একেবারে।
এই আলৌকিক ঘটনা রাজাকে জানালো প্রজারা।বিব্রত বোধ করলো রাজা।রাজা বাধ্য হয়ে আবারও তাদের প্রজাদের দুর্ব্যবহারের জন্য ফকিরের কাছে ক্ষমা চাইতে নির্দেশ দিলেন রাজা।প্রমাদ গুনলেন পুরোহিত সম্প্রদায়।কিন্তু উপায়ন্তর না দেখে তারা খাজা মইনুদ্দিন চিশ্তী (রঃ) এর কাছে গিয়ে ক্ষমা ভিক্ষা করলেন
মানুষের দুর্দশা দেখে পুরোহিতদের ক্ষমার প্রেক্ষিতে মোহাম্মদ সাদীকে পুনরায় ঘটিতে ভরা পানি আনা সাগরে ঢেলে দিতে নির্দেশ দিলেন।নির্দেশ পালিত হলো।ঘটির পানি ঢেলে দেয়ার সাথে সাথেই ভরে গেল বিশাল হ্রদআনাল সাগর।এই আলৌকিক ঘটনার পর বহুলোক ইসলামের সুশীতল ছায়ায় আশ্রয় নিল খাজা মইনুদ্দিন চিশ্তী (রঃ)এর হাত ধরে।
পৃথ্বিরাজ ভেবে পান না কি করে মোসলমান ফকিরকে প্রতিহত করা যায় ।কেউ কেউ রাজাকে বুদ্ধি দিলেন বিখ্যাত ঐন্দ্রজালিক অজয় পালকে দিয়ে কিছু করা যায় কিনা ?রাজা তাকেই ডেকে পাঠালেন এবং রাজকীয় পুরুস্কারের প্রস্তাব করলেন।অজয় পাল তার সর্বশক্তি দিয়ে খাজা মইনুদ্দিন চিশ্তী (রঃ) কে ঘায়েল করার চেষ্টা করলেন।কিন্তু মিথ্যা কি কখনো সত্যকে প্রতিহত করতে পারে ? অজয় পালও তার ভুল বুঝতে পেরে তার সঙ্গী সাথী সহ ইসলাম ধর্ম গ্রহন করলেন।খাজা মইনুদ্দিন চিশ্তী (রঃ) অজয় পালের নাম রাখলেনআব্দুল্লাহ বিয়াবানী
সংবাদ শুনে মুষড়ে পরলেন রাজা।নিজ রাজ্য রক্ষার কথা চিন্তা করে সংঘর্ষমুক্ত সহাবস্হানের পথ অবলম্বন করলেন রাজা।কিন্তু সত্য মিথার সংষর্ষ যে অবসম্ভাবী।আবারও সংঘর্ষের সূত্রপাত হলো এভাবে-
রাজদরবারের একজন কর্মচারী ছিলেন খাজা মইনুদ্দিন চিশ্তী (রঃ) এর একান্ত অনুরক্ত।মুসলমানও হয়ে গিয়েসিলেন তিনি।রাজা একথা জেনেও তাকে খুব পছন্দ করতেন তার উত্তম স্বভাব,বিশ্বস্হতা সততার জন্য।কিন্তু রাজদরবারের অন্যান্য সদস্যদের প্ররোচনায় এক সময় সেই কর্মচারীর উপর ক্ষিপ্ত হয়ে উঠলেন রাজা। খাজা মইনুদ্দিন চিশ্তী (রঃ) এর কাছে বার বার হেনস্ত হবার সমস্ত ক্ষোভ যেন গিয়ে পড়লো তার উপর।মুসলমান কর্মচারী সমস্ত দুঃখের কথা খাজা মইনুদ্দিন চিশ্তী (রঃ) এর কাছে বর্ননা করার পর খাজাকে অনুরোধ করলেন তার জন্য রাজার কাছে একটি সুপারিশ পত্র পাঠাতে।পর দুঃখে কাতর খাজা মইনুদ্দিন চিশ্তী (রঃ) একান্ত বিনয় নম্রতার মাধ্যমে সেই কর্মচারীর পক্ষে একটি সুপারিশ পত্র পাঠালেন।সেই সঙ্গে রাজাকে জানালেন ইসলাম গ্রহনের একান্ত আহ্বান।
চিঠি পেয়ে রাগে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেললেন পৃথ্বিরাজ।মুসলমান কর্মচারীকে চকুরীচ্যুত করলেন রাজা।সেই সঙ্গে খাজা মইনুদ্দিন চিশ্তী (রঃ) এর বিরুদ্ধে উচ্চারন করলেন অশালীন বক্তব্য।সংবাদ শুনে খাজা মইনুদ্দিন চিশ্তী (রঃ) এর প্রেমময় অন্টরেও প্রজ্জলিত হলো রুদ্ররোষের সর্বধ্বংসী আগুন।তিনি একটুকরা কাগজে লিখে পাঠালেন রাজা পৃথ্বিরাজকে-”মান তোরা যেন্দা বদস্তে লশকরে ইসলাম বছোপর্দম অর্থাৎ আমি তোমাকে তোমার জীবিতাবস্হাতেই মুসলিম সেনাদের হাতে সোদর্প করলাম।এর পরেই স্বপ্ন দেখলেন সুলতান শাহাবুদ্দিন মোহাম্মদ ঘুরী এবং উনার নেতৃত্বেই হিন্দুস্হানে উরলো মোসলমানদের বিজয় পতাকা এবং পতন হলো মহারাজা পৃথ্বিরাজের।

নিদ্রাভিবুত ছিলেন সুলতান শাহাবুদ্দিন মোহাম্মদ ঘুরী।স্বপ্নে দেখলেন শ্বেত শুভ্র বস্ত্রাবৃত এক জ্যোতির্ময় মহাপুরুষ সিংহাসনে বসা।তার সামনে দন্ডায়মান অনেক অনুচর।তাদের মধ্যে একজন সুলতান ঘোরীকে হাত ধরে একদল সুসজ্জিত মুসলমান সেনাদলের নিকট নিয়ে গেল।আর সেই সময় সেই জ্যোতির্ময় মহাপুরুষ তাকে লক্ষ্য করে বললেন,”যাও তোমাকে আমি হিন্দুস্হানের শাসন ক্ষমতা দান করলাম।
স্বপ্ন ভেঙ্গে গেল।চমকিত হলেন সুলতান।এ নিশ্চয়ই শুভ স্বপ্ন হবে। সকালে ঘনিষ্ঠজনদের সঙ্গে স্বপ্নের বৃত্তান্ত জানালেন।সবাই একবাক্যে বললেন ,মনে হয় অচিরেই হিন্দুস্হান আপনার করতলগত হবে।এ স্বপ্ন তারই আগাম সুসংবাদ।
সুলতান মনস্হির করলেন হিন্দুস্হান অভিযান শুরু করার। সেনাপতি কুতুবুদ্দিন আইবেককে প্রস্তুত হবার নির্দেশ দিলেন।৫৮৮ হিজরি সালে সুলতান শাহাবুদ্দিন মোহাম্মদ ঘুরী তার বিশাল সেনাবাহিনী নিয়ে হিন্দুস্হান অভিমুখে রওয়ানা হলেন।অন্তরে বিগত যুদ্ধের পরাজয়ের গ্লানি।সে গ্লানি এবার মুছতেই হবে।ইতি পুর্বে দুই দুইবার হিন্দুস্হান আক্রমন করেও সফল হতে পারেন নি।শুরু হল তুমুল যুদ্ধ। সুলতান শাহাবুদ্দিন মোহাম্মদ ঘুরীর সৈন্যসংখ্যা রাজা পৃথ্বিরাজের সৈন্যের তুলনায় একেরারেই কম।কিন্তু ইমানের বলে বলীয়ান এক আল্লাহর একছ্ছত্র শক্তির প্রতি নির্ভর করে তারা নির্ভয়ে এগিয়ে চললো। এই বাহিনীর প্রধান সেনাপতি কুতুবুদ্দিন আইবেক।তারায়েনা প্রান্তরে দুই বাহিনীর মধ্যে প্রচন্ড যুদ্ধ শুরু হলো। মুসলমানদের প্রচন্ড আক্রমনের সামনে ছত্রভঙ্গ হয়ে গেল পৌত্তলিক সৈন্যবাহিনী।নাস্তানাবুদ হয়ে পালিয়েও নিস্তার পেল না তারা।ক্ষিপ্রগতিতে রাজপুত সৈন্যদের পশ্চাদ্ধাবন করে যাকে যেভাবে পাওয়া গেল,তাকে সেভাবেই হত্যা করতে লাগলো মুসলমান সৈন্য বাহিনী।উপায়ন্তর না দেখে যুদ্ধের ময়দান থেকে পালিয়ে গেলো সেনাপতি খান্ডে রাও।রাজা পৃথ্বিরাজও সরস্বতী নদীর তীর ধরে পালাবার চেস্টা করার সময় মোসলমানদের সৈন্যদের হাতে বন্দী হয়ে গেল রাজা।শেষাবধি হত্যা করা হল তাকে।৫৮৮ হিজরী সালে ভয়াবহ যুদ্ধে সুলতান সাহাবুদ্দিন ঘোরী নিরংকুশ বিজয় লাভ করলেন।আরো সামনে এগিয়ে চললো ঘোরী বাহিনী।এর পর সহজেই এক এক করে সরস্বতী,সামানা হাশিসহ অধিকৃত হল দিল্লী।সুলতান দিল্লীর দায়িত্ব দিলেন কুতুবুদ্দিন আইবেককে ।তারপর সুলতান শাহাবুদ্দিন মোহাম্মদ ঘুরী এগিয়ে চললেন আজমীরের দিকে।
তার এই এই অপ্রতিরুদ্ধ অগ্রাভিযানের সামনে অবনত হলো যুদ্ধে নিহত হিন্দু রাজাদের পুত্রগন।দেউল নামক স্হানে সম্রাটের সঙ্গে সাক্ষাত করলো অনেক রাজপুত্রগন।মুসলিম শাসনের প্রতি তাদের আনুগত্যের বিনিময়ে সম্রাট তাদেরকে দান করলেন বিভিন্ন রাজ্যের জায়গী। সুলতান এগিয়ে চললেন আজমীরের দিকে।
এদিকে আজমীরে ক্রমাগত বেড়েই চলছে খাজা মইনুদ্দিন চিশ্তী (রঃ) এর কাফেলা। ইসলাম কবুলকারীদের সংখ্যা এখন লক্ষ লক্ষ।শুধু আজমীরে নয় এখন খাজা মইনুদ্দিন চিশ্তী (রঃ) এর জামাত এখন ছড়িয়ে পরেছে হিন্দুস্হানের কোনায় কোনায়।দর্শনার্থীদের ভীর সব সময় লেগেই থাকে।
সুলতান শাহাবুদ্দিন মোহাম্মদ ঘুরী অবশেষে আজমীর এসে পৌছলেন।তখন সন্ধা হয় হয়।সুর্যাস্ত হওয়ার পর সচকিত হয়ে উঠলেন সুলতান শাহাবুদ্দিন মোহাম্মদ ঘুরী।দুরে কোথায় আজানের ধ্বনি শোনা যায়।সেদিকে এগিয়ে যেতেই তিনি দেখলেন একদল নুরানী জান্নাতী
লোক হাত বেধে দাড়িয়েছেন।দরবেশদের জামাতের সঙ্গে নামাজ আদায় করলেন সুলতান।সালাত শেষে জামাতের ইমামের মুখের দিকে তাকিয়েই চমকে উঠলেন সুলতান শাহাবুদ্দিন মোহাম্মদ ঘুরী।এইতো সেই জ্যোতির্ময় মহাপুরুষ,স্বপ্নে যিনি জানিয়েছেন হিন্দুস্হান বিজয়ের সুসংবাদ।
সুলতান শ্রদ্ধাভরে পরিচিত হলেন হজরত খাজার সাথে।তিনদিন হযরতের মোবরক সহবতে অতিবাহিত করে স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করলেন সুলতান।তার প্রতিনিধি হিসেবে দিল্লীতে রেখে গেলেন কুতুবুদ্দিন আইবেক কে।তিনিও বায়াত গ্রহন করলেন খাজার প্রতিনিধি খাজা বখতিয়ার কাকী(রঃ) হাতে।এর পর রাজনৈতিক রুহানী শক্তির সম্মিলিত প্রচেষ্টায় পৌত্তলিকতা উছ্ছেদের অভিযান চলতে থাকলো সমান্তরাল গতিতে।কুতুবুদ্দিন আইবেক ক্রমে ক্রমে প্রসারিত করলেন মুসলিম রাজ্যের সীমানা।কনৌজ,বানারস সহ আরো বহু স্হানে উড়িয়ে দিলেন মোসলমানদের বিজয় পতাকা।

(গ্রন্থ সহায়তামোহাম্মদ মামুনুর রশীদ রচিত -” চেরাগে চিশতী”,প্রকাশক-সেরহিন্দ প্রকাশন,উয়ারী ,ঢাকা।)

Thursday, 27 April 2017

কোরান কেমন : কোরানের বয়ান এবং শাঁইজী লালন

0 Comments
পুসিদার ভেদ জানতে পারলে
নবুয়ত তার এমনি মেলে
দলিল-কোরান না পড়লেও সে সকলই দেল-কোরানে পাবে ॥
------------------------------------------ফকির লালন শাহ
‘পুসিদার ভেদ’ অর্থ আত্মতত্ত্বের গুপ্তরহস্য তথা সৃষ্টিরহস্য। সৃষ্টি বা স্থূল সত্তা দৃশ্যমান অথচ সূক্ষ্ম স্রষ্টা বা মূলসত্তা অদৃশ্য অজানা। দেহকে দেখা যায় কিন্তু দেল বা চিত্তাকাশ কি দেখা যায় না ছোঁয়া যায় কখনও? যদিও দেলই দেহের আসল জন্মদাতা। সর্বসৃষ্টির মূলে মন তথা দেলই উৎসস্বরূপ। মানবের দেল থেকেই জন্ম নেয় ভাব বা অভিব্যক্তি। তারপর আসে ভাষা। ভাষাও মনের সম্পূর্ণ ভাবটুকু বলে কয়ে প্রকাশ করতে পারে না, চারভাগের একভাগ মাত্র তুলে ধরতে সক্ষম ধ্বনিময় রূপক-প্রতীকের আশ্রয়ে। অবশ্য ভাবকে ধরতে না পারলেও ভাষাকে ধরে রাখাই দলিলের দায়। তবে দলিল কোনও দেলের জন্ম দিতে পারে না বরং দেলের প্রকাশকে প্রামাণ্যরূপে বা বিকৃতরূপে ধরে রাখতে পাওে শুধু। দেহ ধরা যায় তাই তার নাম ‘ধরা’ আর মনকে ধরা যায় না বলেই তার নাম ‘অধরা’। শাঁইজীই কেবল অধরাকে ধরতে জানেন; যেমন বলেন, “ধররে অধর চাঁদেরে অধরে অধর দিয়ে/ যে ধরাতে অধর ধরা থেকরে সচেতন হয়ে”। কিন্তু দেল ও দলিলের দ্বন্দ্বে পড়ে মানুষের বড় মুসিবত। দেলকে দলিলের ভারি বোঝার নিচে চিড়েচ্যাপ্টা বানিয়ে ফেলা হলে যা হয় তাই তো হচ্ছে প্রথাবদ্ধ সব ধর্মকর্র্মে। হৃদয়হীন কর্মাচার আর দর্শনহীন ধর্মাচারেরর ঘোলাজলে সমাজ সংসার পাপপঙ্কের অতলে তলিয়ে আছে।
সুফির চোখে ‘দেল ও ‘পুসিদা প্রায় সমার্থক। অন্তকরণ বা চিৎপ্রকর্ষণ এরকম দোধারী অর্থ এর। ‘ভেদ’ অর্থ রহস্য বা তত্ত্বজ্ঞান। দেহমনের ভেদসমুদ্র পেরিয়ে নির্মোহ ও নির্ভার মনোজগতের বিশেষ অধিপতি হন সুফি। হেরা পর্বত মানবদেহের অপর নাম। তার গুহায় তথা মনোলোকে নির্জন সাধনালব্ধ নবুয়তজ্ঞান ঝরনার নিরন্তর অবগাহনে ¯স্নাতক হয়ে রেসালতের বঙ্কিমপথ ধরে বেলায়েতসমুদ্র পেরিয়ে মাওলাইয়াত তথা ইমামত অর্থাৎ সম্যক গুরুতন্ত্রের স্তম্ভপ্রতিম সুফিরূপে শাঁইজী স্বয়ং দেলকোরান। কারণ তিনি ‘আত্মতত্ত্বে ফাজেল’ মানে পরিসিদ্ধ আত্মবিদ বা তত্ত্ববিদ ধর্মবিজ্ঞানী বলেই সব ধর্মের উপর তিনি সদা ভাসমান সাঁতারু ‘লা শরিক’ বা ধর্ম নিরপেক্ষ মহাসত্তা। এমন মহাপুরুষ যা বলেন, যা করেন সবই কোরানের জীবন্ত অভিব্যক্তি। তিনি কোনও দলিলের পরোয়া করেন না বরং দলিলই তাঁকে অনুসরণ করে পায়ে পায়ে।
ফকির লালন শাহের পূর্বে বাংলা ভাষায় ‘দেলকোরান’ কথাটি আর কেউ এমন জোরালোভাবে উচ্চারণ করেনি এবং এমন অকপটে কোরানের জাগ্রত জীবনদর্শন তথা ধর্মসাধনার মর্মবস্তুকে চুম্বক কথায় তুলে ধরার সাহসও কদাচ পায়নি। ‘দেলকোরান’ নিয়ে তাঁর মতো এত উচ্চকিত হতে আর কাউকেও দেখা যায় না। এর কারণ কী? প্রকৃত ভাব অর্থ না বুঝে আরবীয় রাজতন্ত্রের চাপানো দলিল কোরানের উপর অন্তরের অলীক ও অন্ধ আনুগত্য বাঙালিকে দেলকোরান থেকে সরিয়ে ভুলকোরানের দুর্বিপাকে ঠেলে দিয়েছে। উপরোক্ত কালামে তাই শাঁইজী জানাচ্ছেন, যিনি সম্যক গুরুরূপে উপস্থিত ‘আলে মোহাম্মদ’ বা মোহম্মদের বংশীধারী তিনি পরিজ্ঞাত আছেন পূর্ববর্তী নবীগণের নবুয়ত তথা সত্যায়িত মহাজ্ঞান। নবুয়ত লাভের জন্য আজকের দিনে তাঁকে আর আগের মতো সাধনভজন করে সিদ্ধ হতে হয় না। তিনি জন্মসিদ্ধ মহাপুরুষ। আত্মতত্ত্বের গুপ্তভেদ যাঁর নখদর্পণে নবুয়ত তাঁর এমনিই মেলে। নবুয়তের স্তর পেরিয়ে 'বেলায়েতর' উচ্চাঙ্গিক অভিধায় তাঁরা অভিষিক্ত হন অতীন্দ্রিয় মহৎলোকে। স্কুল-মাদ্রাসায় পড়ালেখা না শিখে কাগজের দলিলকোরান পাঠ না করলেও এমন পরিসিদ্ধ সাধকপুরুষ আপন অন্তর্নিহিত মহাজ্ঞানের ফল্গুধারায় সমগ্র সৃষ্টিরহস্যের জ্ঞানে মহাজ্ঞানী-যা কোরানের পরিভাষায় ‘আল কেতাব’। ‘কোরান মিনাল কিতাব’ অর্থাৎ কেতাব থেকেই কোরানের উৎপত্তি। কেতাব মানে যে বই নয়, মহাপুরুষের অখণ্ড মানসরাজ্য-- এ নিরেট সত্যকথাটি বাঙালি কেন কেউই জানত না, আমার মহান সদগুরু সদর উদ্দিন আহমদ চিশতীই প্রথম জানালেন তাঁর ‘অখণ্ড কোরানদর্শন’এর যথার্থ শব্দসংজ্ঞায় ‘কেতাব’ আসলে কী : “নূরে মোহাম্মদীর মাধ্যমে বিচিত্র সৃষ্টিরূপে স্রষ্টার বিকাশবিজ্ঞানকে কেতাব বলে। উচ্চমানের বিশিষ্ট সাধকের উপর কেতাবজ্ঞান নাজেল হওয়া বিষয়টি সর্বকালের একটি চিরন্তন ব্যবস্থা। কেতাব হলো বিশ্বপ্রকৃতির সামগ্রিক বিকাশবিজ্ঞান। মানুষের জন্য আল্লাহর দেয়া জীবনবিধানও কেতাবের অন্তর্ভুক্ত।
আল্লাহর বিকাশবিজ্ঞানকে কেতাব বলে। যে যন্ত্রের মধ্যে বা যে সকল রূপের মধ্যে আল্লাহর উচ্চ বিজ্ঞানময় বিকাশ ঘটে তার মধ্যে মানবদেহই সর্বশ্রেষ্ঠ। এ জন্য মানবদেহকে ‘আল কেতাব’ বলা হয়েছে। আল কেতাবের জাহেররূপ ‘মানবদেহ’ এবং বাতেনপ্রক্রিয়া ‘বিকাশবিজ্ঞান’। আল কেতাবের উভয়প্রকার বিকাশের মূল উৎস নূর মোহাম্মদ। “আল কেতাব পাঠ করা” অর্থ আপনদেহ পাঠ করা তথা আপনদেহের মধ্যে আত্মদর্শনের অনুশীলন করা। আপনদেহই সকল জ্ঞানের মূল উৎস। সহজ কথায়, ‘কেতাব’ অর্থ মানবদেহ। ‘আল কেতাব’ অর্থ বিশিষ্ট মানবদেহ বা সিদ্ধপুরুষ অর্থাৎ প্রতিষ্ঠাপ্রাপ্ত একজন মহাপুরুষ। আল কেতাব থেকেই ধর্মগ্রন্থসমূহের আগমন”।
মোর্শেদরূপে এমন মূর্ত ও প্রকাশ্য দেলকারানকে মেনে চলা জীবের ক্ষুদ্র দেলের সাধ্যে ভীষণ কঠিন। পালন করতে কেউ পারুক বা না পারুক তাঁর দর্শনকে স্বীকার করে নিলেই ধর্মকর্মজগতের অর্ধেক সমস্যার সমাধান এমনিতেই হয়ে যায়। কিন্তু আমরা সত্যকে সহজে স্বীকৃতি না দিয়ে বৃথা বিরোধ-বিতর্কে মূল্যবান এবং দুর্লভ মানবজীবনের অপচয় করি । যার ফলে সুদূরপ্রসারী বিপাক-বিপর্যয়ের মধ্যে পড়ে আছি প্রায় সবাই।
সদগুরুর স্তব্ধ সমাহিত অন্তর থেকে নিঃশব্দে ক্বাফশক্তির অর্থাৎ মহাশক্তির বিচ্চুরণ ঘটে। সে বিচ্চুরণ স্থানকালপাত্রের ভেদ মানে না। কারণ তা মহাশূন্য হতে উৎসরিত চিৎশক্তির নিত্য প্রস্রবণ। এ শক্তি ধারণ করার পূর্বে দেল তথা চিত্তকে পরিপূর্ণ শূন্য করে ফেলতে হয়। তাতে গুরুধ্যান হয়ে যায় শূন্যধ্যান। অনুগ্রহশীল গুরু ও সার্থক শিষ্যের সম্বন্ধ বাইরের কোনও শব্দাচারে বিভক্ত নয়, অন্তর্গত শক্তিবলে সুসম্পৃক্ত। অব্যক্তে না পৌছালে রূপান্তর সূচিত হয় না সার্থকভাবে। তাই গুরুকে উপলক্ষমাত্র করে ডুব দিতে হয় মহাশূন্যে। তাতেই প্রকৃতির রূপান্তর সৃষ্টি হয়। এ শূন্যতায় গেলে শুদ্ধদেল তথা চিত্ত নির্মল হতে পারে। নির্মল মানে মল-কলুষমুক্ত শুদ্ধচিত্তেই সহজে বিবেকের জাগরণ ঘটে। মন তখন আর সন্দেহ-সংশয়ের দোলাচলে অস্থির থাকে না। যা সত্য সেটাই সুফির মানসপটে ভেসে ওঠে। সে সত্যকে অনুসরণ করার বীর্যও তাঁর ভেতরে সুসংহত হয়।
"ঈসা মুসা দাউদ মোহাম্মদ রসুল / খোদার কাজে আছে মকবুল / ফরমান করিতে কবুল / পড়ছে সদাই দেলকোরান ॥ ইঞ্জিল তৌরা জুব্বুব কোরান / চার জায়গায় চার বয়ান / সিরাজ শাঁই বলে দেল ঢুঁড়িলে লালন / পাবিরে সকল সমাধান"--শাঁইজীর ভাষ্যমতে নবী দাউদ, মুসা, ঈসা ও মোহাম্মদুর রসুলাল্লাহ কেউ কোনও ধর্মগ্রন্থ লিখে যাননি। সবাই যে আপনাপন দেলকোরান পাঠ থেকেই স্বতোৎসারিত জুব্বুব, তৌরা, ইঞ্জিল ও কোরান প্রকাশ করেছেন। তাঁদের তিরোধানের ক্ষমতাসীন রাজা বাদশারা সব ধর্মগ্রন্থের উপর অবৈধ হস্তক্ষেপ ও অস্ত্রোপাচার দ্বারা নানা অদলবদল ঘটানোর ফলে তা এখন চারভাবে খণ্ডিত ও বিকৃত মনে হলেও শুদ্ধচিত্ত সাধক আপন দেল ঢুঁড়লে এ চারগ্রন্থের মধ্যে খণ্ডতা ও বিভেদের পরিবর্তে এককত্ব ও অখণ্ড সত্যের পরিচয়ই আহরণ করেন। মানুষের মগজের চাইতে কাগজের মূল্য বেশি হতে পারে না।
আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞানচর্চাজগত ব্যক্তিসাধকের জীবন্ত আত্মজ্ঞান তথা তত্ত্বজ্ঞানকে একপাশে ঠেলে দিয়ে এত বেশি মাত্রায় কাগুজে দলিল তথা বইপত্র মুখস্থতা নির্ভর হয়ে পড়েছে যে, ব্যক্তির মুক্তবিকাশের কোনও সুযোগই নেই। প্রশ্ন জাগে, ছাপাখানায় মুদ্রিত সহজলভ্য বইয়ের প্রচলন যখন ছিল না তখন কি মানুষ জ্ঞানচর্চা করেনি আজ থেকে মাত্র দুশো বছর আগেও? শাহ লালন ফকির কিছু না লিখেই কীভাবে জগতে আজ এত গভীরভাবে প্রয়োজনীয় ও অপরিহার্য পাঠ্য হয়ে উঠতে পারেন নতুনভাবে? আরও অতীতের দিকে তাকালে ধর্মাবতার রাম, কৃষ্ণ, মহাবীর, গৌতম, নূহ, দাউদ, মুসা, ঈসা, মোহাম্মদ, আলী, হোসাইনগণ যে মহাজ্ঞানময় ‘দেলকোরান’ওয়ালা হলেন তা কোনও প্রাতিষ্ঠানিক লেখাপড়ার ফসল নয়, সবই আত্মতত্ত্ব সন্ধান ও আত্মদর্শনের ফলশ্রুতি। কোন মাদ্রাসায় পড়ে কোন নবী-রসুল কোরানেওয়ালা হয়েছেন কবে যাঁরা গরু ছাগল মেষের মতো ভক্তদের লালনপালন করার জন্য ‘রাখাল’ নামে জগতে সুখ্যাত? সামাজিক প্রাতিষ্ঠানিক সমূহ প্রতিকূলতাকে ডিঙিয়ে সাধকের ব্যক্তিগত বিজয় সম্ভব, সুফির অখণ্ড দেলকোরানের অটলভাষ্য তারই স্বয়ংপ্রকাশ।
দেলকোরান পড়ে ‘ইনসানে কামেল’ তথা পূর্ণমানব না হয়ে বাহ্য দলিল কোরান পড়ে ‘হাফেজ’’ ‘মুফতি’ ‘মোহাদ্দেস’ ইত্যাদি তকমাধারী হবার নির্দেশ কোরানের কোথায় আছে? কোথাও নেই। আদি মোহাম্মদী সাধনার বিরুদ্ধে এগুলো নিষ্ঠুর উমাইয়া-আব্বাসীয়-সৌদি রাজতন্ত্রের রচিত চক্রান্তমূলক কারসাজি মিথ্যাব্যবস্থা যা মাদ্রাসাশিক্ষার নামে হাজারও লোককে রসবোধহীন হিংস্র কাঠমোল্লায় পরিণত করছে। তোতাপাখির মতো মুখস্থ বুলিবাগীশ হবার মধ্যে সত্যের লেশমাত্র অনুভবও থাকে না। কাগজের কোরান বোবা ও কালা। সে কথা বলতে পারে না, শোনেও না। কিন্তু দেলকোরান সাধকের সঙ্গে কথা বলেন যখন তখন, নিত্য নব আদেশ নির্দেশ দিয়ে চলেন, সূর্যের অনুপস্থিতিতে অন্ধকারে নিজেই মহাসূর্য হয়ে জ্বলেন।
মানুষের জানার ও বোঝার জন্যই মহানবীর মাধ্যমে জগতে কোরান প্রকাশিত হয়েছে। অর্থ না বুঝে শুধু কম্পিটারের মতো যান্ত্রিক ঢংয়ে আউড়ে যাবার বা লৌকিক আবৃত্তি প্রতিযোগিতার বিষয় নয় কোরান। অথচ সমাজ সংসারে এমন বদপ্রতিযোগিতাই চলছে। কোরান যে মোটেও জীবনবিধান নয়, বরং জীবনদর্শন সে আদ্যকথাই ভুলে গেছি সবাই ভোগসুখলোভী এজিদী ধর্মব্যবস্থার প্রবল প্রতাপে ও চাপে। কোরান বাইরে থেকে ধার করা বুলির বস্তা বা ছাপানো কাগজের ফর্মা নয়, এ হলো সাধকের শুদ্ধদেল থেকে স্বতোৎসারিত মহাভাবপ্রবাহ যাকে ‘বিজ্ঞান’ বলা হয়। ভোগবাদের হাতছানিতে বস্তুবিজ্ঞানের কঠিন চাপে অধ্যাত্মানুভবের সে সূক্ষ্মতর বোধশক্তি জগতবাসী প্রায় হারিয়ে ফেলেছে আজ। তাই দেখি ঘটা করে ‘কোরান সন্ত্রাসীর গ্রন্থ’ বলে পাশ্চাত্যের কোনও কোনও মহল কাগুজে কোরান তথা দলিল কোরান পুড়িয়ে বোকার আত্মপ্রসাদ লাভ করছে। বস্তুবাদী হৃদয়হীন বিশ্বব্যবস্থার পাষাণবাঁধ ভেঙে মুক্তধারার মতো দেলকোরানধারী মহাসাধুর পুনরুত্থান এবং নতুন মহাভাবান্দোলন সম্ভাবনাও তাতে দিনে দিনে পরিপক্ক হয়ে উঠছে।
সমস্ত সাধনার মূল কথা হলো দিনরাতব্যাপ্ত সকাল-সন্ধ্যা নিবিড় ধ্যান, জপ বা অনুস্মৃতি যাকে আরবী কোরানের পরিভাষায় বলে ‘জিকির’। এর নামই গুরুধ্যানচিত্ততা। ‘দেলকোরান না জানিলে দলিলকোরান পড়লে কিছু হবে না’- বলে ফকির লালন শাহ বাঙালিকে সাবধান করে দিয়েছেন প্রায় দুশো বছর আগে। দেলকোরান একজন মহামানুষ বা অতিমানুষ। তিনি যা বলেন যা করেন সবই মূর্ত কোরানের পরিচয়। এমন মহাপুরুষকেই বলা হয় ‘কোরানুন নাতেক’ অর্থাৎ ‘বাঙ্ময় কোরান’ বা ‘মূর্ত কোরান’ অর্থাৎ দেলকোরান। অথচ আমরা তাঁর মতো আত্মত্যাগী মহাপুরুষদের কাছে সমর্পিত হয়ে আপনাপন দেলপাঠ না শিখে বাহ্যবিদ্যার চাপে পড়ে চিড়েচ্যাপ্টা হচ্ছি প্রতিনিয়ত। বিদ নেই বিহিত নেই শুধু বই পড়ে পড়ে আমরা মস্ত বড় বিদ্যার জাহাজে পরিণত হলেও অবশেষে ভরাডুরি যে নিশ্চিত এ অলঙ্ঘনীয় সত্যটি বর্তমানে ভুলে থাকতে পছন্দ করি। ‘বিদ’ অর্থ জ্ঞানী এবং যাঁর জ্ঞান হিতের সহিত বর্তমান বা বিশেষ হিতকর সেটাই ‘বিহিত’। বিদ বিহিতের হিতাহিতবোধ হয় না তাই বিভ্রান্তির ঘোলাজলে ডুবে মরি। সংসারের কত ভার কাঁধে তুলে নিই অথচ নিজের ভারটুকু নিজে বহন করতে পারি না। প্রেমভক্তিযোগে নিজেকে পাঠ করার পথ খুঁজে পাই না অথচ অন্যের খুঁত ধরি পদে পদে। লোকেদের কাছে জ্ঞানীর তকমা পেয়ে আরও জ্ঞানহারা হই অহমিকাবশে। সদগুরুর শরণাপন্ন হয়ে আপন দেহপাঠ না শিখে নেহাত বইপত্রের বোঝাটানা গর্দভ হয়ে নিজেদের মস্ত জ্ঞানী-পণ্ডিত ভেবে বসি তা কতটা বাহ্যত্যাজ্য আর কতটুকু কী জ্ঞানগ্রাহ্য সে কুতর্কের দোকানদারী করা সুফির কাজ নয়। যার পাপে সে ভোগে একা চার যুগেরে। তুমি বা কার কেবা তোমার এই সংসারে?
মহানবীর প্রতি আত্মসমর্পিত সংখ্যায় অল্প একদল অতিউচ্চস্তরের জ্ঞানী সাধক মহাপুরুষ ভক্তদল ছিলেন যাঁরা তাঁকে অহর্নিশি ঘিরে থাকতেন এবং নিবিড়ভাবে নবীর অনুসরণ ও অনুকরণ করে চলতেন-এঁরাই ‘আসহাবে সুফফা’ নামে সুখ্যাত। ‘সাফা’ অর্থাৎ চিত্তশুদ্ধি থেকে ‘সুফ্ফা’ যা ‘সুফি’র আদি অলঙ্কার। ‘আসহাবে সুফফা’র সুফিগণ এত মহাজ্ঞানী ছিলেন যাঁদের সম্বন্ধে এখনকার দলিলওয়ালা রাজা বাদশাদের দালালেরা কিছুই জানে না। নবীর দেহত্যাগের পর মাওলা আলীর কিয়ৎকালের শাসনামল ছাড়া তাঁরা সব আমলে নানাভাবে অত্যাচারিত, লাঞ্ছিত ও নির্মমভাবে নিহত হন। ইসলামের প্রকৃত মর্মবাদী সুফিচর্চার আদি উৎস এ আসহাবে সুফফার সাধুগণই এবং এঁদের প্রধান অধিপতি হলেন মাওলা আলী। অথচ আলী এবং তাঁর বংশীয় আহলে বাইতে রসুলগণকে হত্যা ও উৎখাত করার জন্য ওমর, বকর ও ওসমানেরা কাগজের কোরান থেকে তাঁদের নাম মুছে দিলেও সুফির দেলকোরানে নবীর বংশীধারীগণের কালজয়ী সুর ও স্বর অক্ষয় গৌরবে জ্যোতিষ্মান। -
ধর্মজগত এ কথা না বুঝলে চলবে না যে, ‘কোরান নাজেল হওয়া’ কথাটি সর্বকালীন এবং সার্বজনীন একটি বিষয়। এটি কোনও কালখণ্ডে খণ্ডিত নয়। সর্বকালে সাধকের নিকট তাঁর আত্মদর্শনের পূর্ণাঙ্গ যে পাঠ তা থেকে যা নাজেল হয় বা বের হয় তাকেই বলা হয়েছে কোরান। পূর্ণাঙ্গ সাধকের আত্মদর্শনের পাঠকে অর্থাৎ অভিব্যক্তিকে কোরান বলে। আরবী কোরান এদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ। কোরানই মানুষের জন্য একমাত্র হেদায়েত। এটা সাধকের ‘রমজান মাস’ ব্যতীত অর্থাৎ শিরিক পরিত্যক্ত কাল ছাড়া অন্য সময় নাজেল হয় না।
চরম সাধক থেকে আগত কোরান অর্থাৎ পরম একজন গুরু হতে আগত কোরান ইনসানের জন্য হেদায়েত। ইনসান থেকে নিুপর্যায়ের মানুষের জন্য হেদায়েত নয়। সৎগুরু তাঁর নিজ থেকে আগত কোরান শিক্ষা দিয়ে অধীনস্থ ভক্ত জীবদের ইনসান বানিয়ে থাকেন (৫৫:১)। এমন ইনসানের জন্যই কোরান হেদায়েত। জীবপ্রকৃতির মানুষের জন্য কোরান বোধগম্য বা যোগ্য নয়। গুরু থেকে যোগ্য শিক্ষালাভের পর তারা কোরানের জ্ঞান লাভের যোগ্যতা অর্জন করে থাকে।
সায়েমের কাছে তাঁর সিয়ামের কালে হেদায়েতের ব্যাখ্যা এবং ফোরকান নাজেল হয়। মানবজীবন সার্থকভাবে মুক্তির দিকে পরিচালনার জন্য সামাজিক ও ব্যক্তিক জীবনের যত প্রকার হেদায়েত (দেশনা) প্রয়োজন হতে পারে তার সর্বদিকের জ্ঞানে সায়েম পরিপূর্ণ হয়ে থাকেন।
সিয়ামসাধনার সময়ে সিয়ামের ফলশ্রুতিস্বরূপ সায়েমের মধ্যে ফোরকান নাজেল হয়। অর্থাৎ ভালমন্দ প্রভেদজ্ঞান তথা সর্ববিষয়ের পার্থক্য নির্ণায়কজ্ঞান নাজেল হয় যার দ্বারা বস্তুর বন্ধন থেকে মুক্তিপথের সঠিক নির্দেশনাপ্রাপ্ত হওয়া যায়।
‘সিয়াম করা’ অর্থ সপ্ত ইন্দ্রিয় দ্বার দিয়ে যা কিছু বিষয়বস্তু মস্তিষ্কে প্রবেশ করে তার মোহ বর্জন করা। এমন বর্জনের গুরুত্ব যে ব্যক্তি সাক্ষ্য দেয় অর্থাৎ উপলব্ধি করে সেই ব্যক্তিই কেবল এ মাসে সিয়াম করে। অন্যলোকেরা কেবল পানাহারের সময়সূচির বিধান পালন করেই আত্মপ্রসাদ অনুভব করে।
পীড়া এবং ভ্রমণ—এগুলো দৈহিক ও মানসিক উভয় প্রকার হয়ে থাকে। মানসিকভাবে পীড়িত এবং বিষয়স্তুর উপর মনে মনে ভ্রমণরত ব্যক্তির পক্ষে সিয়াম পালন করা সম্ভবপর নয় বলেই তাদের প্রতি নির্দেশ হলো তারা যেন সিয়াম পালনের উপযুক্ত মানসিক যোগ্যতা অর্জনের পর তা পালন করতে যতœবান হয়। ‘পালন করা’ কথা কোরানে নেই, আছে ‘গণনা করা’র কথা। কোরানের কথা হলো, পরবর্তী কালসমূহের অর্থাৎ প্রতিটি ধর্ম আগমনের কালগুলো থেকে আগমনকারী সমস্ত ধর্মকে এক এক করে গণনা করা। ‘গণনা করা’র অর্থ আগমনকারী প্রতিটি ধর্মই যেন তার জ্ঞাতসারে আগমন করে এবং বিদায় গ্রহণ করে। তাহলে বস্তুবাদের মোহের ছাপ তথা শিরিক বা সংস্কার মস্তিষ্কে আবদ্ধ হয়ে থাকে না। সবই ত্যাজ্য ও পরিত্যক্ত হয়ে যায়। এটাই সিয়ামের মূল কথা। সিয়ামের অভ্যন্তরীণ কথাটি প্রতিষ্ঠিত করার জন্যই আনুষ্ঠানিক সিয়াম পালনের ক্ষেত্রেও দৈহিকভাবে অসুস্থ এবং দৈহিক ভ্রমণকারীর জন্য সিয়াম পালন নিষিদ্ধ করে তা পরে পালন করা ‘ওয়াজেব’ অর্থাৎ অবশ্য পালনীয় করা হলো।
‘সহজ’ অর্থ জান্নাতের জীবন এবং ‘কঠিন’ অর্থ জাহান্নামের জীবন (৮৭:৮ ও ৯২:৭)। আল্লাহতালা রবরূপে (সম্যক গুরু) মানুষের সঙ্গেই আছেন। তিনি কখনও চান না যে, তিনি মানুষের কঠিন অবস্থার সঙ্গে অবস্থান করেন। বরং মানুষের সহজ অবস্থার সঙ্গে স্থায়ী হয়ে থাকতে চান। কিন্তু মানুষ কার্যকরীভাবে ইচ্ছে না করলে তার ‘সহজ জীবন’ আল্লাহতালা তাকে দান করতে পারেন না। অর্থাৎ জান্নাত এবং তদূর্ধ্বের স্থান দান করতে পারেন না। এটা তাঁরই রচিত বিধান।
অতএব সিয়ামের যে হেদায়েত বা নির্দেশ আমাদের দেয়া হয়েছে সে নির্দেশের উপরে আমল করে আমাদের মধ্যে আল্লাহকে বড় করে তোলার জন্য ধর্মসমূহের গণনাকার্যের অনুশীলনকে কৃতকার্য করে তোলা একান্ত প্রয়োজন। নির্ধারিত নিয়মে গণনাকার্য সম্পাদন করতে থাকলে বস্তুমোহের ছাপ তথা শিরিক থেকে মুক্ত হওয়া সম্ভবপর হবে। এবং তার ফলে আল্লাহ আমাদের মধ্যে জাগ্রত হয়ে উঠবেন। সব হেদায়েত মানুষের নফসের উপরই দেয়া হয়। নফসের উপরে আল্লাহকে বড় করে তোলার জন্যই হেদায়েত। নফস প্রাধান্য পেলে মানুষের মধ্যে আল্লাহর জাগরণ হয় না। সিয়ামসাধনায় বস্তুর মোহবন্ধন থেকে মানুষ মুক্ত হয়ে যায়। মুক্তমানুষ প্রকৃতিকে জয় করে পুরুষে পরিণত হন। এবং তখনই কেবল আল্লাহর প্রতি মুক্তির কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা সম্ভবপর হয়।
মোরাকাবা মোশাহেদায় আশেকজনা মশ্গুল রয়
ফানা ফিল্লায় দাখেল হলে ইরফানি কোরান তাঁরে শোনায়
বাতেনের ঘরে নূরনবী
পুরুষ কি প্রকৃতি ছবি
পড় দেলকোরান
কর তাঁর বিধান
মনের আঁধার দূরে যাবে ॥
আত্মহারা সুফির কাছে প্রেমের চেয়ে বড় কোনও ধর্ম নেই। এ মহাভাবরাজ্যে গুরু ‘মাশুক’ আর শিষ্য ‘আশেক’। "আশেক বিনে ভেদর কথা কে আর পোছে" কোরান নির্দেশিত ‘দায়েমি সালাত’ তথা সর্বমূহুর্তের নির্বিরাম ধ্যানক্রিয়া মোরাকাবা ও মোশাহেদা’ এ দু ভাগে বিন্যস্ত। ‘মোরাকাবা’ অর্থ আকারের ধ্যান এবং ‘মোশাহেদা’ অর্থ বিষয়ের ধ্যান। গুরুরূপ অখণ্ড মহাআকারের মধ্যে জগতের সব খণ্ড বিষয়ের নিহিতার্থ সুপ্তগুপ্ত আছে। আপন গুরুর রূপধ্যানে নিমগ্নতাই ‘ফানা ফিল্লা’ এবং ক্রমে মুক্তির মন্দিরে ‘বাকা বিল্লা’ পর্যায়ে পৌঁছালে সুফির কোরানজ্ঞান আপন অন্তর হতে উৎসারিত হয়। বাতেনের ঘরে তথা মনোরাজ্যে দেহপাঠ পূর্ণ হলে প্রকৃতিপুরুষভেদ আত্মস্থ করে নবীতত্ত্বের রহস্য সুফির অধিগত হয়ে যায় অনায়াসে। শাঁইজী লালনের পদে পদে এভাবে ছড়িয়ে আছে সুফিচিত্তের গুরুমুখি প্রেমভক্তিযোগ যা কোরানেরই উচ্চাঙ্গিক সিদ্ধিসাধন।
দেলকোরানের সর্বজনীন - সর্বকালীন এ মহাসত্যকে পাশ কাটিয়ে ক্ষমতার ইদুরদৌড় প্রতিযোগিতায় লিপ্ত বাদী ও বিবাদীগণ যত 'উপর চালাকি' করুক না কেন, কারোরই শেষরক্ষা হবে না। জগতজুড়ে বাঙলার লালনবাদী কোরানর ক্রমঃবিস্তার চলছে। এ কোরান তুলে ধরা ছাড়া আর কিছুতেই অত্যাসন্ন সমূহ বিপদ এড়াবার কোনো উপায় নেই।  

Monday, 20 March 2017

বাগে ফদক ও খেলাফত সম্পর্কে ফাতেমা জাহরার (আঃ) বক্তব্য

0 Comments
হজরত ফাতেমা (সাঃ আঃ) বক্তব্যঃ
আবু বকরের (রাঃ) ও খেলাফতের দুর্বিষহ আচরণে জীবনের সকল ক্ষেত্র থেকে নিজেকে গুটিয়ে ফেলা হজরত ফাতেমা (সাঃ আঃ) অত্যন্ত রাগান্বিত হলেন। কয়েক জন নারীকে নিয়ে তিনি মসজিদে নববীতে আবু বকরের দরবারে উপস্থিত হলেন, যেখানে বহু আনসার ও মুহাজির উপস্থিত ছিলেন। তাঁর এবং উপস্থিতদের মধ্যে পর্দা টেনে দেবার পর হজরত ফাতেমা (সাঃ আঃ) এমন ব্যাথাতুর আর্তনাদ করলেন যে কেউ চোখের পানি ধরে রাখতে পারেনি। এরপর তিনি দরবারের সবার সামনে হৃদয়গ্রাহী এক বক্তব্য প্রদান করেন।

মহান আল্লাহ্‌ তালাহ যে অশেষ নেয়ামত দিয়েছেন তার জন্য সকল প্রশংসা একমাত্র তারই প্রাপ্য। এজন্য তার প্রতি আমাদের অফুরন্ত কৃতজ্ঞতা।
তিনি আমাদের যে অবিরাম দয়া ও অনুগ্রহ প্রদান করেছেন এবং অফুরন্ত করুণা আমাদের দান করেছেন তার জন্য আমরা প্রকাশ করি তার প্রতি আমাদের আনুগত্য। তিনি প্রদান করেছেন সকলকে অপরিসীম ও অপরিমিত ভাবে, অনাবিল ও অবারিত ধারায় যা গণনার অতীত, হিসাবের বাহিরে; যা অননুমেয় তুলনার ঊর্ধ্বে, সীমাহীন, চিরন্তন, অনন্ত স্থায়ী ও চির অম্লান। এসব নেয়ামতের ধরণ, প্রকৃতি, পরিমাণ ও সীমানা অনুধাবন করাও মানুষের পক্ষে অসম্ভব। এই সকল নেয়ামতের প্রাচুর্যতা ও অবিরাম ধারা বিরাজমান রাখার লক্ষে তিনি তার সকল প্রশংসা করা ও তার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের জন্য আমাদের আহব্বান জানিয়েছেন।
সকল প্রশংসা আল্লাহ্‌র যিনি আমাদের স্বীয় অন্তরে বিশ্বাস সৃষ্টির মাধ্যমে তার তাকে সাড়া দিয়ে উভয় জগতে সফলকাম হওয়ার সুজগ সৃষ্টি করে দিয়েছেন। আমি এই মর্মে সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ্‌ ছারা কোন কোন উপাস্য নেই, তিনি একক ও অদ্বিতীয়, তার সমতুল্য ও সমকক্ষ আর কেউ নেই। এই সাক্ষ্য আত্মসমর্পণের নির্দেশ বহন করে। এভাবে এই সাক্ষ্য প্রত্যেকের সামর্থ্য অনুযায়ী তাদের অন্তরকে পরিপূর্ণ ও চেতনাকে প্রস্ফুটিত করে।
আমাদের চোখে তিনি দৃশ্যমান নন। তার গুণাবলি বর্ণনা করার ভাষা আমাদের সাধ্যের অতীত। তার অস্তিত্ব ও প্রভাব সম্পর্কে কিছু অনুমান করতে আমরা অক্ষম। যখন কোন কিছুই বিদ্যমান ছিল না তখন তিনি এই বিশ্বজগৎ সৃষ্টি করেছেন। তিনি এই বিশ্বজগতকে অস্তিত্ব দিয়েছেন হয়তো শুধু সৃষ্টিরই কারনে অথবা শুধু অতীত ও ভবিষ্যতের বিদ্যমান উদাহরণ হিসাবে। তিনি জ্ঞান ও প্রজ্ঞার আলোকে এই অস্তিত্ব প্রদান করেছেন এবং আপন শক্তি ও ক্ষমতা বলে তিনি এগুলোকে আকৃতি প্রদান করেছেন।
কিন্তু এই সৃষ্টি সম্ভার না তার কোন প্রয়োজন ছিল আর না এগুলোর আকৃতি রুপ প্রদান তার কোন উপকারের জন্য ছিল। তিনি সীমাহীন ক্ষমতার বহিঃপ্রকাশ ঘতিয়েছেন এবং চেয়েছেন তার এই সৃষ্টি তার ইচ্ছার কাছে আত্মসমর্পণ করুক ও তার প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করুক। তিনি আরও চেয়েছেন তার অপরিসীম ক্ষমতা প্রতিষ্ঠিত হোক ও আমারা তার বাধ্য থাকি এবং তার ঐশ্বরিক লক্ষ অম্লান হোক।  
অতঃপর তিনি তার প্রতি আনুগ্যতের জন্য পুরুস্কার এবং তার আদেশ অমান্যকারীদের জন্য শাস্তির বিধান নির্দিষ্ট করেছেন যাতে এই বিশাল সৃষ্টি জগত তার ক্রোধ থেকে পরিত্রাণ পায় এবং তার সৃষ্টি জান্নাতে স্থান পায়।
আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মদ তার বান্দা ও রাসুল। তিনি তাঁকে এই পৃথিবীতে প্রেরণের পূর্বেই মনোনীত করে রেখেছিলেন। মহান আল্লাহ্‌ তাঁকে সৃষ্টির পূর্বেই তাঁর মর্যাদা ও নাম নির্ধারণ করে রেখেছিলেন। তিনি তাঁকে নবুয়াত প্রদানের পূর্বেই এই পদে অধিষ্ঠিত করে রেখেছিলেন। এ সবকিছুই ঘটেছে যখন সমস্ত সৃষ্টি জগত ছিল গুপ্ত ও অনস্তিতের অন্ধকারে লুক্কায়িত।
আল্লাহ্‌ ভবিষ্যৎ সম্পর্কে অবহিত। কেননা তিনি এর কারিগর ও স্রষ্টা। তাই, তিনি জানতেন এর পরিণতি আর ভবিষ্যৎ, এই বিশ্বজগতে দুঃখ-দুর্দশা এবং এর পরিবর্তিত অবস্থা। আল্লাহ্‌ তার ঐশ্বরিক পরিকল্পনা পরিপূর্ণ করার মানসে এবং তার ইচ্ছা ও নির্দেশ বাস্তবায়নের লক্ষে তার রাসুল কে প্রেরন করেছেন। রাসুল পৃথিবীতে এসে প্রত্যক্ষ করলেন যে, মানবতা বিভিন্ন অনৈতিক ও অসম ধারায় দ্বিধা-বিভক্ত। কেউ আগুনের পূজা করছে। যা সে নিজেই প্রজ্বলিত করেছে, অন্যেরা নিজেদের তৈরি মূর্তিকে পূজা করছে। তাদের অন্তর গুলো আল্লাহ্‌ ও সত্যকে সাক্ষ্য দিলেও কার্যত তা তারা অস্বীকার করছে।
আল্লাহ্‌ ইচ্ছা পোষণ করলেন যে, মুহাম্মদের মাধ্যমে তিনি অন্ধকার দূরীভূত করে (এসব অন্তর গুলোকে) আলোয় উদ্ভাসিত করবেন, তাদের মন থেকে কলুষতা ও অবিশ্বাস দূর করবেন এবং কুয়াশার পর্দা যা তাদের চোখ গুলোকে অন্ধ করে রেখেছে তা বিদুরিত করবেন।
রাসুলের (সাঃ) অতুলনীয় অধ্যবসায় ও অসিম বলিষ্ঠটায় মানব জাতিকে সত্যের পথে আহবান জানিয়ে তাদের হেদায়েতের কাজে আত্মনিয়োগ করেন। এবং তাদের পথভ্রষ্টটার হাত থেকে রক্ষা করেন, তাদের চোখের অন্ধত্ব দূর করেন এবং তাদের অটল ও অবিচল বিশ্বাসের প্রতি দিকনির্দেশনা প্রদান করেন।
অতঃপর আল্লাহ্‌ তাঁকে ফিরিয়ে নেয়ার ইচ্ছা করেন। স্রষ্টা হিসাবে তার ঐশ্বরিক ইচ্ছার আলোকে, তার অসীম ক্ষমাশীল ও সহৃদয়তার নিদর্শন হিসাবে এবং তার সীমাহীন ভালবাসার বহিঃপ্রকাশ হিসাবে তিনি তাঁকে ফিরিয়ে নেন। মুহাম্মদ এখন সকল প্রকার কষ্ট, লাঞ্ছনা ও উৎকণ্ঠা থেকে মুক্ত। তার আত্মা এখন পরম শান্তিতে স্বর্গসুখে অবস্থান করছে। আল্লাহ্‌ একান্ত আনুগত ফেরেস্তা দ্বারা পরিবেষ্টিত হয়ে তিনি এখন আল্লাহ্‌র প্রবিত্র সান্নিধ্যে কালযাপন করছেন।
আল্লাহ্‌ তায়ালার সর্বোৎকৃষ্ট রহমত ও দয়া আমার পিতার ওপর বর্ষিত হোক যিনি তার রাসুল, তার প্রত্যাদেশের ধারক ও তার সবচেয়ে প্রিয়তম সৃষ্টি। তার সৃষ্টিকুলের মধ্যে তিনিই সর্বাধিক পছন্দনীয় ও প্রশংসনীয়। অনন্তকালব্যাপী তার ওপর অবিরাম ধারায় আল্লাহ্‌র অশেষ নেয়ামত, রহমত ও বরকত বর্ষিত হোক।
হে আল্লাহ্‌র বান্দারা! রাসুলের (সাঃ) আদেশ, নির্দেশ ও নিষেধাজ্ঞা মেনে চলা তোমদের ওপর ওয়াজিব। তোমরা তাঁর ধর্ম ও দ্বীনের বাহক। আল্লাহ্‌ তোমাদের নিজ নিজ আত্মার প্রতিনিধিত্ব করার দায়িত্ব দিয়ে পাঠিয়েছেন এবং তার বাণী অন্যদের কাছে পৌঁছানো ও তোমাদের দায়িত্ব। তোমাদের ওপর আল্লাহ্‌ যে দায়িত্ব অর্পণ করেছেন তা পুরাপুরি যথার্থ। কারন পূর্বেই যে শর্তাবলি নির্ধারণ করা হয়েছে তার আলোকে তোমরা তার নির্দেশ পালনে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ও তার প্রতিনিধি হিসাবে তোমাদের সাথে রয়েছে রাসুল’র মাধ্যমে প্রেরিত মহান আল্লাহ্‌র প্রত্যাদেশ। অতএব আমাদের সাথে রয়েছে কুরআন-এ-নাতিক, কুরআন-এ-সাদিক, উজ্জল নূর এবং প্রাচুর্যপূর্ণ ও অত্যুৎকৃষ্ট দীপ্তিময়তা।
এই মহাগ্রন্থের দৃশ্যমান দিক অকাট্য ও স্পষ্ট এবং অন্তর্নিহিত চেতনা সহজবোধ্য। এর বাণীসমূহ দীপ্তিময়, সুস্পষ্ট ও অতি প্রাঞ্জল। এর অনুসারীদের জীবন সাফল্যের ক্ষেত্রে ইরস্নিয়, এরা মহা সম্মানিত। এই মহাগ্রন্থই আল্লাহ্‌র সন্তুষ্টি অর্জনের পথপ্রদর্শক। এই মহাগ্রন্থ তাদের জন্য মুক্তির নিশ্চয়তা দেয় যারা আন্তরিক ও গভীর প্রেমে এর আনুসরণ করে।
এই মহাগ্রন্থের যথার্থ অনুশীলনের মাধ্যমে আমরা যে শিক্ষা গ্রহণ করতে পারি তা হলঃ
-         এর অন্তর্নিহিত মর্মবাণী ও দিকনির্দেশনা;
-         এর মৌলিক বাণী ও ঐশ্বরিক নির্দেশনার বিষয়বস্তু;
-         যা কিছু আমাদের জন্য নিষেধ বা হারাম তা নিয়ন্ত্রনের বিধান;
-         আল্লাহ্‌র বিধান ও আহকামের সুস্পষ্ট বর্ণনা;
-         এর যৌক্তিকতার স্বপক্ষে পর্যাপ্ত উৎকর্ষ;
-         এর যথার্থতার প্রগাঢ়তা;
-         আমাদের জন্য যা কিছু বৈধ তার বর্ণনা;
-         মানবীয় শিষ্টাচারের সুনিপুণ ব্যাখ্যা;
অতএব আল্লাহ্‌ কুরআনের মাধ্যমে আমাদেরঃ
-         ঈমান প্রতিষ্ঠার নির্দেশ দিয়েছেন- বহু ঈশ্বরবাদ থেকে মুক্ত থাকার জন্য;
-         সালাত (দায়েমি ও ওয়াক্তিয়া) প্রতিষ্ঠার নির্দেশ দিয়েছেন – অহংকার ও ঔদ্ধত্য থেকে বিমুক্ত ও বিশোধিত থাকার জন্য;
-         দান – খয়রাতের নির্দেশ দিয়েছেন –নিজ অন্তরকে পরিশুদ্ধ করা এবং রিজিকের প্রসার ঘটানোর জন্য;
-         রোজা রাখার নির্দেশ দিয়েছেন –বিশ্বাসের ভিত দৃঢ় করার জন্য;
-         হজ পালনের নির্দেশ দিয়েছেন –দ্বীন কে নিরাপদ ও শক্তিশালী করার জন্য;
-         ন্যায়পরায়ণতার নির্দেশ দিয়েছেন –পরস্পরের মাঝে সংহতি বজায় রাখার জন্য;
-         আমাদের (আহালে বায়াত) মেনে চলার নির্দেশ দিয়েছেন –সুষ্ঠু শাসনকার্য পরিচালনা ও সংহতি সুদৃঢ় রাখার জন্য;
-         আমাদের (আহালে বায়াত) ধারাবাহিক নেতৃত্ব কে মেনে চলার নির্দেশ দিয়েছেন –তোমাদের ঐক্যমত অটুট রাখার ও অবিচ্ছন্নতার বিচ্যুতি প্রতিরোধের জন্য;
-         জিহাদ (রাসুল বা আহালে বায়াতের ইমামের আদেশে) করার নির্দেশ দিয়েছেন –ইসলামের মর্যাদা বৃদ্ধির জন্য;
-         ধৈর্যশীল ও সংযমী হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন –পরকালের পুরস্কার প্রাপ্তির জন্য;
-         সহানুভূতি, সহমর্মিতা ও সৎ কাজ করার নির্দেশ দিয়েছেন –জনগণের কল্যাণ নিশ্চিত ও নিরপেক্ষতাকে উৎসাহিত করার লক্ষে;
-         পিতামাতার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা ও তাদের অনুগত থাকার নির্দেশ দিয়েছেন –মহান আল্লাহ্‌র ক্রোধ থেকে নিজেকে বাঁচার জন্য;
এর পর ফাতেমা (সাঃ আঃ) বললেন, হে লোক সকল তোমরা অবগত আছ যে আমি ফাতিমা এবং আমার পিতা মুহাম্মদ। আমি যা বলি তাতে কখনো বৈপরীত্য খুঁজে পাবে না এবং আমার আমল ত্রুটিহীন। অবশ্যই তোমাদের মাঝ থেকেই তোমাদের জন্য একজন রাসুল এসেছেন। তাঁর ওপর অর্পিত প্রত্যাদেশ অত্যন্ত ভারী যা বহনে তোমরা অনেক কষ্টের সম্মুখীন হবে তোমাদের নিয়ে তিনি অত্যন্ত উদ্বিগ্ন এবং মুমিনদের প্রতি তিনি অত্যন্ত সদয় ও সহানুভূতিশীল; (তওবা-২৮)
তোমরা যদি শ্রদ্ধার সাথে তাঁর প্রতি দৃষ্টি নিবন্ধ করো এবং তাঁর মহিমান্বিত অবস্থান স্বীকার করো তাহলে তোমরা আনুধাবন করতে সক্ষম হবে যে তিনি শুধু আমারই পিতা, তোমাদের কোন নারীর নয় এবং আমার স্বামীর ভাই, তোমাদের কোন পুরুষের নয়। এর তাঁর সাথে এভাবে সম্পর্কিত হতে পারাটা কতই না সম্মানের!
তিনি মানব জাতির কাছে আল্লাহ্‌র বাণী পৌঁছিয়েছেন এবং আল্লাহ্‌র অসন্তুষ্টির ব্যাপারে সতর্ক করেছেন। তিনি বহু ঈশ্বরবাদের মতবাদকে ঘৃণার সাথে প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি মানব জাতি কে সত্যের পথে, মহান প্রভুর পথে আসার জন্য আহবান জানিয়েছেন, তাদের নিবিড় ভাবে পরামর্শ দিয়েছেন এবং যারপরনাই প্রাণান্তকর চেষ্টা করেছেন জেন তারা অন্ধকার ছেড়ে আলোর পথে ফিরে এসে। তিনি তাদের মূর্তি গুলো ধ্বংস করে দিয়েছেন এবং তাদের দর্প চূর্ণ করে দিয়েছেন। তিনি ততক্ষণ পর্যন্ত তাঁর সংগ্রাম অব্যাহত রেখেছেন যতক্ষণ পর্যন্ত না বাতিলের মিলিত শক্তি বিভক্ত হয় এবং তারা পরাজয় মেনে নিয়ে পৃষ্ঠপ্রদর্শন করতে বাধ্য হয়। অতঃপর অন্ধকারকে বিদীর্ণ করে আলো তার পথ করে নিল, যা সত্য কে তার আসল রুপে উন্মোচিত করল। সত্যের বাহকের দৃঢ় কণ্ঠ তখন হলো আরও দৃঢ় এবং তা ধীরে ধীরে স্তব্ধ করে দিল অবিশ্বাসীদের কুপ্ররোচনা ও সকল শয়তানি কর্মকাণ্ড।
এভাবেই অসৎ মতাদর্শের বিশ্বাসীরা ধ্বংস হয়ে গেল এবং আক্রোশ ও অবিশ্বাসের শেষ যোগসূত্রও বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল।  এরপর তোমরা কালেমা পাঠ করলে যা তোমরা তাদের কাছ থেকে যারা অর্ধ আহারে থাকলেও তাদের মুখমণ্ডল থাকত অজাগতিক এক আলোয় উতদ্ভাসিত।
সংকট পূর্ণ এই সন্ধিক্ষণে তোমরা ছিলে ভয়াবহ এক গহ্বরের প্রান্তসীমায়; (আল-ইমরান-১০৩)
তখন তোমরা ছিলে অসহায়, দুর্বল ও সংখ্যালঘুতোমরা ছিলে এক গ্রাস খাবারের সমতুল্য, যা মানুষের পক্ষে পানি দিয়ে গিলে খাওয়া অসম্ভব ছিল না। তোমরা ছিলে অঙ্গারের ন্যায়, যে কোন ব্যাক্তি তাকে নিমিষের মধ্যে নিশ্চিহ্ন করে ফেলতে পারত। তোমরা ছিলে তেমনই যা বিনা দ্বিধায় পদদলিত করা মোটেও কঠিন কাজ ছিল না। তোমরা এতটাই অপরিণত ও অমার্জিত ছিলে যে তোমরা ময়লা, দুর্গন্ধযুক্ত পানি পান করতে এবং প্রাণীর দেহ ও গাছের পাতা ছিল তোমাদের আহার্য। তোমরা ছিলে সবচেয়ে হীনাবস্থাসম্পন্ন এবং সবার কাছে প্রত্যাখ্যাত। তোমাদের নিয়ে এই ভয় ছিল যে, পাছে সবাই মিলে তোমাদের সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করে না ফেলে।
মহান আল্লাহ্‌ আমার পিতা মুহাম্মদের মাধ্যমে তোমাদের পরিত্রাণ দান করেছেন। অনেক প্রতিকূলতা পেরিয়ে, অনেক উত্থান-পতন, যন্ত্রণা ও তিক্ততার সম্মুখীন হয়ে এবং পশুসম ভাড়াটে বাহিনী, লোলুপ স্বভাবের নেকড়েতুল্য ও ভয়ঙ্কর হিংস্র প্রকৃতির বিদ্রোহীদের সাথে যুদ্ধ করে তিনি এই সফলতা লাভ করেছেন। বার বার তারা যুদ্ধের আগুন প্রজ্বলিত করেছে আর আল্লাহ্‌ তা নির্বাপিত করেছেন (মায়েদা; ৬৮)।
উঠের পিঠে আরোহণ করে দ্রুত বেগে যেয়ে তাদের গলা চেপে ধরার জন্য রাসুল তাঁর চাচাত ভাই কে নিয়োগ করলেন। আর আলী তাদের মস্তক গুলো পদদলিত না করা পর্যন্ত, আপন তরবারি দিয়ে তাদের অগ্নিশিখা গুলো নির্বাপিত না করা পর্যন্ত কখনও যুদ্ধ ক্ষেত্র থেকে ফেরত আসেনি। আল্লাহ্‌র মাহত্য সমুন্নত রাখার জন্য তিনি কঠোর পরিশ্রম করেছেন। তার ইচ্ছা ও নির্দেশ সমুন্নত রাখার জন্য সর্বদা সংগ্রাম করেছেন। তিনি ছিলেন রাসুলের সবচেয়ে প্রিয় আপনজনতিনি ছিলেন বিশ্বাসীদের নেতা। ন্যায়ের স্বপক্ষে তিনি ছিলেন সদা প্রস্তুত, পরামর্শের ক্ষেত্রে ছিলেন আন্তরিক, আল্লাহ্‌র ইচ্ছা পূরণের লক্ষে ছিলেন সদা সন্ধানী, আল্লাহ্‌র পথে ছিলেন সার্বক্ষণিক অক্লান্ত পরিশ্রমে লিপ্ত এবং অবিশ্বাসীদের অভিযোগ ও অন্যায় আচরণের মুখামুখি হওয়ার জন্য সদা প্রস্তুত।
অথচ, তোমরা উচ্ছৃঙ্খল ভোগ-বিলাসে কাল যাপন করেছ। সবার ধরা ছোঁয়ার বাহিরে থেকে জীবনের আরাম আয়েশ ও সুখ শান্তি উপভোগ করেছ এবং অপেক্ষা করেছ সেই সময়ের যখন দিন আমাদের বিরুদ্ধে ঘুরে দাঁড়াবে এবং সেই দুঃসংবাদ কবে তোমাদের কানে পৌঁছাবে। বিপদের দিনে তোমরা সবসময় দূরে সরে থেকেছ এবং যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালিয়ে গেছ।
যখন আল্লাহ্‌ তার নবীগনের ও প্রিয় বান্দাদের পবিত্র ভূমিতে তার রাসুলের আগমন ঘতালেন তখন বিদ্বেষ, শত্রুতা, ও কপটতা তোমাদের মাঝে মাথাচাড়া দিয়ে উঠল যা ধর্মের পবিত্রতাকে আঘাত করতে শুরু করল। যারা নীরবে অসন্তোষ বয়ে বেড়াচ্ছিল তারা মাথাচাড়া দিয়ে উঠল। অখ্যত কুখ্যত অনেকেই মুখ খুলতে শুরু করল। অবিশ্বাসীরা গাধার ডাকের ন্যায় একে অন্যের সঙ্গে কণ্ঠ মিলাতে শুরু করল এবং তোমাদের সঙ্গে মিলিত হল। শয়তান এই সঙ্গে মাথা তুলে দাঁড়াল এবং তোমাদের আহ্বান জানাল। সে তার ছলনার ও প্রতারণার ডাকে তোমাদের কাছ থেকে দ্রুত সাড়া পেয়ে গেল। সে তোমাদের পদক্ষেপ নেয়ার জন্য উদ্বুদ্ধ করতেও সক্ষম হল। এরপর তোমরা রোষের আগুন জ্বালাতে শুরু করলে এবং ক্রোধের দাবানলে আত্মহারা হয়ে পড়লে। তোমরা অন্যের প্রাণী, অন্যের জলাধার ইত্যাদি জোরপূর্বক ব্যাবহার ও জবরদখল করতে শুরু করলে। এসব যখন ঘতছিল তখনও রাসুলের ওফাতের ঘটনা একেবারেই সদ্য ঘটে যাওয়া একটি বিষয়, যার নিদারুণ ব্যাথা তখনও মানুষের হৃদয় থেকে মুছে যায়নি এবং গভীর ক্ষত এতটুকু প্রশমিত হয়নি। এমনকি রাসুল কে তখনও সমাধিস্থ করা হয় নি।
পাছে কোন সামাজিক অশান্তি সৃষ্টি হয় এই খোঁড়া যুক্তি দাঁর করিয়ে তোমরা তোমাদের এই কাজগুলো অত্যন্ত দৃঢ়তার সংগে সম্পন্ন করে চলেছিলে। কিন্তু এর চেয়ে জঘন্যতম যুক্তি এর কি হতে পারে? সাবধান! তারাই ফিতনাতে লিপ্ত আছে। নিশ্চয় জাহান্নাম কাফিরদের গ্রাস করবে; (তওবা; ৪৯)।
হায়! সত্য পথ থেকে তোমরা কতই না দূরে সরে গিয়েছ! তোমরা এ কোন অপ্রত্যাশিত পথে পা বাড়িয়েছ! পথভ্রষ্ট হয়ে তোমরা এ কোন পথে চলতে শুরু করেছ? মহান আল্লাহ্‌র পবিত্র কুরআন তোমাদের হাতেই রয়েছে। এর ঘোষণা সুস্পষ্ট, এর হুকুম পরিষ্কার, এর পথ নির্দেশনা অত্যুজ্বল, এর বিধি-নিষেধ বিশিষ্ট পূর্ণ এবং এর আদেশ স্পষ্টত প্রতীয়মান। তথাপি তোমরা এই ধর্মগ্রন্থ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছ। তোমরা এ থেকে বিমুখ হতে চলেছ? নাকি তোমরা কোন পৃথক কোন ধর্মগ্রন্থ দ্বারা পরিচালিত হতে চাইছ! হায়, আফসোস!
অত্যাচারীরা পবিত্র কুরআনের পরিবর্তে কতই না নিকৃষ্ট এর আদর্শকে অনুসরণ করতে চলেছে; (ক্বাহাফ;৫০)    
যদি কেউ ইসলামের পরিবর্তে অন্য কোন ধর্মের অনুসরণ করে তবে তা তার নিক্ত কখনই গ্রহণযোগ্য হবে না, পরকালে তারা শুধু ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে; (আল ইমরান- ৮৫)
তোমরা সামান্যতম সময়ের জন্যও অপেক্ষা করোনি এই উষ্ট্রি (খেলাফত) তো নির্দিষ্ট সময়ে আপন পথেই নিজের দায় মুক্ত করত এবং শান্ত হয়ে যেত এবং সর্বসম্মত পথেই চলতে শুরু করত। তারপর তোমরা ফিতনার আগুনে ঘৃতাহুতি দিয়েছ এবং এর জ্বলন্ত অঙ্গারে ইন্ধন জুগিয়ে অগ্নিশিখার বিস্তার ঘটিয়েছতোমরা প্রতারক ও প্রবঞ্চক শয়তানের ডাকে সাড়া দিয়েছ। কারন তোমরা মহান আল্লাহ্‌র পবিত্র ধর্মের দীপ্তিমান আলোকরশ্মি নিভিয়ে দিতে এবং তার নির্বাচিত সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ, তার রাসুলের রেখে যাওয়া নিদর্শন ও সুন্নাত সমূহ মুছে দিতে চেয়েছিলে। দুধের ফেনা সরানোর উসিলায় তোমরা এখন মাখন খেয়ে নিয়েছ। তোমরা গোপন চক্রান্ত ও ছলনার আশ্রয় নিয়ে রাসুলের আহালে বায়াতের ক্ষতি করার পরিকল্পনা প্রণয়ন করেছ। আমরা এসব কিছুই ধৈর্যের সাথে এমন ভাবে সহ্য করে নিয়েছি অথচ খঞ্জরের আঘাতে ছিন্ন বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছি এবং আমাদের অন্ত্রগুলো বর্শার ফলায় বিদ্ধ হয়ে পড়েছে। এখন তোমরা দাবি করছ যে, উত্তরাধিকারী থেকে আমরা বঞ্চিত। তারা কি সেইসব কুসংস্কারাচ্ছন্ন পৌত্তলিকদের অধীনেই শাসিত হতে চায়?
বিশ্বাসীদের জন্য আল্লাহ্‌র চেয়ে শ্রেষ্ঠ বিচারক আর কে হতে পারে; (মায়েদা-৫০)।
তোমরা কি এইসব বিষয়ে অবহিত নও? নিশ্চয় তোমরা জানো? উজ্জল সূর্যের মত এ কথা তোমাদের কাছে সুস্পষ্ট যে আমি হলাম পবিত্র রাসুলের কন্যা। ওহে মুসলমানেরা! উত্তরাধিকার সুত্রে প্রাপ্ত আমার পৈত্রিক সম্পত্তি কি এভাবেই বেদখল হয়ে যাবে?
হে আবু কুহাফার সন্তান (আবু বকর)! আল্লাহ্‌র কিতাবে কি এ কথা লিখা আছে যে তুমি তোমার পিতার উত্তরাধিকারী হতে পারবে আর আমি আমার পিতার ক্ষেত্রে তা হতে পারব না? কতই না নিকৃষ্ট সব পন্থা উদ্ভবন করা হয়েছে; (মারিয়াম-২৭)।
মহান আল্লাহ্‌ এই ধর্মগ্রন্থ কি তোমরা সজ্ঞানে পরিত্যাগ ও উপেক্ষা করছ? পবিত্র এই গ্রন্থেই বলা হয়েছে, “সুলাইমান ছিলেন দাউদের উত্তরাধিকারী”; (আল-নামাল-১৬)। এবং নবী জাকারিয়ার (আঃ) ঘটনা বর্ণনা করার সময় উল্লেখ করা হয়েছে, “তোমার মহিমা আমাকে প্রদান করো এমন একজন প্রতিনিধি যিনি হবেন আমার উত্তরাধিকারী এবং ইয়াকুবের বংশেরও উত্তরাধিকারী”; (মারিয়াম-৫)।
আরও বলা হয়েছে, “আল্লাহ্‌র বিধান অনুসারে রক্তের সম্পর্কযুক্ত আত্মীয় স্বজন অন্যান্যদের থেকে বেশি অগ্রাধিকার পাবে”; (আনাফাল-৭৫)।
সন্তানদের উত্তরাধিকার সম্পর্কে আল্লাহ্‌র নির্দেশ হিসাবে ঐ মহান গ্রন্থে আরও বলা হয়েছে যে, “দুই কন্যার অংশের সমপরিমাণ হবে এক পুত্রের অংশ” (নিসা-১১)।
যদি কেউ ধনসম্পত্তি রেখে মারা যায় তবে ন্যায়পরায়ণতার সাথে তা পিতা মাতা ও নিকট আত্মীয় স্বজনদের মধ্যে অসিয়তের মাধ্যমে দান করে যায়। এটা তাদের কর্তব্য, যারা ঐশ্বরিক বিধানের প্রতি পরিপূর্ণ সজাগ থাকে এবং এর ব্যত্যয় থেকে নিজেদের সুরক্ষিত রাখে; (বাকারা-১৮০)।
তোমরা দাবি করছ যে, আমি আমার পিতার উত্তরাধিকারী নই এবং এতে আমার কোন অংশ নেই। কুরআনে কি আল্লাহ্‌ এমন কোন আয়াত নাজিল করেছেন যার ফলে আমার পিতাকে পূর্বোক্ত বিধান থেকে রহিত করা হয়েছে? নাকি তোমরা বলতে চাও যে, আমরা (রাসুল ও আমি) পৃথক দুই আদর্শ বা বিশ্বাসের অনুসারী এর তাই আমরা একে অপরের উত্তরাধিকারের কোন হক রাখি না? আমি এবং পিতা কি একি গোত্র, বংশ ও আদর্শের মানুষ নই? নাকি তোমরা কুরআনের সাধারন ব্যখ্যা ও বিশেষ তাৎপর্য সম্পর্কে আমার পিতা এবং আমার চাচাতো ভাই আলীর চেয়ে বেশি জ্ঞান রাখ? তাই যদি ভেবে থাক, তবে ফাদক কিংবা খেলাফত কিংবা উভয়ই প্রস্তুত রয়েছে, নিয়ে যাও। তবে মনে রেখো, কিয়ামতের দিন তোমাদের অবশ্যই এর মুখামুখি হতে হবে। সেদিন কতই না উত্তম হবে, ঐ শেষ বিচারের দিন, যেদিন স্বয়ং আল্লাহ্‌ হবেন বিচারক, যিনি সর্বশ্রেষ্ঠ এবং রাসুল হবেন ফরিয়াদি।
সে দিন অবিশ্বাসী ও বিপথগামীরা ক্ষতিগ্রস্থ হবে, সেদিন তাদের অনুতাপ কোন উপকারেই আসবে না; (জাসিয়া-২৭)।
মহান আল্লাহ্‌ প্রতিটি দানের বিপরীতেই রয়েছে আমাদের জবাবদিহিতা ও তার পরিণতি। শীঘ্রই তোমরা জানতে পারবে, কারা সেই দুর্ভাগা অসহনীয় কলঙ্কময় যন্ত্রণা যাদের গ্রাস করবে এবং তারা আল্লাহ্‌র চিরন্তন শাস্তি ভোগ করবে; (হুদ-৩৯)।
হজরত ফাতেমা আনসারদের উদ্দেশে বললেন, হে বীরপুরুষ নেতারা, হে জাতীয় সেনারা, হে ইসলামের রক্ষকেরা, আমার ন্যায্য অধিকারের ব্যাপারে তোমাদের এরূপ অনীহা ও দোদুল্যমানতার কারন কি? এই অন্যায়ের প্রতি তোমাদের সমর্থনের কারন কি? আমার পিতা আল্লাহ্‌র রাসুল কি তোমাদের বলেনি যে, প্রতিটি মানুষকে তার সন্তানের অধিকার ভোগের মর্যাদা দিতে হবে? কত স্বল্প সময়ের ব্যবধানেই না তোমরা সব কিছু বদলে দিয়েছ, কত দ্রুতই না তোমরা পথভ্রষ্ট হয়ে পড়েছ এবং বিচ্যুতির সিকার হয়েছ! অথচ আমার অধিকার প্রতিষ্ঠা ও আমার দাবি আদায়ে যথাযথ শক্তি ও সামর্থ্য তোমাদের রয়েছে। নাকি তোমরা ভাবতে বসেছ যে, মোহাম্মদ ওফাতের সাথে সব কিছুর সমাপ্তি হয়েছে। তাঁর ওফাত নিঃসন্দেহে একটি মহাদুর্যোগসম ঘটনা, অসহনীয় এই কষ্ট-যন্ত্রণা, গভীর এই বিচ্ছিন্নতা। তাঁর অনুপস্থিতি আমাদের ঐকে ফাটল ধরিয়েছে, তাঁর বিয়োগ-ব্যথায় পৃথিবী হয়ে পড়েছে অন্ধকারাচ্ছন্ন, গ্রহ-নক্ষত্র হয়ে পড়েছে শোকাচ্ছন্ন, সূর্য-চন্দ্র হয়ে পড়েছে গ্রাসাচ্ছন্ন, পাহাড়-পর্বতের শির নুয়ে পড়েছে, সকল প্রত্যাশা আজ হতাশায় পরিণত হয়েছে। তাঁর গৃহের পবিত্রতাকে অমান্য করা হয়েছে। তাঁর মহা প্রণয়ের পর যার যার প্রাপ্য সম্মান, শ্রদ্ধা পদদলিত করা হয়েছে। আল্লাহ্‌ শপত! এটাই রাসুলের ওফাত মানুষের জন্য গভীরতম দুঃখের ঘটনা এবং ভয়াবহতম এক যন্ত্রণার কারন। আর কোন কষ্টই এতটা অসহনীয় বা এত বেশি দুর্ভাগ্যজনক নয়।
হে কিলাহ’র(আনসার) সন্তানেরা! তোমরা যারা আমাকে দেখতে ও শুনতে পাচ্ছ, আমার চার পাসে সমবেত হয়ে আছ, আমার আহ্বান  তোমাদের কানে প্রবেশ করছে, তথাপি কি উত্তরাধিকার সুত্রে প্রাপ্ত আমার পিতার সম্পত্তি জবরদখল হয়ে যাবে? এখানে কি ঘটেছে তা তোমরা ভাল করেই জানো। তোমাদের রয়েছে যথেষ্ট জনবল, শক্তি, সম্পদ ও উপায়। তোমাদের হাতে মজুদ রয়েছে যথেষ্ট অস্ত্র সম্ভার। বার বার আমি আহ্বান জানাচ্ছি কিন্তু তাতে তোমরা সাড়া দিচ্ছ না। সাহায্যের জন্য এই আকুল আবেদন জা তোমরা শুনতে পাচ্ছ কিন্তু আমাদের উদ্ধারে এগিয়ে আসছ না। তোমাদের বীরত্ব সুবেদিত এবং অন্যের কল্যাণে এগিয়ে আসাটাও প্রশংসনীয়। তোমরা সেই নির্দিষ্ট গ্রোত্র যাদের পূর্ব থেকেই মর্যাদা প্রদান করা হয়েছে। আহালে বায়াতের পাশে থাকার জন্য রাসুল তোমাদেরই নির্বাচিত করেছেন। তোমরা অবিশ্বাসী আরবদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছ এবং অপরিসীম দুঃখ কষ্ট সহ্য করেছ। তোমরা যুদ্ধবাজ গোত্রগুলোর বিরুদ্ধে অবিরাম লড়াই করেছ এবং সবচেয়ে অনমনীয় মুশরিকদেরও ছত্রভঙ্গ করেছ এবং তাদের পালিয়ে যেতে বাধ্য করেছ। তোমরা কখনও আমাদের অবাধ্য হওনি, আমাদের পাশে থেকে আমাদের নেতৃত্বে ইসলামের বিজয় নিশ্চিত করেছ। জনগণ এর সুফল পেতে শুরু করেছিল। অবিশ্বাসীদের খোঁড়া যুক্তি ধুলায় মিশে গিয়েছিল এবং অন্যায় ও অসত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত তাদের দম্ভের প্রচণ্ডতা নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছিল। ধর্মের প্রতি অবিশ্বাস ও বহু ঈশ্বরবাদ অগ্নিশিখা প্রশমিত হয়ে গিয়েছিল। বিদ্রোহের কণ্ঠস্বর স্তিমিত হয়ে গিয়েছিল ইসলামের বিধান পুরোপুরি প্রতিষ্ঠা হয়েছিল।
আজ তোমরা কেন দ্বিধান্বিত হয়ে পড়েছ? যে সত্য পরিপূর্ণ ভাবে প্রকাশিত হয়েছিল আজ কেন তাকে তোমরা গোপন করছ? এতদূর অগ্রসর হওয়ার পর আজ কেন তোমরা প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করার পথে পা বাড়িয়েছ। ঈমান আনার পর আবার কেন তোমরা শিরকের দিকে ধাবিত হচ্ছ? যারা প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেছিল, রাসুলকে বহিষ্কার সিদ্ধন্ত নিয়েছিল এবং তোমাদের বিরুদ্ধচারন করেছিল তোমরা কি আজ তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে না। কি হল আজ তোমাদের? তোমরা কি তাদের ভয় পাও!
সত্যিকারের মুমিনের জন্য আল্লাহ্‌ ছাড়া এর কাউকে ভয় পাওয়া সমীচীন হবে না; (আত-তাওবা-৩১)।
আজ আমি দেখতে পাচ্ছি যে তোমরা সত্যের পথ থেকে দূরে সরে গিয়েছ। ন্যায্য অধিকারের আলোকে নেতৃত্ব যার প্রাপ্য তোমরা তাঁকে দূরে ঠেলে দিয়েছ। তোমরা আরাম আয়েশ ও সহজলভ্যতার সাথে সমঝোতা ক্রেছাবন দুঃখ কষ্টময় জীবন থেকে পালিয়ে সুখ সম্ভোগের জীবন বেছে নিয়েছ। যে আদর্শ তোমরা লালন ও ধারন করেছিলে তা তোমরা নিজেদের চোখের আড়াল করে দিয়েছ এবং যে সত্য গ্রহণ করেছিলে তা পরিত্যাগ করেছ।
যদি তোমরা এবং বিশ্বের সকলেই অকৃতজ্ঞ হয়ে যাও, তবু আল্লাহ্‌ কারো মুখাপেক্ষী নন এবং তিনি সকল প্রশংসার অধিকারী; (ইব্রাহিম-৮)।
ভুলে যেওনা, আমার যা বলার ছিল তা আমি বলেছি। সবকিছু জেনে শুনেই তোমরা আমাদের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছ। কারন তোমাদের অন্তর গুল এখন ষড়যন্ত্র ও বিশ্বাসহীনতায় পরিপূর্ণ হয়ে গেছে। সত্যি হতাশা ও বেদনা আমাকে এতটাই দহন করছিল যে, নিরুপায় হয়েই আমাকে এসব বলতে হয়েছে, আর তাই তো, দুঃখ ব্যথায় পরিপূর্ণ আমার অন্তরের কষ্ট কিছুটা লাঘব হল। পরিস্থিতির কারনে আমি যে প্রচণ্ড রাগে জর্জরিত ছিলাম তা কিছু তা কম হল। কারন আমি তোমাদের সামনে আমার যুক্তি সংগত দাবি উত্থাপন করতে পেরেছি, অন্যায়ের মুখোস খুলে দিয়েছি এবং সত্য কে উন্মোচিত করেছি, যেন তোমরা কেউ কোনদিন কোন অজুহাত দাঁড় করাতে না পার। অতএব তোমরা যদি এমনই চাও তাহলে এই খেলাফত এবং আর যা কিছু চাও, তা নিয়ে যাও এবং তা আঁকড়ে ধরে থাক। তবে স্মরণ রেখো, তোমাদের জন্য এই খেলাফত বাহন যথার্থই যন্ত্রণাদায়ক প্রমাণিত হবে। কেননা অন্যায় ভাবে দখলের স্থায়িত্ব কখনোই শুভ হয় না। আর পা-দানিগুলো অমসৃণ, এর আসন গর্তে পরিপূর্ণ। আল্লাহ্‌র অনন্ত ক্রোধের চিহ্নাবলি এতে লিপিবদ্ধ করা আছে। অনাদি কলঙ্ক এর অবিচ্ছেদ্য অংশ। আল্লাহ্‌র ক্রোধাগ্নিতে এই প্রজ্বলিত হবে, যা হ্রদয় কে করে দিবে অশান্ত। তোমরা যা কিছুই করো না কেন, সবই আল্লাহ্‌র দৃষ্টির অন্তর্ভুক্ত। যারা মিথ্যার পথে চলছে তারা অতি সত্বরই জানতে পারবে যে কত ভয়াবহ পরিণাম তাদের জন্য অপেক্ষা করছে। আমি তাঁরই কন্যা যিনি তোমাদের এক ভয়াবহ শাস্তির ব্যাপারে সাবধান করে গেছেন।
সুতরাং তোমরা তোমাদের মত কর্মসম্পাদন করতে থাক, আমরা আমাদের মতো চলি। আর অপেক্ষা করো, আমরাও অপেক্ষায় থাকব; (সূরা হুদ-১২১-১২২)।
এরপর আবু বকর (রাঃ) জবাবে বললেন, হে রাসুল কন্যা! নিঃসন্দেহে আপনার পিতা বিশ্বাসীদের জন্য ছিলেন স্নেহশীল, দয়ালু, সান্তনা দাতা ও সহানুভূতিশীল এবং অবিশ্বাসীদের জন্য রয়েছে আল্লাহ্‌র ভয়াবহতম শাস্তি এবং কঠোরতম প্রতিদান। গোত্রীয় বিচারে তাঁকে আমরা আপনার পিতা হিসাবে পাই, অন্য কোন নারীর নয় এবং নিঃসন্দেহে তিনি ছিলেন আপনার স্বামীর ভাই, অন্য কোন সুহ্রদের নয়। রাসুল আলী কে তাঁর ঘনিষ্ঠ সহচর হিসাবে স্থান দিতেন। এবং আলী রাসুলের সকল সংঘাতময় পরিস্থিতিতে সর্বাধিক সমর্থন প্রদান করতেন। আপনাকে যারা ভালবাসতে সক্ষম হয়েছে তারা অবশ্যই আশীর্বাদ প্রাপ্ত ও সৌভাগ্যবান। আর যারা বিরোধিতা করেছে তারা নিঃসন্দেহে অভিশপ্ত ও ধ্বংসপ্রাপ্ত। কারন আপনি রাসুলের পরিবারভুক্ত, যারা সর্বাধিক পবিত্র ও সর্বশ্রেষ্ঠ মর্যাদা সম্পন্ন হিসাবে নির্ধারিত। মঙ্গল ও করুণা প্রাপ্তির ক্ষেত্রে আপনারা (আহালে বাইত) আমাদের জন্য অনুসরণ যোগ্য। আপনারা আমাদের জন্য জান্নাত প্রাপ্তির পুরোধা। আর আপনি, নিঃসন্দেহে নারীদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠা। আপনি সর্বশ্রেষ্ঠ ও সর্বশেষ রাসুলের কন্যা। আপনি যা বলেন তা ই সত্য। জ্ঞানের সর্ব শিখরে আপনার অবস্থান। আপনার অর্জিত অধিকার থেকে আপনাকে বঞ্চিত করার কোন ইচ্ছাই আমাদের নাই এবং আপনার বানীর সত্যতা ও আমরা অস্বীকার করতে চাই না। আল্লাহ্‌র শপথ! আমি আল্লাহ্‌র রাসুলের মত ধারার বিপক্ষে এতটুকু ও অগ্রসর হই নি এবং তাঁর অনুমোদনের বিপরীতে ও কিছু করিনি। নেতৃত্বে অবস্থানকারীরা কখনোই জনগণের সাথে মিথ্যাচার করতে পারে না। আমি মহান আল্লাহ্‌কে সাক্ষ্য মানছি এবং তিনি সাক্ষী হিসাবে যথেষ্ট।
আমি আল্লাহ্‌র রাসুল কে বলতে শুনেছি, আমরা যারা আল্লাহ্‌র রাসুল তারা বংশধরদের জন্য কোন সোনা রুপা রেখে যাই না, না কোন বসত বাটি বা জমি জমা রেখে যাই। আমরা রেখে যাই শুধু ধর্ম গ্রন্থ, এর জ্ঞান ভাণ্ডার, পাণ্ডিত্য আর নবুয়াত। জীবিকা নির্বাহের জন্য অথবা দৈনন্দিন জীবনের বাস্তবিক চাহিদা পূরণের জন্য আমাদের যা কিছু আছে তা শাসকের নিয়ন্ত্রণে থাকবে এবং তিনি প্রয়োজনের আলোকে সেগুলি ব্যবহার করবেন। আপনি যা দাবি করছেন তা আমরা যুদ্ধসামগ্রী ক্রয় করার জন্য সংরক্ষণ করেছি যেন মুসলিমরা আর সাহায্যে ভালভাবে যুদ্ধ করতে পারে, অবিশ্বাসীদের বিরুদ্ধে জিহাদে শরিক হতে পারে এবং যে সকল বিদ্রোহী মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে তাদের পুরোপুরি দমন করতে পারে। এটা আমার একার সিদ্ধন্ত নয়; সকল মুসলমানের সর্বসম্মতিক্রমে এই সিদ্ধন্ত নেয়া হয়েছে। আমি যে সিদ্ধান্ত নিয়েছি তাতে কোন বল বা শক্তি প্রয়োগ করা হয় নি। আর এই দেখুন, এগুলো আমার সম্পত্তি। এখানে যা কিছু রয়েছে সবই আমি আপনাকে দিয়ে দিলাম। আমি এগুলো আপনাদের কাছে কখনো ফেরত চাইব না। এগুলো কারো জন্য সংরক্ষণ করে রাখার দরকার নাই। আপনি আপনার পিতার গোত্রের প্রধান এবং সবচেয়ে অগ্রগণ্য। আপনার বংশধরদের জন্য আপনি বৃক্ষ স্বরূপ এবং শ্রদ্ধেয়জন। আপনি যা বলবেন তা অস্বীকার করার কিংবা নবীকন্যা হিসাবে আপনার সম্মান ও মর্যাদা ক্ষুণ্ণ করব এমন দুঃসাহস আমাদের নাই। আমার ব্যাক্তিগত মতামত যা-ই হোক না কেন, এক্ষেত্রে আপনার সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত বলে গণ্য হবে। কিন্তু আপনি কি প্রত্যাশা করেন যে, এই বিষয়ে আমি আপনার পিতার বক্তব্যের বিপক্ষে অবস্থান নেব?
এর পর ফাতিমা (রাঃ) বললেনঃ
সকল প্রশংসা একমাত্র আল্লাহ্‌র। আবু কুহাফা তোমার বক্তব্য কতই না অযৌক্তিক ও অস্বাভাবিক। আমার পিতা কখনোই পবিত্র কুরআনের সাথে অসঙ্গতিপূর্ণ কোন কিছু বলেননি বা করেননি। তিনি এর নির্দেশেরও কখনো কোন বিরোধিতা করেননি। বরং তিনি পূর্ণ আস্থার সাথে পরিপূর্ণ ভাবে একে অনুসরণ করেছেন এবং এর প্রতিটি পারা ও আয়াত অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছেন। আপনারা কি তবে বিশ্বাস ভঙ্গ করে মিথ্যা উদ্ভাবনের মাধ্যমে অন্যায় ভাবে তাঁকে দোষারোপ করার জন্য একত্র হয়েছেন? তাঁর ওফাতের পর আপনাদের এসব পদক্ষেপ তাঁর জীবদ্দশায় তাঁকে হত্যার চক্রান্তের সাথে সংগতি পূর্ণ মনে হচ্ছে। এখন এই গ্রন্থই আমাদের বিচারক যা সত্য মিথ্যার প্রভেদ সুস্পষ্ট ভাবে তুলে ধরেছে। এখানে {জাকারিয়া (আঃ)সম্পর্কে} বলা হয়েছেঃ
“আমার কাছ থেকে উত্তরাধিকার সুত্রে প্রাপ্ত হবে এবং ইয়াকুবের পরিবার থেকে”; (মারিয়াম-৬)।
আরও বলা হয়েছে,
“সুলায়মান প্রাপ্ত হয়েছিলেন দাউদ থেকে”; (আল-নামাল-১৬)।
আল্লাহ্‌ এভাবেই যার যার প্রাপ্য অংশের সুস্পষ্ট বর্ণনা দিয়েছেন। উত্তরাধিকারীর ক্ষেত্রে কি বিধান হবে তাও বলেছেন। পুরুষ ও নারীর ক্ষেত্রে বণ্টনের পরিমাণ কি হবে তাও বেলেছেন। এভাবেই আল্লাহ্‌ অবিশ্বাসীদের সকল খোঁড়া যুক্তি চূর্ণ করে দিয়েছেন। আগামী প্রজন্মের জন্য এভবেই সকল দ্বিধা দ্বন্ধ ও সন্দেহ দূর করেছেন। নিশ্চয় আপনার বিবেক আপনার সাথে প্রতারনা করছে এবং আপনাকে ভুল পথে পরিচালিত করছে। কিন্তু আমি অত্যন্ত সুচিন্তিত ভাবেই আমার অবস্থান গ্রহণ করেছি।
“তুমি যখন কোন সিদ্ধান্ত আরোপ করো তখন তুমি আল্লাহ্‌র সাহায্য প্রার্থনা করো”; (ইউসুফ-১৮)।
এরপর আবু বকর (রাঃ) বললেনঃ নিশ্চয় আল্লাহ্‌ সত্যের পথে রয়েছেন এবং তাঁর রাসুল ও রাসুলের কন্যাও সত্য কথা বলছেন। নিঃসন্দেহে আপনি জ্ঞান আলোকের সূতিকাগার নেতৃত্ব ও করুণার উৎসস্থল, বিশ্বাসের স্তম্ভ এবং আল্লাহ্‌র চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের প্রস্রবণ ধারা। আমি আপনার যুক্তি অস্বীকার করছি না বা আপনার বক্তব্য প্রত্যাখ্যান ও করছি না। কিন্তু এখানে আপনার ও আমার মাঝে উপস্থিত মুসলমানেরা রয়েছে, যারা আমাকে এই খেলাফতে অধিষ্ঠিত করেছে এবং যে মতামত আমি ব্যক্ত করেছি তা এদেরই সম্মতিক্রমে। কারন আমি নিজের মত বা ধারনা যে নির্ভুল তৎসম্বন্ধে অতিমাত্রায় অনড় স্বভাবের নই কিংবা স্বনির্ধারিত বা স্বেচ্ছাচারী কিংবা স্বার্থ সাধনে ব্যাস্ত এমন প্রকৃতির কোন ব্যক্তি নই। এর এগুলোই আমার স্বপক্ষের যুক্তি।
এরপর ফাতেমা (সাঃ আঃ) বললেনঃ
হে মুসলমানেরা! তোমরা মিথ্যার আশ্রয় গ্রহণ করেছ এবং অতিশয় ঘৃণ্য ও অনিষ্টকর এক কর্মযজ্ঞ দেখেও চোখ বন্ধ করে আছ। তোমরা কি পবিত্র কুরআনকে গভীর ভাবে পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ করো না? নাকি তোমাদের অন্তর গুলো মোহর অঙ্কিত হয়ে গেছে; (মুহাম্মদ-২৪)।
বস্তুত তোমাদের অন্তর গুলো অসৎ কর্মের আতিশয্যে ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে গেছে যা করতে তোমরা অভ্যস্থ; (মুতাফফিফিন-১৪)।
তোমাদের শ্রবণশক্তি ও দৃষ্টি শক্তি গুলো ফাঁদের জালে আটকে গেছে। তোমরা যে সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছ তা অত্যন্ত অনৈতিক ও অধার্মিকতা পূর্ণ। তোমরা চলেছ অসৎ পথে। পারস্পারিক সমঝোতার মাধ্যমে তোমরা বিদ্বেষকে বেছে নিয়েছ। আল্লাহ্‌র শপথ! বেশি ভারী হয়ে উঠবে তোমাদের জন্য এই বোঝা বহন করা এবং ধ্বংস হবে এর শেষ পরিণতি। একদিন সকল পর্দা উন্মোচিত হবে, পর্দার আড়ালে পুঞ্জিভূত সকল দুঃখ কষ্ট, যন্ত্রণা বেদনা, অন্যায় অত্যাচার পরিস্ফুটিত হয়ে পড়বে। সেদিন আল্লাহ্‌র পক্ষ থেকে এর এমন এক প্রতিদান তোমরা পাবে যা তোমরা ধারনাও করতে পারছ না।
যারা মিথ্যার ওপর অটল ছিল তারা সেদিন ধ্বংস প্রাপ্ত হবে; (মুমিন-৭৮)।
ক্ষমা প্রত্যখানঃ
আবু বকর(রাঃ) এবং উমর (রাঃ) আলীর (আঃ) সাহায্যে ফাতিমার (সাঃ আঃ) সঙ্গে সাক্ষাতের অনুরধ করলে ফাতিমা (সাঃ আঃ) অনুমতি দিলেন। তারা ফাতিমা (সাঃ আঃ) সামনে উপস্থিত হলে তিনি অন্য দিকে মুখ ঘুরিয়ে রাখলেন। তাদের কর্মের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করলে ফাতিমা (সাঃ আঃ) প্রশ্ন করলেন আমি তোমাদের রাসুল (সাঃ) এর কিছু কথা বলব, তোমরা কি তা গ্রহণ ও মান্য করবে?
“অবশ্যই” তারা জবাব দিলেন।
ফাতিমা (সাঃ আঃ) বললেন, আমি আল্লাহ্‌র কসম দিয়ে জিজ্ঞাসা করছি, তোমরা রাসুলকে (সাঃ) বলতে শুনেছ, ফাতিমার সন্তুষ্টি আমার সন্তুষ্টি আর ফাতিমার ক্রোধ আমার ক্রোধ। আবার, যে আমার কন্যা ফাতিমাকে ভালবাসে সে পক্ষান্তরে আমাকেই ভালবাসে, যে আমার কন্যা ফাতিমাকে সন্তুষ্ট করে, সে আমাকেই সন্তুষ্ট করে। তোমরা কি শোন নি?
হ্যাঁ, আমরা রাসুল (সাঃ) কে এমনটা বলতে শুনেছি। তারা নিশ্চিত করলেন।
ক্ষিপ্রতার সাথে ফাতিমা (সাঃ আঃ) আবু বকর (রাঃ) ও তার সাথিদের উদ্দেশ করে বললেন, আমি আল্লাহ্‌ ও তার ফেরেশতাদের সাক্ষী করে বলছি যে, তোমরা আমাকে অসন্তুষ্ট করেছ এবং আর কোনদিন সন্তুষ্ট করতে পারবে না। অবশ্যই আমি রাসুলের (সাঃ) সাথে মিলিত হয়ে তোমাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করব। তার পর আরও তীব্র ভাষায় ফাতিমা (সাঃ আঃ) তাদের উদ্দেশ করে বলেন, আল্লাহ্‌র কসম আমি প্রত্যেক নামাজে তোমাদের ওপর আল্লাহ্‌র লানাত প্রদান করব। ফলে আবু বকর (রাঃ) ও উমর (রাঃ) ফাতিমার (সাঃ আঃ) সন্তুষ্টি অর্জন না করেই ফিরে গেলেন।    
হজরত জয়নাব বিনতে আলী (রাঃ), আবু তালেব আত-তাব্রিজি। (পৃষ্ঠা ৭৩-৯৫) 

Monday, 13 March 2017

ইয়েমেনের চোরা বালিতে সৌদি রাজাগন

0 Comments
ইয়েমেনের রাজনৈতিক ইতিহাসের কথা: ইয়েমেন মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম প্রাচীন বাণিজ্যকেন্দ্র এবং এই বাণিজ্যকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল এক সমৃদ্ধশালী দেশ। বাণিজ্য এবং কৌশলগত ভৌগলিক কারণে এই অঞ্চলের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিল পার্সিয়ান, অটোমান, ব্রিটিশ। বর্তমানের ইয়েমেন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ইতিহাস দেখতে হলে ফিরে যেতে হবে ৭০০ শতকের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে। তখন ইসলামের প্রসার চলছে দিকে দিকে। খলিফা ইসলাম প্রচারের জন্য একের পর এক রাজ্য জয় করে চলেছেন। রাজ্য জয় হলে ধর্মের সাথে পাওয়া যায় প্রভাব, প্রতিপত্তি, রাজনীতি ও অর্থনীতির নিয়ন্ত্রণ। ক্ষমতা দখল করে ইমামের উত্তরসূরি শিয়া মুসলিমরা ইয়েমেন শাসন করে আসছিল তখন। এরপরে ১১ শতকে ইয়েমেন সরাসরি খলিফার শাসনে চলে আসে। খলিফার শাসন আমলেই ইয়েমেন অটোমান সাম্রাজ্যের আক্রমণের শিকার হয়, দখল করে নেয় দেশটির দক্ষিণাঞ্চল। রুটির মত ভাগ হয়ে যাওয়া দেশটির উত্তরাঞ্চলের দখল নেয় ব্রিটিশ সাম্রাজ্য। ১৯১৮ সালে অটোমান শাসকদের কবল থেকে মুক্ত হলেও ইয়েমেন ১৯৬৭ সাল পর্যন্ত ব্রিটেনের কলোনি হিসেবে পরাধীনতার ঘানি ও গ্লানি বহন করেছে। তখনও ইয়েমেন দেশটি উত্তর ইয়েমেন ও দক্ষিণ ইয়েমেন দুইভাগে বিভক্ত ছিল। উত্তর ইয়েমেন শিয়া আর দক্ষিণ ইয়েমেনে কমিউনিজমের চর্চা চলছিল। ১৯৯০ সালের ২২ মে ইয়েমেনের একটা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ দিন। এইদিন দুই ইয়েমেন মনে করে এখনই সময় সব ভেদাভেদ ভুলে গিয়ে একত্রিতভাবে একটি অভিন্ন রাষ্ট্র গঠন করা এবং পুনর্জন্ম নেয়া এই দেশের প্রাতিষ্ঠানিক নাম দেয়া হয় রিপাবলিক অফ ইয়েমেন।
ইয়েমেনে কিভাবে বেজে উঠল যুদ্ধের নাকাড়া:  ২০১১ সালে আরব বসন্তে জেগে উঠল যত জীর্ণ প্রাণ। ইয়েমেনের রাজধানী সা’নায় দুর্নীতি বিরোধী শ্লোগান দিতে দিতে জড়ো হতে লাগল হাজার হাজার গণমানুষের জোয়ার। সেই জোয়ারের ঢেউতে দুর্নীতি ও আর্থিক অনিয়মের অভিযোগে ভেসে যান ইয়েমেনের তখনকার প্রেসিডেন্ট আলী আব্দুল্লাহ সালেহ। সালেহ’র সহকারী আবেদ রাবো হাদি এগিয়ে আসেন শূন্য স্থান পূরণের আশায়।  গণজোয়ার কিছুদিনের মধ্যে গণরোষে পরিণত হয়। দেশজুড়ে দেখা দেয় অসন্তোষ। অপরিকল্পিত ও অনিয়ন্ত্রিত আন্দোলনের ফলে দেখা দেয় জাতীয় রাজনৈতিক অস্থিরতা। এই এই রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং গনরোষের সুযোগ কাজে লাগিয়ে আরব উপদ্বীপের রাজনৈতিক রঙ্গমঞ্চে ঢুকে পড়ে আল কায়েদার মত ভয়ানক ইসলামী সন্ত্রাসী সংগঠন। ২০১১ সালের রাজনৈতিক অস্থিরতাকে কাজে লাগিয়ে উগ্র মৌলবাদী সংগঠনটি ইয়েমেনের দক্ষিণাঞ্চল দখল করে কায়েম করেছে সন্ত্রাসের রাজত্ব। এই রাজনৈতিক অস্থিরতায় জন্ম নেয় আরো একটি বিদ্রোহী গোষ্ঠী। যার নাম হুতি আন্দোলন। হুতি বিদ্রোহীরা নিজেদেরকে আনসার আল্লাহ (আল্লাহর সমর্থনকারী) বলে ঘোষণা দেয়। ইয়েমেনের সরকারের বিপক্ষে দশকব্যাপী চলমান আন্দোলন করে হুতি বিদ্রোহীরা ইয়েমেনের শিয়া অধ্যুষিত উত্তরাঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের দখলে নিয়ে নেয়। এদিকে হাদির সরকারের জনপ্রিয়তা দিনকে দিন তলায় এসে ঠেকেছে। আর বিদ্রোহীরা ইয়েমেনে সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে গ্রহণযোগ্যতা অর্জনের চেষ্টা করছে। ২০১৪ সালে যখন হুতি বিদ্রোহীরা ইয়েমেনের রাজধানী সা’নায় প্রবেশ করে তখন প্রাণের ভয়ে প্রেসিডেন্ট আবেদ রাবো হাদি দক্ষিণাঞ্চলের শহর এডেনে পালিয়ে যান। প্রেসিডেন্ট আবেদ রাবো গণমাধ্যমে অভিযোগ করেন হুতি বিদ্রোহীরা অবৈধভাবে বন্দুকের মুখে ক্ষমতা দখল করেছে। অন্যদিকে হুতি বিদ্রোহীরা প্রচার করতে লাগল সীমাহীন দুর্নীতিগ্রস্ত হাদির বিরুদ্ধে এটা সর্বাত্মক প্রতিরোধ এবং গণজাগরণ।
সৌদি আরব এবং ইরান কিভাবে যুদ্ধে যুক্ত হলো: ইয়েমেনের সাথে সৌদি আরবের ১১০০ মাইলের সীমান্ত আছে। সুতরাং ইয়েমেনে অব্যাহতভাবে শিয়া হুতি বিদ্রোহীদের উত্থান সৌদি আরবের দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়াল। সুন্নি প্রধান সৌদি আরব ইয়েমেনে শিয়া সম্প্রদায়ের উত্থানকে শিয়া অধ্যুষিত চির প্রতিদ্বন্দ্বী আঞ্চলিক শত্রু ইরানের ইন্ধন থাকতে পারে বলে ধারণা করে। ইরানকে উচিৎ শিক্ষা দিতে সৌদি আরব কাতার, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, মিশর, মরক্কো, জর্ডান, সুদান, সেনেগালকে সাথে কৌশলগত মৈত্রী গড়ে তোলে। মৈত্রীর সমর্থনে থাকল আমেরিকা, ফ্রান্স ও ইংল্যান্ড। ২০১৫ সালের মার্চ থেকে সৌদি আরবের নেতৃত্বে মিত্রবাহিনী ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহী অবস্থানে ক্রমাগত বিমান হামলা চালানো শুরু করে। এখন সৌদি আরব ইয়েমেনে যে বোমা ফেলছে তার গায়ে লেখা মেইড ইন আমেরিকা, আরবের সামরিক বাহিনী যে বিমানে বোমা বহন করে হুতিদের মাথায় আর বাসস্থানে ফেলে দিয়েছে সে বিমানগুলো কেনা হয়েছে ইংল্যান্ড থেকে, যে পাইলটরা হুতিদের মৃত্যু উপহার দিয়ে আসে তারা আমেরিকা থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে আসে।বিতর্কের শুরু থেকেই ইরান হুতি বিদ্রোহীদের সাথে তাদের কোন সম্পর্ক বা যোগাযোগ অস্বীকার করে আসছে। যদিও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কর্মকর্তাগণ দাবী করেছে ইরান, ইয়েমেনের প্রতিবেশী ওমানের মাধ্যমের অস্ত্র চোরাচালানি করেছে এবং তাদের কাছে প্রমাণ আছে। ইয়েমেনের হুতি শিয়া এবং ইরানের শিয়া একই মতাদর্শের হলেও তাদের মাঝে ধর্মীয় আচরণগত পার্থক্য আছে। ইরানের শিয়া মতাবলম্বীরা বারোজন ইমামের পরম্পরা মেনে চলেন। পক্ষান্তরে ইয়েমেনের শিয়ারা ইমাম হুসাইনের পৌত্র জায়েদ ইবনে আলীর প্রচারিত অপেক্ষাকৃত উদার নীতি আদর্শের ধর্ম চর্চা। জায়েদের অনুসারী শিয়ারা ধর্মের বিষয়ে পরিবর্তনে বিশ্বাসী এবং তারা মানুষের অতিমানবিকতায় বিশ্বাস করে না। জায়েদ পন্থী শিয়াদের বিস্তার ঘটেছে পাহাড়ি আদিবাসী গোত্র মাঝে। জায়েদ পন্থী শিয়া ইয়েমেনে ১৯৬২ সাল পর্যন্ত রাষ্ট্র পরিচালনা করেছিল। কৌশলগত সীমাবদ্ধতার কারণে ইরান বাস্তবে ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের অল্প বিস্তর রাজনৈতিকভাবে সমর্থন যুগিয়ে যাচ্ছে হয়ত সামরিক দিক দিয়েও তাদের সাহায্য করে থাকে। কিন্তু বিগত ৩৫ বছরে বদলে গেছে অনেক কিছু। ইরানে ইসলামিক বিপ্লবের মাধ্যমে সুন্নিদের হটিয়ে ক্ষমতায় এসেছে শিয়া। তারা বিভিন্ন কারণে সৌদি আরবের সাথে তিক্ত বিরক্ত। এমনকি গতবছর ইরান সরকার সেদেশের নাগরিকদের হজ্বের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। তদুপরি সৌদি মনে করে ইরান ইয়েমেনের শিয়া হুতি বিদ্রোহীদের অস্ত্র, অর্থ, জ্বালানী দিয়ে সাহায্য করে। সব কিছু-মিলে সৌদি আরব ক্ষমতা হারানোর অজানা আশংকায় ভুগছে এবং ইরানকে মনে করে সম্ভাব্য প্রতিদ্বন্দ্বী। দীর্ঘদিন ধরেই বিভিন্ন আঞ্চলিক ইস্যুতে সৌদি আরব এবং ইরানের মাঝে অচলাবস্থা বিরাজ করছে। যেমন তেহরান সরাসরি রাজনৈতিক এবং সামরিক হস্তক্ষেপের মাধ্যমে সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাসার আল আসাদকে সুরক্ষা দিয়ে যাচ্ছে। লেবানন-ভিত্তিক শক্তিশালী ধর্মীয় সংগঠন হিজবুল্লাহকে নৈতিকভাবে সমর্থন যুগিয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে রিয়াদ সিরিয়ার বিদ্রোহী পক্ষকে অর্থ ও অস্ত্র দিয়ে সাহায্য করছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকগণ মনে করেন, মধ্য প্রাচ্যে সৌদি আরব আর ইরানের মাঝে ঠাণ্ডা লড়াইয়ের “ড্রেস রিহারসেল” চলছে ইয়েমেনে। তাই ইয়েমেনে আক্রমণ করে সম্ভাব্য শত্রু ইরানকে সতর্কবার্তা পৌঁছে দিচ্ছে। ঝিকে মেরে বউকে শিক্ষা দেয়া যাকে বলে আরকি।
কিভাবে যুদ্ধের সমাপ্তি হবে? সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সেক্রেটারি অফ স্টেট জন কেরির মধ্যস্থতায় প্রস্তাবিত যুদ্ধ বিরতি প্রত্যাখ্যান করেছেন আবেদ রাবো হাদি। ফলে নিশ্চিতভাবেই আরব পেনিনসুলার এই অঞ্চলে অস্ত্রের ঝনঝনানি, বারুদের গন্ধ, বিমানের সাইরেন থেমে যাওয়ার সম্ভাবনা নাই। হুতি বিদ্রোহীরা ইতিমধ্যেই ঘোষণা দিয়েছে আলোচনায় বসে ক্ষমতার ভাগাভাগিতে রাজি আছে। কিন্তু আবেদ রাবো হাদি মনে করছেন ভবিষ্যৎ ইয়েমেন সরকার তাকে হয়ত অন্তর্ভুক্ত করবে না। এদিকে সৌদির নেতৃত্বে বিমান হামলা চলছেই, বেঘোরে মারা পড়ছে নিরীহ প্রাণ। সৌদি বাহিনী শিয়া অধ্যুষিত আক্রমণের লক্ষ্যবস্তুর বাইরেও বেসামরিক অঞ্চলে ব্যাপক হামলা পরিচালনা করছে। বাদ যায় নি এমনকি জানাজার নামাজে দাঁড়ানো মানুষ। এক বিমান হামলায় জানাজার নামাজে দাঁড়ানো মানুষের হামলা চালালে সেখানে মারা যায় ১৪০ জন শোকাহত শবযাত্রী। বিশ্বজুড়ে নিন্দার ঝড় উঠলে প্রথমে সৌদি আরব জানাজার নামাজে হামলায় নিজেদের সম্পৃক্ততা অস্বীকার করলেও পরে চাপের মুখে স্বীকার করতে বাধ্য হয়। সৌদি আরবের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ উঠলে জন কেরি বলেন যুক্তরাষ্ট্র সৌদি আরবকে আর সমর্থন দেবে কি না সেটা ভেবে দেখবে। যদি রিয়াদ হুতি বিদ্রোহীদের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করা বন্ধ করে তবেই কেবল হাদির সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ আলোচনায় বসা যেতে পারে। জন কেরির যুদ্ধ বিরতির প্রস্তাবনা সময়ের হিসেবে খুব স্পর্শ কাতর। কারণ এই জানুয়ারি মাসেই নব নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতা গ্রহণ করলেই জন কেরির মেয়াদকাল শেষ হয়ে যাবে। যদি শান্তি প্রচেষ্টা ভণ্ডুল হয়ে যায় তাহলে হয়ত আবেদ রাবো হাদি, সৌদি আরব আর ওয়াশিংটনের নতুন প্রশাসনের সাথে পুরান জুয়া খেলা আবার শুরু করবে। এখন শুধু সময়ের জন্য অপেক্ষা। দীর্ঘ দিনের গৃহযুদ্ধে ইয়েমেনের অর্থনীতির মেরুদণ্ড মোটামুটি ধুলোয় মিশে গেছে। হুতি বিদ্রোহীদের সাথে কোন যোগসূত্র না থাকার পরেও অনেক বেসামরিক বাড়ি, ঘর, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, ব্রিজ, বিদ্যুতকেন্দ্র ধ্বংস হয়ে গেছে। এমনও দেখা গেছে বিয়ে বাড়ির বর যাত্রার লাইনে বোমা বিস্ফোরণ ঘটে মারা গেছে হতভাগা মানুষ। আরব উপদ্বীপের সবথেকে দরিদ্র দেশ ইয়েমেন। গত বছরের আগস্ট থেকে যুদ্ধ তাদেরকে বাড়ি ছাড়া করছে, লক্ষ লক্ষ মানুষ সামান্য দুই মুঠ খাবারের জন্য হাহাকার করছে, ধ্বংসপ্রাপ্ত হাসপাতালে এমনকি রাস্তাঘাটে পড়ে আছে অপুষ্টিতে ভোগা শিশু। নেই বিশুদ্ধ খাবার পানি, ফলে ছড়িয়ে পড়ছে মহামারী কলেরা। বিগত মাসগুলোতে রাষ্ট্র ১.২ মিলিয়ন সরকারী কর্মীর বেতন দিতে পারে নি। হায়রে ধর্মগ্রন্থ রাজনীতি! তোমার কারণে কিছুদিন আগের সমৃদ্ধ অর্থনীতির দেশ ইয়েমেনের আজ কি অবস্থা!! আসলে যুদ্ধটা শুরু হয়েছিল হুতি বিদ্রোহী দমন ও বিস্তার রোধ করার উদ্দেশ্যে। সৌদি আরবের ক্ষমতাধর যুবরাজ ও উচ্চাভিলাষী চৌকশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রী মুহম্মদ বিন সালমান শিয়া ধর্মাবলম্বী হুতিদের নিশ্চিহ্ন করার লক্ষ্যেই এই হামলার সূচনা। কিন্তু বিশ্লেষকগণ ভাবছেন ইয়েমেন হয়ে উঠতে সৌদি যুবরাজের ভিয়েতনাম। ইয়েমেনের ইতিহাসে বলে যে ইয়েমেনের যুদ্ধক্ষেত্র সাম্রাজ্যবাদের গোরস্থান। ১৯৬০ সালে মিশরের প্রেসিডেন্ট গামাল আবদুল নাসের ইয়েমেনের শিয়া ইমামকে ক্ষমতাচ্যুত করতে অভ্যন্তরীণ হস্তক্ষেপ করার পরেই নিজেকে দেখতে পান হাতির মত সমস্যার কাদায় আটকে গেছেন। সৌদি আরবেরও হয়ত একই দশা হবে। কারণ ইতিমধ্যেই ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা হানাদার আরব বাহিনীর আঘাতের পাল্টা জবাব দিতে শুরু করেছে।
https://www.facebook.com/hydarihak/photos/a.382455728624579.1073741828.382453725291446/555928124610671/?type=3&theater
ইয়েমেনের অর্থনৈতিক দুরাবস্থা: সৌদি আরবের সামরিক আগ্রাসন প্রতিহত করতে গিয়ে দেশটির অর্থনৈতিক অবস্থা করুন হয়ে পড়েছে। এই মুহূর্তে মধ্যপ্রাচ্যের দরিদ্রতম দেশ ইয়েমেন। দীর্ঘদিন সৌদি আরবের অর্থনৈতিক অবরোধের ফলে দেশজুড়ে নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসের অভাব হাহাকার চরমে। আক্ষরিকভাবে দেশটি দুর্ভিক্ষের কবলে পড়তে যাচ্ছে। তো কেন সৌদি আরব ইয়েমেনে সামরিক হামলা চালায়? হুতি বিদ্রোহের নামে দেশটাকে কেন তুলোধোনা করে দিচ্ছে? সৌদি আরবের বিমান হামলা দেখে মনে হয় যেন মশা মারতে কামান দাগা হচ্ছে, কিন্তু কেন?
কারণ হতে পারে ইয়েমেনের ভৌগলিক অবস্থান সৌদি আরবের পিছন দরজায় কড়া নাড়ে এবং বিদ্রোহী গ্রুপ সৌদির দক্ষিণাঞ্চলের সীমান্তে অতর্কিত হামলা হামলা চালাতে পারে। সৌদি বিমান হামলার জবাবে হুতি বিদ্রোহীদের ছোঁড়া রকেট লাঞ্চারে সৌদি সীমান্ত অরক্ষিত হয়ে পড়েছে। সৌদি-ইয়েমেন সংঘর্ষের কারণটা আসলে শুধু ভূ-রাজনীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এখানে কারণের পিছনের কারণ দেখা যাচ্ছে। মুসলিমদের অভ্যন্তরীণ বিভাজন। শিয়া-সুন্নির ঐতিহাসিক দ্বন্দ্ব। ইয়েমেনের যুদ্ধ বুঝতে হলে বুঝতে হবে ক্ষমতার কেন্দ্র। মধ্যপ্রাচ্যের শিয়া অধ্যুষিত দেশগুলোর শাসকগণ সুন্নি রাজপরিবার বা নেতা আর খুব স্বাভাবিকভাবেই তারা কোনদিন শিয়াদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে আগ্রহী নয়। শিয়াদের ক্ষমতার পালা বদল ঠেকিয়ে রাখতে দরকার সামরিক আগ্রাসন। দরকার আমেরিকার বন্ধুত্ব, তাদের অত্যাধুনিক অস্ত্র, আকাশ থেকে বোমা ফেলার জন্য বিমান আর নৌপথে অবরোধের জন্য যুদ্ধ জাহাজ।

 
back to top