Showing posts with label হিন্দু. Show all posts
Showing posts with label হিন্দু. Show all posts

Wednesday, 6 December 2017

শাস্ত্র থেকে সত্য বড়!

0 Comments
১.আমাদের কাছে ঠাহর হচ্ছে আমরা কেবলই বই পড়ে সত্য অনুসন্ধানকারী। বইয়ের পুঁথিগত বিদ্যা, জ্ঞান, তত্ত্ব ও তথ্য অনুসন্ধানকারী। আমরা যদি সে-পুঁথিগত বিদ্যাবুদ্ধি- তত্ত্বকে আমাদের জীবনে, কর্মে কাজে বাস্তবায়ন বা রূপায়িত না করি এবং বাস্তব জীবনে প্রয়োগ ও অনুশীলনের মধ্যদিয়ে না যায় তাহলে পুঁথিগতবিদ্যার সত্যায়ন (সত্যমিথ্যার যাচাই) হয় না। কারণ শাস্ত্র থেকে সত্য বড়!
এজন্য সত্যদ্রষ্টা পুরুষোত্তম নজরুল বলেছেনঃ
★ ওরে মূর্খ ওরে জড়, শাস্ত্র চেয়ে সত্য বড়ো, (তোরা) চিনলিনে তা চিনির বলদ, সার হল তাই শাস্ত্র বওয়া॥
★ "তোমাতে রয়েছে সকল কেতাব সকল কালের জ্ঞান, সকল শাস্ত্র খুঁজে পাবে সখা খুলে দেখ নিজ প্রাণ!"
তিনি আক্ষেপের সুরে বলেছেনঃ ★ "পেটে পিঠে কাঁধে মগজে যা-খুশি পুঁথি ও কেতাব বও, কোরান-পুরাণ-বেদ-বেদান্ত-বাইবেল-ত্রিপিটক- জেন্দাবেস্তা-গ্রন্থসাহেব প’ড়ে যাও, যত সখ- কিন্তু, কেন এ পন্ডশ্রম, মগজে হানিছ শূল?"
আমাদের সমাজের ভিন্ন মতের প্রতি শ্রদ্ধা নাই কেবল অবজ্ঞা, অবহেলা। পরমত সহিষ্ণুতা নেই বললেই চলে। ক্ষয়িষ্ণুতা দেখা যায় ভিন্ন মত ও পথের ব্যক্তির উপর। মতের ভিন্নতা দূষণীয় নয়। ধর্ম/মত/পথ যখন অন্যের উপর চড়াও হয় তখনই সমস্যা।
ধর্ম কী একটা ইন্দ্রিয়দ্বার? যে- তার অনুভূতি থাকবে, অনুভূতিতে আঘাত লাগবে! কেউ বলে মানুষের পঞ্চ ইন্দ্রিয়, কেউ বলে ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়, আবার কেউ বলে সপ্ত ইন্দ্রিয়। যথা: চোখ, কান, নাক, কণ্ঠ, জিহ্বা, ত্বক এবং মন দিয়ে যথাক্রমে দৃশ্য, শব্দ, গন্ধ, কথা (বা ভাব), স্বাদ, স্পর্শ এবং অনুভূতি উদয়-বিলয় হয়। অন্যদিকে যার যার কর্ম তার তার ধর্ম। ধর্মকর্ম এক-, একাকার। ধর্ম থেকে কর্ম আলাদা বা স্বতন্ত্র কিছু নয়। কারণঃ ধর্ম অর্থ স্বভাব, বৈশিষ্ট্য, ব্যবহার, আচার আচরণ, চাল-চলন, গতিপ্রকৃতি। তাইতো ড. মোতাহের হোসেন চৌধুরী বলেছেনঃ
ধর্ম সাধারণ লোকের কালচার, কালচার শিক্ষিত লোকের ধর্ম।
সমাজের সর্বাধিক মানুষ যাকে ধর্ম বলে। ঐগুলি ধর্মের বাহিরের অংশ, আনুষ্ঠানিকতা, প্রাতিষ্ঠানিককরণ, শাস্ত্রকথা বা শাস্ত্রীয়করণ, বিধানসমূহ, প্রথামত, স্থূলতা, মতাবলম্বী। যেমনঃ সনাতন/খ্রিষ্টান/বৌদ্ধ/ইসলাম প্রভৃতি ধর্মাবলম্বী বা মতাবলম্বী। ধর্ম ব্যক্তিগত চর্চার বিষয়, ইহা মনের ব্যাপার ও মানসিক বিষয়, আসলে ধর্ম যখন ব্যক্তিগত পর্যায় থেকে প্রাতিষ্ঠানিককরণ, সামাজিকরণ, আনুষ্ঠানিককরণ, শাস্ত্রীয়করণ করা হয় তখনই ধর্মীয় গোলযোগ, অনাচার, অবিচার, অপরাধ প্রবণতা শুরু হয়! কারণ এ-কাজগুলি ঘটে সাধারণত সমাজের অজ্ঞানী, অযোগ্য, ক্ষমতালোভী, অসুর-ইতর প্রকৃতি, বাটপার, ধর্মান্ধ, স্বার্থপর, বস্তুবাদী -ভোগবাদী, মালিকশ্রেণী মানুষের দ্বারা।
মূর্খ উগ্র গোয়ার নিষ্ঠুর ও ইতর প্রকৃতির ধর্মান্ধ, কাণ্ডজ্ঞানহীন মানুষের কর্মকাণ্ডকে কেউ যদি ধর্মানুভূতি বলে চালিয়ে দেয় এর চেয়ে ইতরামি, ধূর্তামি, মোটা শয়তানি বলে আর কিছু নেই।
সুতরাং ধর্মের কোন অনুভূতি নেই, ধর্ম নিরপেক্ষ। অনুভূতি থাকে মানুষের। ধর্মানুভূতি বলেও কিছু নেই!?
মরমী মহাত্মা মাওলা সুফি সদর উদ্দিন আহমদ চিশতী সাহেবে'র মতের উপর অতীতে অনেক সামাজিক অবিচার- অনাচার করা হয়েছে এখনো সাম্প্রতিককালেও করা হচ্ছে নানা প্রকারে, নানা ভাবে। আমরা তাঁর মতের বিরোধিতা করতে পারি তার মানে এ- নয় ব্যক্তিগত আক্রমণ করা, ব্যক্তিবিদ্বেষী হওয়া। ব্যক্তির বিরুদ্ধে আমাদের কোন অভিযোগ থাকার কথা না; কিন্তু নীতির বিরোধিতা, সমালোচনা করা যেতে পারে।
সুফি সদর উদ্দিন আহমদ চিশতী তাঁর মতাদর্শের জন্য তাকে জেলে যেতে হয়েছে, উগ্রবাদী ধর্মান্ধ সমাজ তার বাড়ীঘর, আস্তানা, লাইব্রেরি জ্বালিয়ে পুড়িয়ে দিয়েছিল। সরকার বইগুলি বাজেয়াপ্ত, নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছিল। তার পরিবারকে সমাজে অবাঞ্ছিত- লাঞ্ছিত করা হয়েছিল। মসজিদে মসজিদে তার বিরুদ্ধে কুৎসা অপপ্রচার করা হয়েছিল। এমনকি ঢাকা শহরে তাঁর ফাঁসির দাবীতে পোষ্টার দিয়ে ছেয়ে গিয়েছিলো। এখনো তাঁদের উপর চলছে সামাজিক নির্যাতন, অন্যায়- অবিচার।
উনি পরমত সহিষ্ণুতার মানুষ ছিলেন। অন্যকে, অন্যের মতকে শ্রদ্ধা করতেন। যেমন: একদিন তার এক ভক্ত, নিজের সন্তানকে নিয়ে এসেছেন নাস্তিক বলে। সুফি সাহেব তার ভক্তকে বললেন থাক না উনাকে উনার মত থাকতে দিন।
১৯৯২ সালে ৩০ডিসেম্বরে 'জামাত-বিএনপি' সরকারের মদদে 'ওহাবি-এজিদপন্থি, মৌলবাদী জঙ্গিশক্তি'র (যাদের অপর নাম লাহাব/লাহাবী অর্থাৎ অগ্নিশিখা বা মোহাগ্নি শিখা জন্মদাতা) দ্বারা অগ্নিসংযোগের পর অগ্নিধ্বসে আজো রয়ে গেছে মাওলা সুফি সদর উদ্দিন আহমদ চিশতী পোড়ানো বাড়িটি, সেই বাড়িটি সুফি সাহেব ও তাঁর স্ত্রী গওহর আরা বেগম এ-দু'জনের পেনসনের টাকায় গড়া। সেই স্মৃতি কথা বলতে গিয়ে একদিন আক্ষেপ করে গওহর আরা বেগম বলেছিলেন: যারা আমাদের গৃহহারা করলো, তারা ঠিকই একদিন গৃহহীন হবে। আশ্চর্য হলে সত্য, বাস্তবে ক্ষেত্রবিশেষে অনেকের ক্ষেত্রে তাই ঘটেছিল ......! প্রকৃতির কি মধুর প্রতিশোধ! এইতো সেদিনের কথা, হাসিনা সরকারের আমলে স্বয়ং বিরোধী দলের নেত্রী বেগম খালেদাকে যখন তার ব্যবহৃত বাড়ি থেকে তাকে উচ্ছেদ করেছিল তখন গৃহহারা বেগম খালেদার অশ্রুসিক্ত, কান্নায় ভেঙ্গে পড়ার সেই দৃশ্য দেখে তাঁ'র সেই কথাগুলো স্মৃতির মধ্যে জেগে উঠেছিল!!
শুনেছি যারা কোরআন তফসীর আর কোরআন দর্শনের মধ্যে পার্থক্য বুঝতে পারে না...তাদের উদ্দেশ্য করে সুফি সাহেব বলেছিলেনঃ "মোল্লারা বাংলা পড়িতে পারে কিন্তু ইংরেজী পড়িতে পারে না। যদি তফসীরের দর্শনগুলি ইংরেজীতে অনুবাদ করিয়া দিতাম, তাহা হইলে শিক্ষিত সমাজের কাছে সুগৃহীত হইতো। গাধাগুলি চেচাঁমেচি করিয়া সকলের মাথাগুলি খারাপ করিয়া ফেলিতে পারিতো না। আফসোস! সর্বসাধারণের সুবিধার কথা চিন্তা করিয়া বাংলায় রুপান্তর করিলাম। অথচ, তাহা হিতে বিপরীত হইলো।"
সুফি সাহেবের এক গুণমুগ্ধ ভক্ত তাকে উদ্দেশ্যে লেখেছেনঃ
হে আলোকিত প্রশংসিত সত্তা, তুলে ধরেছ মোহাম্মদীর ঝাণ্ডা। হাজার বছরের লুকায়িত অবগুণ্ঠিত মোহাম্মদের স্বরূপ প্রকাশে গেছে তোমার দেহকাল। উড়িয়েছ দ্বীনে মোহাম্মদীর বিজয়কেতন।
সহস্রবছরের (দ্বীনের মোহাম্মদীর উপর) চাপিয়ে দেওয়া পাহাড়সম মিথ্যাপ্রবাহকে ভেঙ্গে করেছ চুরমার। (ভেঙ্গে গুড়িয়ে, মিশিয়ে দিয়েছ সমতলে)
তোমার উপর নেমে এসেছিল বস্তুবাদী_ভোগবাদীর নিমর্ম আঘাত, অগ্নিসংযোগ, জেলজুলুম, দমননিপীড়ন, অত্যাচার। তোমার প্রকাশিত মোহাম্মদী দর্শনকে বাজেয়াপ্ত, নিষিদ্ধ করেও আটকিয়ে রাখতে পারেনি- তোমাকে, দাবিয়ে রাখতে পারেনি তোমার আনীত দর্শনকে..... (যা' জগতের ইতিহাসে বিরল!)
কোলাহলপ্রিয় নিন্দুকের দল, দলবেঁধে করে তোমার নিন্দাপাঠ, যারা বস্তুবাদী- ধর্মান্ধ, ধর্মমাতাল- ভোগের নেশায় মত্ত, অবৈধ খেলাফত ও খলিফাপ্রিয়, যারা ধর্মব্যবসায়ী, ক্ষমতালোভী- গদিনাসীন, অজ্ঞানী, ফেতনাফ্যাসাদসৃষ্টিকারী।
*২
মানুষকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য -অবজ্ঞা করে, উপেক্ষা করে বা বাদ দিয়ে এমনকি ঘৃণা করে যারা ব্যাবসাবাণিজ্য, রাজনীতি, ধর্মকর্ম, শিল্পসাহিত্য, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি চর্চা করে কিছু পেতে বা দিতে চায় তারা আসলে কি? বা কে? তাঁরা বিভিন্ন পেশায় অনেক বড়, দক্ষ বা বিশেষজ্ঞ হতে পারে, প্রচুর বইপুস্তক পড়তে, ও লেখতে পারে! কিন্তু আর যাইহোক তাঁরা মানবতাবাদী নয় বরং মানবতাবিরোধী! তাঁদের দিয়ে প্রকৃতপক্ষে মানুষের সার্বিক কল্যাণ আশা করা যায় না, বরং ক্ষেত্রবিশেষে তারা মানুষের অকল্যাণ, ক্ষতিসাধন করে থাকে! তাই তাঁদেরকে হয়তো ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, কবি, ধার্মিক ইত্যাদি বলা যেতে পারে তাদের পেশা ও জীবিকা অনুসারে কিন্তু প্রকৃত মানুষ বলা যায় কি? মানুষের জন্য সবকিছু -এই জগতসৃষ্টি, সমাজসংসার সবকিছু। আর তাকে প্রাধান্য না-দিয়ে উপেক্ষা, অবজ্ঞা, তুচ্ছতাচ্ছিল্য, ঘৃণা ও বাদ দিয়ে কোনকিছু করা মানবকেন্দ্রিক না। একজন মানুষ সেই যে মানুষকে ভালবাসে, মানুষের ব্যথায় ব্যথিত হয়, মানুষের কল্যাণ করে। সবার উপরে, সবকিছু থেকে তার কাছে মানুষই বড়! মানুষই শ্রেষ্ঠ!
"সবার উপরে মানুষ সত্য তাহার উপরে নাই"- কবি চন্ডিদাসের এই সুপ্রাচীন উক্তিটি মাতবতাবাদের (Humanism) মূল কথা। এ-ধারায় পরবর্তীতে স্বভাবকবি সাইজি লালন ফকির গেয়ে উঠেনঃ

"এমন মানব সমাজ কবে গো হবে সৃজন যেদিন হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, খৃষ্টান জাতি গোত্র নাহি রবে।"
কিংবা পুরুষোত্তম নজরুলের ভাষায়ঃ "গাহি সাম্যের গান- মানুষের চেয়ে কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান,"
*হিন্দু হিন্দু থাক, মুসলমান মুসলমান থাক, শুধু একবার এই মহাগগনতলের সীমা হারা মুক্তির মাঝে দাঁড়াইয়া মানব তোমার কন্ঠে সেই সৃষ্টিতে আদিমবাণী ফুটাও দেখি। বল দেখি "আমার মানুষ ধর্ম"। মানবতার এই মহান যুগে একবার গন্ডী কাটিয়া বাহির হইয়া আসিয়া বল যে, তুমি ব্রাহ্মন নও, শুদ্র নও, হিন্দু নও, মুসলমানও নও, তুমি মানুষ - তুমি ধ্রুব সত্য। _________________ পুরুষত্তোম নজরুল।
সাম্য, মৈত্রী ও স্বাধীনতা--- এ তিনটি হল মানবতাবাদের ভিত্তি। মানবতাবাদ এমন একটি মতবাদ- "যা মানুষকে যথার্থ মানবধর্মী করে তোলে, যেখানে মানুষই সর্বস্ব, কোনকিছুর জন্য মানুষ নয় বরং মানুষের জন্য সবকিছু, ধর্ম, বিজ্ঞান ও দর্শন প্রভৃতির। এবং প্রকৃতি ও ইতিহাসের সে সব উপাদান তার মনকে সমৃদ্ধ করতে পারে, সে সবকিছুতেই তাকে অংশগ্রহণ করে তার অন্তরস্থিত মহত্ত্বের অভিব্যক্তি ঘটায়...
মানবতাবাদ ইশ্বরকেন্দ্রিক (Theocentric) অথবা মানবকেন্দ্রিক (Anthropocentric) হতে পারে। পাশ্চাত্যদর্শনে ইশ্বরকেন্দ্রিক মানবতাবাদের ওপর খ্রিষ্টধর্মের প্রভাব স্পষ্ট। এই মানবতা অনুযায়ী মানব জগতের তথা বিশ্বের কেন্দ্রস্থলে আছেন ইশ্বর। আর দ্বিতীয় মতবাদ অনুযায়ী সবকিছুর কেন্দ্রস্থলে রয়েছে মানুষ। ............অস্তিত্ববাদের সুফি দর্শনে- 'ওহ্‌দাতুল ওজুদ' তথা 'একক অস্তিত্ব' তত্ত্বে জগতে সকল বস্তু বা শক্তির অস্তিত্ব একটি। প্রকাশ-বিকাশ যাই হোক তা মূলত একই উৎসের বৈচিত্র্যময় উপস্থাপনা মাত্র। সুতরাং স্রষ্টা এবং সৃষ্টি স্বতন্ত্র নয়। ফলে মানুষ প্রচলিত গৎবাঁধা নিয়মে তার বিকাশকে নিশ্চিত করতে পারে না। তাকে নতুন দৃষ্টি মেলে তাকাতে হয়। অভিজ্ঞ কারো কাছে শিখতে হয়। তবে 'একক অস্তিত্ববাদ'---যা বিশেষভাবে শায়খে আকবর মহিউদ্দিন ইবনুল আরাবির দ্বারা ব্যাখ্যাকৃত ও প্রচারিত হয়েছিল, তা প্রচণ্ড বাধার সম্মুখীন হয় 'ওহ্‌দাতুশ শহুদ' মতবাদ দ্বারা। মোজাদ্দেদি তরিকার প্রতিষ্ঠাতা আহমদ সারহিন্দ (যিনি মোজাদ্দেদি আলফেসানি বলে খ্যাত) দ্বারা ওহদাতুল শহুদ ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয়। এ মতবাদে স্রষ্টা ও সৃষ্টি স্বতন্ত্র। এমন মতবাদ ওহাবি মতবাদের মূল ভিত্তি। ফলে মানুষ বিষয়ে ভিন্ন ধারণার উদয় ও বিকাশ ঘটে চলেছে। এবং দুটো মতাদর্শন একে অপরের বিপরীতে অবস্থান করায় মানুষ নিয়ে মুসলিম অস্তিত্ববাদী দর্শন জটিলতায় রয়েছে। সমগ্র অস্তিত্বের পরিপ্রেক্ষিতে মানুষকে দেখার জন্য অস্তিত্ববাদ বিশেষ ভুমিকা রাখতে প্রয়াসী হতে পারে।
(কৃতজ্ঞতা ও তথ্যসুত্রঃ *১.নুরনবি, অস্তিত্ববাদ ও মানবতাবাদঃ প্রাসঙ্গিক ভাবনা। *২.হিলালুজ্‌জামান হেলাল, কোরানে মানুষতত্ত্ব পরম্পরা-১ *৩. জেহাদুল ইসলাম ও ড. সাইফুল ইসলাম খান, দিওয়ান-ই-মুঈনুদ্দিন) ___________
★৪.
শাস্ত্র থেকে সত্য বড়, কিংবা কেন দানিয়াছ, মিছে শূল? শাস্ত্রজ্ঞানের সে-ই শূল আত্মজ্ঞান বা কাণ্ডজ্ঞানকে ঢেকে দেয়! হৃদয়ের জ্ঞান, বা প্রেম হতে যে জ্ঞান অর্থাৎ নিজের ভিতর উৎসারিত যে সত্য জ্ঞান তার বিকাশের দ্বার রুদ্ধ করে দেয়। শাস্ত্রের এলকোহল মস্তিষ্কের ভিতরে মিছে শূল বা ইন্ধন দেয়! শাস্ত্রজ্ঞান মানুষকে পণ্ডিত করে তোলে যদি না সে মানুষ দেহশাস্ত্র পাঠ না করে। কারণ দেহের মধ্যে সমস্ত জ্ঞান গুণ লুকায়িত। তাকে কর্মের মধ্য বাস্তবায়ন ঘটাতে হবে এবং কর্মের মধ্যে জ্ঞানের গুণের বিস্তার সাধন করতে হবে। সেজন্য জীবনাচরণের মধ্যে পূর্বপ্রস্তুতি ও অনুশীলন থাকতে হবে। নিচে কিছু দৃষ্টান্ত দ্র.___
*'গাধার পৃষ্ঠে কেতাব বোঝা এলেম পড়া সোজারে ওহেরে পাপিষ্ঠ মর্ম না বুঝিলিরে' --খাজা শাহপির চিশতী নিজামি (.)।
★ওরে মূর্খ ওরে জড়, শাস্ত্র চেয়ে সত্য বড়ো, (তোরা) চিনলিনে তা চিনির বলদ, সার হল তাই শাস্ত্র বওয়া॥
*"পেটে পিঠে কাঁধে মগজে যা-খুশি পুঁথি ও কেতাব বও, কোরান-পুরাণ-বেদ-বেদান্ত-বাইবেল-ত্রিপিটক- জেন্দাবেস্তা-গ্রন্থসাহেব প’ড়ে যাও, যত সখ- কিন্তু, কেন এ পন্ডশ্রম, মগজে হানিছ শূল?" --_পুরুষোত্তম নজরুল
*
*তাহাদের মেশাল, যাহারা তৌরাতের ভার গ্রহন করিয়াছে, তারপর তাহারা ইহাকে অন্তরে প্রবেশ করায় নাই, গাধার মেশালের মত-- গ্রন্থের বোঝা বহন করে। আল্লাহর পরিচয়ের উপর যে কওম মিথ্যা আরোপ করে তাহাদের মেশাল মন্দ। এবং আল্লাহ জালেম কওমকে হেদায়েত করেন না।" ---আল-কোরান (৬২:৫).
ব্যাখ্যাঃ-- ধর্ম শাস্ত্রবিদ ইহুদী পন্ডিতগণের প্রসংগ উল্লেখ করিয়া সকলকে স্পষ্ঠভাবে জানাইয়া দেওয়া হইতেছেঃ যাহারা আল্লাহ হইতে প্রেরিত গ্রন্থকে সত্য বলিয়া মানিয়া লইয়াছে, কিন্তু আমলের দারা হামেল করিয়া লইতে পারে না, অর্থাৎ উহার ভাবধারাকে অন্তরস্থ করিয়া উহা চরিত্রে অভিব্যক্ত করিয়া তুলতে পারে নাই তাহারা গাধার বোঝা বহন করে মাত্র। আল্লাহর নিদের্শিত বাণীদ্বারা চরিত্র সংগঠন না করিয়া শুধু ধর্মের বাণী বহন করাকে অতিশয় মন্দ বলিয়া গর্দভের সংগে তুলনা করা হইয়াছে। যাহারা আল্লাহর পরিচয়কে ঢাকিয়া রাখিল অর্থাৎ নিজের মধ্যে জাগ্রত করিয়া তুলিল না, অথচ বহুল পরিমাণ ধর্মের বানীর বোঝা বহন করে তাহারা আসলেই হতভাগ্য; যেহেতু কি বহন করিতেছে তাহার পরিচয় জ্ঞানও তাহাদের নাই। ইহারাই সত্যিকার জালেম, অর্থাৎ অত্যাচারী। এবং এইরূপ অত্যাচারী দলকে বা কওমকে আল্লাহ হেদায়েত করেন না বলিয়া স্পষ্ট ঘোষণা করিতেছেন। ইহাতে প্রমাণ করিতেছে যে, না বুঝিয়া কোরান পড়ার কোন মূল্য নাই। এবং কথা বুঝিয়া লইবার পর উহা আমলের দ্বারা চরিত্রগত না করিলে তাহাকেও গাধার সংগে তুলনীয় এবং অত্যাচারী অর্থাৎ জালেম বলিয়া ঘোষনা করা হইয়াছে। আল্লাহর নির্দেশের সাহায্যে নফসকে জীবন্ত করিয়া না তুলিলে তাহা নফসের প্রতি জুলুম করার সমতূল্য। (দ্র. কোরান দর্শনঃ সদর উদ্দিন আহ্‌মদ চিশতী) ________________________
★৩.
* 'ও যার আপন খবর আপনার হয় না তার আপনারে চিনতে পারলে রে যাবে অচেনারে চেনা '
* 'ক্ষ্যাপা তুই না জেনে তোর আপন খবর যাবি কোথায়! আপন ঘর না বুঝে, বাহিরে খুঁজে পড়বি ধাঁধায়।' _________-মহামতি মহাত্মা স্বভাব কবি লালন সাঁইজি।
এখানে সাইঁজীর খুব সুন্দর ও সত্য উপস্থাপনা। যা' পাঠ করে মুগ্ধ হই বারবার। মুগ্ধতায় চিত্তে উদয় হল পূর্বসঞ্চিত দু'টি বানীঃ___
১) মহাত্মা সক্রেটিস সাহেবের একটি উক্তি আছে, "আমি কি জানি না, তা জানি, কিন্তু লোকেরা কি জানেনা সেই জানেনা" (খুব সম্ভবত: যতটুকু মনে পড়ে! )
২) বিজ্ঞানী আইনস্টাইন মহোদয় বলেছেনঃ "আমি শুধু সমুদ্র তীরের বালু নিয়ে নাড়াচাড়া করে গেলাম কিন্তু সমুদ্রের অতল রহস্য কিছুই বুঝলাম না।" (খুব সম্ভবত:)
যাইহোক, নোনাপানির সমুদ্রের তো দুই/চার হাজার মাইল পাড়ি দিয়ে কুল কিনারা পাওয়া যায় কিন্তু জ্ঞান-সমুদ্রের, সংস্কার-সমুদ্রের কোন সীমা-পরিসীমা, কোন সীমান্ত নাই। যেখানে নিজেকে চেনাজানাদেখা' হয় নাই মানে আমি কি/কে? আত্মদর্শন হয় নাই, সেটাই নির্ণয় বা নির্ধারণ হয় নাই! সেখানে আমি কি জানি বা জানি না? তা' তো পরের বিষয়।
সর্বযুগে প্রশংসিত প্রতিষ্ঠিত সকল মহাপুরুষগণ এই বিধান বা concept প্রদান করে থাকে (Know thyself, See thyself, Watch thyself& Read thyself ) __ ''নিজেকে জানো_চিনো_দেখো এবং পাঠ কর অর্থাৎ আত্মদর্শন (সালাত, ধ্যান, মানসিক ব্যায়াম ) করো!? সে পদ্ধতি আপন আপন সম্যক গুরুর নিকট থেকে জেনে নিতে হয়।
"মান_আরাফা_নাফসুহু_ফাক্বাদ_আরাফা_রাব্বাহু"_ (-হাদিসে_রসুল)। অর্থাৎ যে তাঁর নফসকে চিনলো জানলো সে তাঁর রবকে চিনলো/জানলো।
মাওলা সুফি সদর উদ্দিন আহমদ চিশতী বলেছেনঃ যে সাধকের আত্মপরিচয় সুপরিজ্ঞাত হয় অর্থাৎ 'মান আরাফা নাফসাহু' হয় তাহার কলুষিত অস্তিত্ব চিরতরে ধ্বংস করা হয়। পরিণামে সে জন্মচক্র হইতে মুক্তি লাভ করে। "চিত্তবৃত্তির সামগ্রিক অভিব্যক্তিকে নফস বলে। নফস দর্শন তথা আত্মদর্শনকে সালাত বলে। 'নফস_দর্শন' অর্থ অসারতা দর্শন, অনাত্মা দর্শন।" অর্থাৎ নিজেকে দেখা, নিজের কর্মচিন্তাকে দেখা, নিজেকে পাঠ করা এবং নিজের মধ্যে কি আসে, কি যায়? তা' এক এক করে, অনু অনু করে, ভেঙে ভেঙে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র ভাবে দেখা, ও পাঠ করা।
এই হাদিসটি রসুলুল্লাহ (আ) একার কথা নয়। বরং সর্বযুগের সর্বভাষার সর্বকালীন সার্বজনীন কামেল গুরুগণের পবিত্র মুখের একটি বানী চিরন্তনী পরম্পরা। যে-কোন একটি ধর্মদর্শনগ্রন্থে এর উল্লেখ থাকবেই। একমাত্র বস্তুবাদী বস্তভোগী মানুষ এ-হাদিসটির বিরোধীতা করে রেফারেন্স খোঁজে বা চাই এবং তাঁরা রসুলুল্লাহর ১৫ বৎসর ১ মাস ১৯ দিন হেরাগুহার ধ্যানের ব্যাপারে নিশ্চুপ থাকবে!? কাজেই ''শাস্ত্র থেকে সত্য বড়। শাস্ত্র না ঘেঁটে ডুব দাও, সখা, সত্য-সিন্ধু-জলে (-নজরুল)।'' 'সবার উপর মানুষ সত্য তার উপরে নাই।(-চণ্ডীদাস)'
এ-হাদিসটি বিষয়ে বিস্তারিত বর্ণনাকারী শ্রদ্ধের জহির দা (Zahirul Haque) লেখেছেন:___
সুফীবাদ তথা আধ্যাত্মবাদে বহুল প্রচারিত একটি হাদিস "মান আরাফা নাফসাহু ফাকাদ আরাফা রাব্বাহু" হাদিসের নামে বানোয়াট কথা বলে উল্লেখ করেছেন আই সি এস পাবলিকেশন্স এর "বিষয়ভিত্তিক আয়াত ও হাদিস সংকলন" নামক বইয়ে।
মহাগ্রন্থ আল কোরানের সঙ্গে উক্ত বাক্যটি সত্যতা ও সামঞ্জস্যতা কতটুক একটু দেখে নেই,,,
কোরানুল মাজিদে বলা হয়েছে- "ওয়াফিল আরদ্বি আইয়াতুল্লিল মুকিনীন, ওয়াফি আনফুসিকুম আফালা তুবসিরুন।" অর্থাৎ "এবং পৃথিবীর/বস্তুজগতের/দেহের মধ্যে পরিচয়/চিহ্ন বা নিদর্শন আছে দৃঢ় বিশ্বাসীদের জন্য, এবং তোমাদের নফসের মধ্যেও কিন্তু তোমরা তা দেখ না বা লক্ষ্য কর না।"
কোরানের অন্যত্র আরো বলা হয়েছে, "শীঘ্রই আমি তাদেরকে স্বীয় নিদর্শন সমূহ পৃথিবীতে এবং নিজের মধ্যে দেখিয়ে দিব যতক্ষণ না তাদের জন্য প্রকাশিত হবে যে, নিশ্চয়ই ইহা সত্য।" কাজেই কুল আলমে যা আছে তা এই জুযু আলমেও অর্থাৎ দেহের মধ্যেও আছে এবং নিশ্চিত জ্ঞানে ও ইয়াকিনে তথা হাক্কুল ইয়াকিনে প্রতিষ্ঠিত না হওয়া পর্যন্ত বুঝা যাবে না। সুতরাং আপন রবের পরিচয় বা নিদর্শন সমূহের জ্ঞান লাভ করিতে চাইলে আপন দেহের মাঝে মনের ভ্রমনের দ্বারা নফসকে অর্থাৎ মানবিক চিত্তবৃত্তির অভিব্যক্তিগুলিকে চিনিয়া লইতে হইবে।
প্রিয় পাঠক ! পূর্বকালের পয়গম্বরদের গ্রন্থেও উল্লেখ রহিয়াছে যে, আল্লাহতা'লা তাহাদিগকে বলিয়াছেনঃ "আ'রিফ নাফসাকা, তা'রিফু রাব্বাকা" অর্থ- "আত্মপরিচয় লাভ করিতে পারিলে তুমি তোমার প্রভুর পরিচয় লাভ করিতে পারিবে।"
এতৎসমন্ধে সালেহীন বুযুর্গানে দ্বীনদার দ্বারা স্বীকৃত রসুলের হাদিস হিসেবে মশহুর- "মান আরাফা নাফসাহু ফাকাদ আরাফা রাব্বাহু" অর্থঃ যে ব্যক্তি নিজেকে চিনিতে পারিয়াছে সে তার রবকে (প্রভুকে) চিনিতে পারিয়াছে।"
প্রিয় সহৃদগণ ! সত্যিই কি ইহা হাদিসের নামে বানোয়াট কথা নাকি মুর্শিদ প্রদত্ত "মান আরাফা"-র তালিমকে সূফীবাদী সমাজ থেকে মুছে দেবার তাগুত পূজারীদের ষড়যন্ত্র ???
* যদি ইসলাম কায়েম হয় শরায় কী জন্যে নবীজি রহে পনের বছর হেরাগুহায়।। পঞ্চবেনায় শরা জারি মৌলভীদের তম্বী ভারি নবীজি কি সাধন করি নবুয়তী পায়।। না করিলে নামাজ রোজা হাসরে হয় যদি সাজা চল্লিশ বছর নামাজ কাজা করেছেন রসুল দয়াময়।। কায়েম উদ্ দ্বীন হবে কিসে অহর্নিশি ভাবছি বসে দায়েমী নামাজের দিশে লালন ফকির কয়।।
_____ স্বভাব কবি সাইজী ফকির লালন শাহ্‌।
* হেরা গুহাকে অবলম্বন করিয়া কোরানের আগমন। হেরাগুহায় প্রবেশ করিয়া ধ্যানস্থ না হইলে কেহই সত্য উদ্ধার করিতে সক্ষম হইবে না। অতএব যিনি হেরা গুহায় প্রবেশ করিয়া ধ্যান করিয়াছেন তিনি সত্য উদ্ধারকারী সাধক হইয়াছেন বা হইবেন। এই হেরাগুহা প্রত্যেক মানুষের ভিতরেই বিদ্যামান রহিয়াছে। এই হেরা গুহা হইল একমাত্র জ্ঞান কেন্দ্র। আপন দেহের গভীরে ধ্যান করাই ছিল হেরা গুহার ধ্যান। হেরা গুহা ধ্যান করা ব্যতীত অর্থাৎ আত্মদর্শনে নিমগ্ন হওয়া ব্যতীত জীবন রহস্য এবং ইহার দর্শন উদ্ধার করা কঠিন বিষয়। হেরা গুহার ধ্যান করা রসুলাল্লাহর (আ) সর্বপ্রথম সুন্নাত। যে কোন সত্য প্রকাশের উৎস হইতে হইবে হেরা গুহার ধ্যান, তথা আত্মদর্শন বা সালাত। দেহের সকল কর্মকাণ্ড লক্ষ করিবার অপর নাম সালাত। সালাত সকল মৌলিক জ্ঞানের মূল উৎস। (সংকলিত) ____সুফি দার্শনিক মাওলা সদর উদ্দিন আহমদ।
হেরা_গুহা নামক জ্ঞানকেন্দ্রকে কেন্দ্র করে কোরান বা বানীসমষ্টির অবতীর্ণ বা উদয়, আবির্ভাব বা আগমন। 'সিরুফিল_আর্দ্ তথা আপন দেহে ভ্রমণ', 'সাবাত_দিবস বা সপ্তমদিবস অর্থাৎ একদিন আল্লাহর ধ্যানে ব্যয় করা', 'শাহারুল_হারাম- বা চার মাস দুনিয়া হারাম অর্থাৎ চার মাস দুনিয়া কর্ম থেকে বিরত থাকা, একজন মুসল্লীর জন্য জীবনে অন্ততঃ একবার করে হলে তা করা বাঞ্চনীয়- এই রূপে ইত্তেকাফ, মোরাকাবা_মোশাহেদা, চিল্লা ইত্যাদি ধ্যানকেন্দ্রিক দায়েমি সালাত হেরাগুহার নামান্তর। হেরাগুহা মানব দেহের প্রতীক। হেরা গুহায় তথা মানবদেহে প্রবেশ করে আপন দেহে মানসিক ভ্রমণ তথা মানসিক ব্যায়ামের অনুশীলন না করলে প্রকৃত সত্যানুসন্ধান, সত্যুদ্ধার করা অসম্ভব ব্যাপার। আপন দেহের গভীরে ধ্যান করাই হেরা গুহার ধ্যান। দেহের সকল কর্মকাণ্ডকে এক এক করে (অনু অনু করে) ভেঙ্গে ভেঙ্গে তার স্বরূপকে জ্ঞান দ্বারা বিস্তারিত লক্ষ্য করার অপর নাম ধ্যানসালাত। সালাত মূলতঃ আপন দেহ বা নিজেকে পাঠ করা বা দর্শন করা। নিজের ভিতরের বিষয়বস্তুকে এক এক করে দেখতে (সালাত) আরম্ভ করলে ওর যে মোহ উচ্ছেদ বা ত্যাগ করার অপর নাম যাকাত। উদ্বৃত্ত আয়ের আড়াই ভাগ ট্যাক্স দেওয়াকে কোরানে কোথাও যাকাত বলে নাই। সালাত হল দায়েমি অর্থাৎ সার্বক্ষণিক, অবিরাম, ধারাবাহিক এবং স্বর্গীয় বা প্রভুর জ্ঞান ও গুণ অর্জন করা। অন্যদিকে নামাজ হলঃ "সালাতের অংশ, খণ্ডকালীন বা ওয়াক্তিয়া, আনুষ্ঠানিক, প্রাথমিক ব্যবস্থা, সালাতের মহড়া দেওয়া এবং প্রভুর গুণকীর্তন করা!"
ধ্যানসালাত কর্মপন্থা সমস্ত মহাপুরুষের আদিকর্ম। হেরাগুহার ধ্যান রসুলাল্লাহর সর্বপ্রথম সুন্নাত। হেরাগুহায় ধ্যান করা ব্যতীত অর্থাৎ আত্মদর্শনে নিমগ্ন হওয়া ব্যতীত জীবন রহস্য এবং জীবন দর্শন উদ্ধার করা কঠিন। সত্যপ্রকাশের মূল উৎস হতে হবে হেরাগুহার ধ্যান, তথা আত্মদর্শন বা সালাত। ইহা সকল মৌলিক জ্ঞানের মূল উৎস। সালাতের ফলশ্রুতি হলঃ যাকাত, কোরবানি, সদক্বা, সিয়াম, এফতার, তালাক ইত্যাদি। শুরুতে গুরুকে কেন্দ্র করে শুরু করতে হয়। তারপর গুরুভাব, গুরুপ্রেম, গুরুময়ের মধ্যদিয়ে সত্যজ্ঞান চলে আসে। তখন গুরুপ্রাপ্ত তথা আল্লাহপ্রাপ্ত সাধক, সিদ্ধপুরুষ জ্ঞানবাদী সালাতে দায়েম বা সালাতরত থাকেন। তাঁর প্রতিটি কর্মচিন্তা, প্রতিটি মুহূর্ত সালাত কর্ম ব্যতীত হয় না। তার সপ্তইন্দ্রিয় এলহাম ব্যতীত চলে না। তখনই রসুলাল্লাহর হাদিস বাস্তবায়ন হয়, তাঁর হাত আল্লাহ্‌র হাত, তাঁর চোখ আল্লাহর চোখ অর্থাৎ তিনি আল্লাওয়ালা ব্যক্তিতে রূপান্তরিত হন।
★কর্মকে অনু অনু করে ভেঙ্গে ভেঙ্গে তার স্বরূপ দেখার মাধ্যমে
★গুরুভাবে গুরুপ্রেমে থেকে, গুরুমুখী হয়ে সমস্তকর্ম সম্পাদন করা অর্থাৎ গুরুকে অগ্রভাগে বা সম্মুখে রেখে সমস্ত কর্মসম্পাদন করা। অর্থাৎ গুরুময় বা গুরুপরায়ণের মাধ্যমে বা গুরু-সংযোগে কর্ম সম্পাদন করে
★সম্যককর্ম সম্যকসময় যথাবিহিত সম্পাদন করার মাধ্যমে..
প্রভৃতি....
(তথ্য উৎসঃ কোরান দর্শনঃ সদর উদ্দিন আহ্‌মদ চিশতী)
শাস্ত্রকেতাব বনাম দেহকেতাবঃ

পুরুষোত্তম নজরুলের বলেছেনঃ
'তোমাতে রয়েছে, সকল কেতাব সকল কালের জ্ঞান, সকল শাস্ত্র খোজে পাবে সখা খুলে দেখ নিজ প্রাণ! "
অন্যদিকে কেতাব সম্পর্কে ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে দয়াল মুর্শিদ সদরজান কেবলা বলেছেনঃ-
"নূরে মোহাম্মদীর মাধ্যমে বিচিত্র সৃষ্টিরূপে বিকাশ বিজ্ঞানকে কেতাব বলে। উচ্চমানের বিশিষ্ট সাধকের উপর কেতাব জ্ঞান নাজেল হওয়া বিষয়টি সর্বকালের একটি চিরন্তন ব্যবস্থা। কেতাব হইল বিশ্বপ্রকৃতির সামগ্রিক বিকাশ-বিজ্ঞান। মানুষের জন্য আল্লাহর দেওয়া জীবনবিধানও কেতাবের অন্তর্ভুক্ত। আল্লাহর বিকাশ বিজ্ঞানকে কেতাব বলে। যেই যন্ত্রের মধ্যে বা যেই সকল রূপের মধ্যে আল্লাহর উক্ত বিজ্ঞানময় বিকাশ ঘটে তাহার মধ্যে মানব দেহ সর্বশ্রেষ্ঠ। এইজন্য মানবদেহকে "আল কেতাব" বলা হইয়াছে। আল কেতাবের জাহের রূপ 'মানব দেহ' এবং বাতেন প্রক্রিয়া 'বিকাশ বিজ্ঞান'। আল কেতাবের উভয় প্রকার বিকাশের মূল উৎস নূর-মোহাম্মদ (যে কোন একজন মোহাম্মদ দ্বারা অর্জিত স্বর্গীয় চরিত্র এবং গুণাবলীকেই 'নূরে-মোহাম্মদী' বলে। আল্লাহর আপন চরিত্রই সৃষ্টির মধ্যে মহা গুরুর অভিব্যক্তি রূপে যুগ যুগ যে সকল বিকাশ হইয়া থাকে তাহাকে নূরে মোহাম্মদী।)
'আল_কেতাব_পাঠ_করা' অর্থ আপন_দেহ_পাঠ_করা তথা আপন দেহের মধ্যে আত্মদর্শনের অনুশীলন করা। আপন দেহই সকল জ্ঞানের মূল উৎস। সহজ কথায় কেতাব অর্থ মানব দেহ। আল-কেতাব অর্থ বিশিষ্ট মানব দেহ বা সিদ্ধপুরুষ অর্থাৎ প্রতিষ্ঠাপ্রাপ্ত একজন মহাপুরুষ। (অর্থাৎ যে দেহ কেতাব পাঠ হয়ে গেছে যাকে বুদ্ধ কেতাব বা আল কেতাব বলা যায়।)। আল কেতাব হইতে ধর্মগ্রন্থ সমূহের আগমন। " বিস্তারিত দ্র. নিচের লিংকেঃ______________ https://www.facebook.com/notes/mithu-shamim/%E0%A6%A6%E0%A7%87%E0%A6%B9-%E0%A6%95%E0%A7%87%E0%A6%A4%E0%A6%BE%E0%A6%AC-%E0%A6%AC%E0%A6%A8%E0%A6%BE%E0%A6%AE-%E0%A6%AA%E0%A7%81%E0%A6%B8%E0%A7%8D%E0%A6%A4%E0%A6%95-%E0%A6%95%E0%A7%87%E0%A6%A4%E0%A6%BE%E0%A6%AC%E0%A6%83%E0%A6%B8%E0%A6%A6%E0%A6%B0-%E0%A6%89%E0%A6%A6%E0%A7%8D%E0%A6%A6%E0%A6%BF%E0%A6%A8-%E0%A6%86%E0%A6%B9%E0%A7%8D%E0%A6%AE%E0%A6%A6-%E0%A6%9A%E0%A6%BF%E0%A6%B6%E0%A6%A4%E0%A7%80/980440398718223/)
পুরুষোত্তম নজরুলের লোকোত্তর দর্শন এবং (আত্মজ্ঞানতত্ত্ব বাণী চিরন্তনী): ---- ১. *তোমাতে রয়েছে সকল কেতাব সকল কালের জ্ঞান, সকল শাস্ত্র খুঁজে পাবে সখা খুলে দেখ নিজ প্রাণ!
২. *তোমাতে রয়েছে সকল ধর্ম সকল যুগাবতার, তোমার হৃদয় বিশ্ব দেউল সকলের দেবতার।
৩. *কেন খুঁজে ফের দেবতা ঠাকুর মৃত পুঁথি কঙ্কালে হাসিছেন তিনি অমৃত হিয়ার নিভৃত অন্তরালে।
৪. *বন্ধু, বলিনি ঝুট্‌, এইখানে এসে লুটাইয়া পড়ে সকল রাজমুকুট।
৫. *এই হৃদয়ই সে নীলাচল, কাশী, মাথুরা, বৃন্দাবন, বুদ্ধা-গয়া এ, জেরুজালেম্‌ এ, মদিনা, কাবা-ভবন, মসজিদ এই, মন্দির এই, গির্জা এই হৃদয় এইখানে ব'সে ঈশা মুসা পেল সত্যের পরিচয়।
৬. *এই হৃদয়ের ধ্যান-গুহা-মাঝে বসিয়া শাক্যমুনি ত্যজিল রাজ্য মানবের মহা-বেদনার ডাক শুনি'।
৭. *মিথ্যা শুনিনি ভাই, এই হৃদয়ের চেয়ে বড় কোনো মন্দির-কাবা নাই।
৮. * আমি সহসা আমারে চিনেছি, আমার খুলিয়া গিয়াছে সব বাঁধ! *জগদীশ্বর-ঈশ্বর আমি পুরুষোত্তম সত্য,
(#বিদ্রোহী) ..___________
মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি।
মানুষকে ভালবেসে আপন করি কাছে টানি। সময়টা বড় অল্প। দমের ঘরের দম ফুরালেই সাঙ্গ হবে ভবের খেলা!
কী লাভ মানুষকে দূরে ঠেলে জীবনের প্রয়োজনে মিছে এতো সব আয়োজনে!
দমেদমে প্রতিটা কদমে রয় যেন মানুষগুরুর স্মরণে- সংযোগে প্রেম/ভক্তি/দয়ামায়া/বিশ্বাস/ক্ষমা ও ধৈর্য গুণের সাথে বড় ভালো মানুষ হয়ে উঠি মানুষের তরে। ____
* ধর্মের কাল্পনিক স্বর্গ নরক লোভ লালসায় মত্ত ধর্মান্ধ; তাই অন্যের অনিষ্ট করেও কি করে স্বর্গের আশা করে? এরা পাপিষ্ঠ বেহায়া বেহুঁশ! মান আর হুঁশকে ধুলোয় মিশিয়েছে। স্রষ্টার সৃষ্টিকে তারা ধ্বংস করে স্বর্গের আশা করে! সৃষ্টিকে না ভালবেসে স্রষ্টাকে কি ভালবাসা যায়? যাকে চেনা নেই, জানা নেই, কথা নেই তাঁর সাথে ভালবাসা হয় কি-করে? স্রষ্টা থেকে সৃষ্টি আলাদা কিছু নয়। তাই সৃষ্টিকে অর্থাৎ যাকে দেখা যায় স্পর্শ করা যায়, তাকেই ভালোবাস। মানুষ-খোদার বিধান তাহাই মানুষকে ভালবাস, আপন কর, কাছে টানো.. মানুষের মাঝে খোদা ঈশ্বর ভগবান!
★ মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি। মানুষ ছাড়া ক্ষ্যাপা রে তুই মূল হারাবি।। ★ ভজ মানুষের চরণ দু’টি নিত্য বস্তু হবে খাঁটি। মরিলে সব হবে মাটি ত্বরায় এই ভেদ লও জেনে।। ___ লালন
★ মানুষ থুইয়া খোদা ভজ এই মন্ত্রণা কে দিয়াছে ।। মানুষ ভজ কোরান খুঁজ পাতায় পাতায় সাক্ষী আছে ।। __
মানুষেরি ছবি আক পায়ের ধুলো গায়ে মাখ শরীয়ত সঙ্গে রাখ তত্ত্ব বিষয় গোপন আছে ।।
★ মানুষ ধর মানুষ ভজ শোন বলি রে পাগল মন। মানুষের ভিতরে মানুষ করিতেছে বিরাজন।।
★ “ শুনহে হে মানুষ ভাই, সবার উপরে মানুষ সত্য তাহার উপরে নাই ” __ চন্ডীদাস
★ "গাহি সাম্যের গান মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই নহে কিছু মহীয়ান," ___ নজরুল।
★ তনমন বিদায় কর ধরিয়া মুর্শিদের চরণ রাহাতে বসি থাক সর্বদা যদি সে চাহ তাঁর মিলন' ......! ____ ডুবিয়ে যাও চরণ তলে ভেসনা কখন সংসার হাওয়ায়। ভক্তি রসে প্লাবিত হয়ে অমর হও কদম তলায়।। ___ শাহ্‌পীর।
★ আমার মাথা নত করে দাও হে তোমার চরণধুলার তলে। সকল অহংকার হে আমার ডুবাও চোখের জলে॥ ___
★ চরণ ধরিতে দিয়ো গো আমারে, নিয়ো না, নিয়ো না সরায়ে জীবন মরণ সুখ দুখ দিয়ে বক্ষে ধরিব জড়ায়ে।। ___ রবীন্দ্রনাথ।

Tuesday, 14 June 2016

নজরুলের ধর্মমত ও অসাম্প্রদায়িকতা

2 Comments
নজরুল ইসলামকে কেউ খুবই ভালোবেসেছেন, কেউ বা অসম্ভব ঘৃণা করেছেন। কিন্তু কেউই তাকে অবহেলা করতে পারেননি। তিনি যখন জনপ্রিয়তার একেবারে তুঙ্গে, তখনো কেবল প্রশংসার জোয়ারে ভাসেননি, বরং তীব্র নিন্দা আকর্ষণ করেছেন অনেকের তরফ থেকে। যেমন, মৌলবীরা (নজরুলের ভাষায় মৌ-লোভীরা) ফতোয়া দিয়েছিলেন যে, তিনি কাজী হলেও কাফের। আর হিন্দুরা তাকে উপাধি দিয়েছিলেন পাত নেড়েতাঁর ভাষায় পুরুষরা তাঁকে গান দিয়েছেন, মেয়েরা তাকে অভিশাপ দিয়েছেন নারীবিদ্বেষী বলে চরকার গান লিখেছেন বলে তার নিন্দা করেছেন বিপ্লবীরা, আর কংগ্রেসীরা তাকে অবিশ্বাস করেছেন বিপ্লবী ঠাহর করে। তা হলে নজরুল আসলে কী ? আপাতদৃষ্টিতে তার পরস্পরবিরোধী ব্যক্তিত্বের পেছনে আছে তার প্রবল পছন্দ-অপছন্দ। তিনি যা বলেছেন, চীৎকার করে বলেছেন। তিনি যে-পথে চলেছেন, তার মাঝখান দিয়ে চলেছেন। আপোশ করে চলা, পাশ কাটিয়ে চলা তার চরিত্রের বৈশিষ্ট্য নয় আরও একটু খতিয়ে দেখলে দেখা যাবে, তীব্রতাই তার বিশ্বাসের একমাত্র বৈশিষ্ট্য নয়, তার বিশ্বাস অটল, ধ্রুবতারার মতো। কখনো তিনি এলিয়ে পড়েননি, কারণ একটা শক্ত ভিত্তি ছিলো তার বিশ্বাসের। সেই ভিত্তিটা মানবতার। সব মত, সব পথের উর্ধ্বে মানুষকে নিতান্ত মানুষ হিশেবে দেখার ক্ষমতা ছিলো তার। সে শক্তি তিনি সম্ভবত অর্জন করেননি, সেটা ছিলো তার স্বভাবেরই অংশ। তার যে মানবপ্রীতির জন্যে তিনি মানুষের অকুণ্ঠ ভালোবাসা লাভ করেছিলেন, সেই মানবপ্রীতিই তাকে আবার অনেকের কাছে, অনেক গোষ্ঠীর কাছে অপ্রিয় করে তুলেছিলো। তিনি মানুষে মানুষে সাম্যের কথা বলেছেন, কিন্তু কমিউনিষ্ট হতে পারেননি। এমন কি, তার ঘনিষ্ঠতম বন্ধু কমিউনিস্ট পার্টি গড়ে তুললেও, তিনি তাতে যোগ দিতে পারেননি। কারণ, তার মানবপ্রীতিকে কতোগুলো বিধান অথবা একটা কট্টর আদর্শের ছকে ফেলতে পারেননি তিনি। এক সমাজকে মানলে, করবে / আরেক সমাজ নির্বাসন। কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ধর্ম, কোনো রাজনৈতিক দল, কোনো গোষ্ঠীর সঙ্গে তিনি একাত্ম হতে পারেননি। তার মানবতার সংজ্ঞার সঙ্গে কারো ষোলো আনা মিল হয়নি নজরুল হয়তো ঠিকই বলেছেনতিনি বর্তমানের কবি, ভবিষ্যতের নবী নন। হয়তো তার সাহিত্য চিরকালীন সাহিত্য নয়। কিন্তু তিনি যে-মানবতার কথা বলেছিলেন, তা চিরকালের তার আগে অথবা পরে কোনো বাঙালি সাহিত্যিক, কোনো দার্শনিক, কোনো ধর্মীয় নেতা, এমন দ্ব্যর্থহীন ভাষায় মানবতার জয় গান করতে পারেননিমানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান। সত্য বটে, তার অন্তত দু শতাব্দী আগে চণ্ডীদাস বলেছিলেন, সবার উপরে মানুষ সত্য তাহার উপরে নাই। কিন্তু চণ্ডীদাসের মানুষ এবং নজরুলের মানুষ এক নন। চণ্ডীদাস মনের মানুষের কথা বলেছিলেন। 
নজরুল বলেছিলেন রক্তমাংসের মানুষের কথা। মানুষের প্রতি এই অকৃত্রিম ভালোবাসার জন্যেই নজরুল বলতে পেরেছিলেন যে, জগতের সব পবিত্র গ্রন্থ এবং ভজনালয়ের চেয়ে একটি মানুষের ক্ষুদ্র দেহ অনেক বেশি পবিত্র। মানুষকে ঘৃণা করে যারা ধর্মগ্রন্থ পড়েন, তিনি তাদের কাছ থেকে ধর্মগ্রন্থ কেড়ে নেওয়ার আহবান জানিয়েছিলেন। মন্দির-মসজিদ ভেঙে ফেলার জন্যে কালাপাহাড় এবং গজনি মামুদকে আহবান জানিয়েছিলেন। সকল সাম্প্রদায়িকতার উর্ধ্বে তার এই যে-মানবপ্রীতি, তা- তাকে হিন্দু নয়, মুসলমান নয়, খাটি বাঙালিতে পরিণত করেছিলো অথচ নজরুল রীতিমতো মুসলমান হতে পারতেন। তিনি যে-অশিক্ষিত পরিবারে জন্মেছিলেন, সে পরিবারে আনুষ্ঠানিক ইসলাম ধর্মই পালিত হতো। আর, ছেলেবেলা সেই ধর্মের শাস্ত্র পড়েই মাত্র দশ বছর বয়সে মসগিদে নামাজ পড়ানোর চাকরি পেয়েছিলেন। পরবর্তীকালে তিনি যেসব ইসলামী গান লিখেছিলেন, তা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, কোরান-হাদিস তিনি ভালোই জানতেন। কিন্তু ছেলেবেলার এই শিক্ষা সত্ত্বেও তিনি মোল্লাহ হলেন না, বরং কয়েক বছরের মধ্যে কাফের কাজীউপাধি লাভ করেন পরিণত নজরুল যে কেবল ইসলাম ধর্মের কতোগুলো বিধানের বিরোধিতা করলেন, তাই নয়; আনুষ্ঠানিক ধর্মেরই তিনি পদচিহ্ন এঁকে দিলেন। কি করে এটা সম্ভব হয়েছিলো, বলা শক্ত। ছাত্রজীবনে এবং সেনাবাহিনীতে থাকার সময় তিনি অন্য সম্প্রদায়ের মানুষের ঘনিষ্ঠতায় এসেছিলেন-- এই একটি তথ্য দিয়েই ব্যাখ্যা দেওয়া যায় না। হতে পারে বাংলার গ্রামীণ সংস্কৃতিতে যে সমন্বয়বাদী এবং ভক্তিবাদী ধর্ম প্রচলিত ছিলো, নিজের অজ্ঞাতেই সেই ধর্ম দিয়ে তিনি প্রভাবিত হয়েছিলেন। কিন্তু সেভাবেই হোক তার দৃষ্টিভঙ্গিতেই একটা অসাধারণ মানবতাবাদী ঔদার্য্য ছিলো। সাধনা করে অথবা বৈদগ্ধ্য দিয়ে এটা তিনি আয়ত্ত করেছিলেন বলে মনে হয় না। তার ফলে মাত্র তেইশ বছর বয়সেই তিনি উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন যে, কোনো আনুষ্ঠানিক ধর্মে বিশ্বাস আন্তরিক হলে সাম্প্রদায়িকতার উর্ধ্বে ওঠা যায় না অথবা মানুষকে সমান চোখে দেখা যায় না সত্যিকারভাবে সাম্প্রদায়িকতার উপরে উঠতে পেরেছিলেন বলেই, জাতিভেদের মানবতা-বিরোধী বিকট চেহারা এবং ভণ্ডামির স্বরূপ তিনি চোখে আঙুল দিয়ে দেখাতে পেরেছিলেন। তিনি প্রশ্ন করেছিলেন, ‘বলতে পারিস বিশ্বপিতা ভগবানের কোন সে জাত ? / কোন ছেলের তার লাগলে ছোওয়া অশুচি হন জগন্নাথ ? তিনি আপসোস করেছেন, মানুষ নাই আজ, আছে শুধু জাত-শেয়ালের হুক্কাহুয়া তার আগেকার আট শো বছরের বাংলা সাহিত্যে সম্ভবত লালন ফকিরই জাতের এই মানবতা-বিরোধী চেহারা দেখতে পেয়েছিলেন এবং তিনিও তা দেখতে পেয়েছিলেন ভূমিজ সন্তান ছিলেন বলে। কিন্তু নজরুল জাতের নামে বজ্জাতির কথা লেখার পর যে-আশি বছর চলে গেছে, তার মধ্যে অন্য কেউ-আর এমন দ্ব্যর্থহীন ভাষায় জাতের বিভেদমূলক স্বরূপ তুলে ধরেননি। নজরুল রাজনীতিক ছিলেন না। কিন্তু সমকালের রাজনীতি দিয়ে অত্যন্ত প্রভাবিত হয়েছিলেন। তার চারদিকে যেসব ঘটনা ঘটছিলো, সে সম্পর্কে তিনি সাহিত্যিক নির্লিপ্ততা অথবা নীরবতা পালন করতে পারেননি।

সে জন্যেই চিত্তরঞ্জন দাশ হিন্দু-মুসলমানের ঐক্যের যে-প্রয়াস দেখিয়েছিলেন, তাকে তিনি যেমন উদাত্ত কণ্ঠে স্বাগত জানিয়েছিলেন, অন্য কেউ তা জানাননি। চিত্তরঞ্জনের মৃত্যুর পর তিনি একটি কবিতায় লিখেছিলেন যে, মুহাম্মদের আগে তার জন্ম হলে কোরানেও তার নাম থাকতো এমন সাহসের কথা বোধ হয় পরাধীন ভারতবর্ষেই লেখা সম্ভব ছিলো এখন ধর্মীয় উন্মত্ততার যুগে স্বাধীন ভারত অথবা স্বাধীন বাংলাদেশকোথাও কথা বলার জো নেই। হিন্দু-মুসলিম ঐক্য অথবা অনৈক্য নজরুলের মনে যে কী প্রবল ভাবাবেগ এবং প্যাশনের জন্ম দিতো, তা আভাস পাওয়া যায় চিত্তরঞ্জন মারা যাওয়ার পরের বছর। ১৯২৬ সালের এপ্রিলে কলকাতায়, বলতে গেলে, সুপরিকল্পিতভাবে হিন্দু-মুসলমানের দাঙ্গা বাধিয়ে দেওয়া হয় মসজিদের পাশ দিয়ে যাবার সময়ে সবাই বাজনা বাজানো বন্ধ করেছিলো, একটি লোক ছাড়া। তার জবাবে মসজিদের ভেতর থেকে একদল লোক বেরিয়ে আসা অসম্ভব নয়। কিন্তু তারা লাঠিসোটা এবং ধারালো অস্ত্র কি করে পেলো কোনো পরিকল্পনা ছাড়া, বলা মুশকিল। সে যাই হোক, এই দাঙ্গাই ছিলো বঙ্গদেশের প্রথম সবচেয়ে ভয়াবহ দাঙ্গা। এতে বন্দুকও ব্যবহৃত হয়েছিলো। এর অল্প দিন পরেই কৃষ্ণনগরে কংগ্রেসের অধিবেশন হয়। নজরুল এই দাঙ্গার পরিপ্রেক্ষিতে গান লেখেনকাণ্ডারী হুঁশিয়ার গানে তিনি রাজনীতিকদের মনে করিয়ে দেন তাদের দায়িত্বের কথাঅসহায় জাতি ডুবে মরছে। সময়ে ওরা হিন্দু, না মুসলিম প্রশ্ন তোলা অসঙ্গত, কারণ ওদের একমাত্র পরিচয় ওরা দেশমাতার সন্তান। কংগ্রেসের সম্মেলনে নজরুল আর দিলীপকুমার রায় গান উদাত্ত গলায় গেয়ে শোনান। কিন্তু রাজনীতিকরা তাদের আবেদনের প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠি দেখিয়ে চিত্তরঞ্জনের হিন্দু-মুসলিম প্যাক্ট বাতিল করেন। কেবল রাজনীতিক নন, অন্যরাও দাঙ্গার সময়ে নিজেদের গা বাচিয়ে চলেছিলেন। কলকাতায় তখন ছোটােবড়ো সংস্কৃতিকর্মী, বুদ্ধিজীবী, শিল্পীহিন্দুমুসলমান উভয় সম্প্রদায়েরকম ছিলেন না। এমন কি, রবীন্দ্রনাথ এবং শরৎচন্দ্রের মতো সাহিত্যিকও ছিলেন। সৌম্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের আত্মজীবনী থেকে জানা যায়, এই দাঙ্গার সময়ে ঠাকুরবাড়ির ভিস্তি আবদুলের দু কান কেটে দিয়েছিলো দাঙ্গাকারীরা। রক্ত ঝরতে থাকা কান নিয়েই আবদুল জোড়াসাকোর বাড়িতে এসে মুখ থুবড়ে পড়েছিলো। আর-একদিন জনাচল্লিশ মুসলমান দাঙ্গাবাজদের তাড়া খেয়ে দেওয়াল টপকে বাড়িতে ঢুকে পড়েছিলো। সুতরাং বাড়ির কারো দাঙ্গার কথা অজানা ছিলো না। সম্ভবত রবীন্দ্রনাথেরও নয়। কিন্তু সমাজের বিশিষ্ট হিন্দু-মুসলমান কেউই নজরুলের মতো জোর গলায় কাণ্ডারী হুশিয়ার গাওয়া দূরে থাক, গুনগুন করেও হিন্দুমুসলিম ভ্রাতৃত্বের সুর ভাঁজেননি। রবীন্দ্রনাথ, ধরা যাক, খবরের কাগজে একটা বিবৃতি অন্তত দিতে পারতেন। বঙ্গভঙ্গের সময়ে তিনিই তো রাখী পরিয়েছিলেন মুসলমানের হাতে! একমাত্র কাণ্ডারী হুশিয়ার গান নয়, ১৯২৬ সালের দাঙ্গা দেখে নজরুল এতো ব্যাকুল হয়েছিলেন যে, তিনি মন্দির মসজিদ এবং হিন্দু-মুসলমাননামে দুটি প্রবন্ধও লিখেছিলেন। মন্দির মসজিদ প্রবন্ধে আবেগে আপুত হয়ে তিনি প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মের অনুসারীদের ধিক্কার দিয়েছেন।
ধর্ম যে মানুষের তৈরি এবং অর্থহীন, তারও ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি। হত-আহতদের ক্ৰন্দনে মসজিদ টলিল না, মন্দিরের পাষাণ দেবতা সাড়া দিল না। শুধু নির্বোধ মানুষের রক্তে তাহদের বেদী চিরকলঙ্কিত হইয়া রহিল।' কিন্তু হতাশা দিয়েই তার বক্তব্য তিনি শেষ করেননি। আশা করেছেন সেই রুদ্র আসিতেছেন, যিনি ধর্ম-মাতালদের আডডা মন্দিরমসজিদ-গীর্জা ভাঙিয়া সকল মানুষকে এক আকাশের গম্বুজতলে লইয়া আসিবেন। হিন্দু-মুসলমান প্রবন্ধে লিখেছেন, এই দুই সম্প্রদায়ের বিরোধের প্রধান কারণ মোল্লা-পুরুতের দেওয়া শাস্ত্রের অপব্যাখ্যা হিন্দুত্ব মুসলমানত্ব দুই সওয়া যায়, কিন্তু তাদের টিকিত্ব দাড়িত্ব অসহ্য, কেননা দুটোই মারামারি বাধায়। টিকিত্ব হিন্দুত্ব নয়, ওটা হয়ত পণ্ডিতত্ব! তেমনি দাড়িও ইসলামত্ব নয়, ওটা মোল্লাত্ব!দাঙ্গাকে কেন্দ্র করে একবারই নয়, নজরুল বারবার হিন্দু-মুসলমানের মিলন এবং ভ্রাতৃত্বের কথা বলেছেন। মনে করিয়ে দিয়েছেন মোরা একটি বৃন্তে দুটি কুসুম হিন্দু মুসলমান। কখনো বলেছেন হিন্দু-মুসলমান দেশমাতার দুই আঁখি-তারার মতো। ভুল বোঝাবুঝি থেকে তাদের মনোমালিন্য হতে পারে, মারামারিও অসম্ভব নয়। কিন্তু তারা একই মায়ের দু সন্তান। তারা একই ভাষায় মাকে ডাকেন। বস্তুত, সংক্ষেপে বলা যায়, তিনি যেভাবে বারংবার হিন্দু-মুসলমানের মিলনের চেষ্টা করেছেন, বাংলা সাহিত্যে অন্য কেউ তা করেননি। অন্তরের অনুভূতি দিয়ে তো নয়ই, এমন কি, সামাজিক দায়িত্ব হিশেবেও নয়। আরও একটি জিনিশ বিশেষ করে লক্ষ্য করার মতোতিনিই প্রথম হিন্দু এবং মুসলিম ঐতিহ্যের অসামান্য মিলন ঘটিয়েছিলেন। কবিতার একই চরণে তিনি দেবতা এবং ফেরেশতা, অবতার এবং পয়গম্বরের কথা বলতে পারতেন। তিনিই বাংলা সাহিত্যের একমাত্র কবি, যিনি একই সঙ্গে হিন্দু এবং মুসলমানী ধর্মীয় সঙ্গীত রচনা করেছেন। কেবল তাই নয়, একই সঙ্গে রচনা করেছেন কীর্তন এবং শ্যামাসঙ্গীত তার শ্যামাসঙ্গীতে তিনি আবার শ্যামামায়ের সঙ্গে মিলন ঘটাতে পেরেছেন শ্যামের তার ভক্তির দৃষ্টিতে সব ধর্ম, সব বর্ণ একাকার হয়ে গেছে। কেউ কেউ বলেন, নজরুলের সাহিত্যে বৈদগ্ধ্যের অভাব ছিলো তার নিজের ভাষায় "সেই চিরকেলে বাণী ছিলো না। কিন্তু তা সত্ত্বেও তার আগে অথবা পরে কেউই সব্যসাচীর মতো হিন্দু-মুসলিম ঐহিত্যের এমন সমন্বয় ঘটাতে পারেননি। রবীন্দ্রনাথও নন। সাহিত্যের মান বিচার করলে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে নজরুলের কোনো তুলনা চলে না, কিন্তু ঐতিহ্য সমন্বয়ের প্রশ্ন উঠলে স্বীকার করতেই হবে যে, নজরুল যেমন করে হিন্দু-মুসলিম ঐহিত্যের সমন্বয় ঘটিয়েছিলেন, রবীন্দ্রনাথ তা আদৌ করতে পারেননি। করার চেষ্টাও করেননি। বস্তুত, বাড়ির কাছের পড়শিদের প্রাঙ্গণের ধারে গেলেও তিনি তাদের বাড়িতে ঢোকার চেষ্টা করেননি। অপর পক্ষে, নজরুল তা কেবল করেননি, সার্থকভাবে করেছিলেন তিনি যেভাবে তৎসম-তদ্ভব শব্দের সঙ্গে আরবি-ফারসি শব্দের মিলন ঘটিয়েছিলেন, তাও একমাত্র তারই রচনায় দেখা যায়। এবং তিনি এটা করেছিলেন, আধুনিক বাংলা ভাষার জন্মদাতা এবং পালক রবীন্দ্রনাথ যখন খুনশব্দের ব্যবহারে বিরক্ত হয়েছেন, সেই প্রতিকূল সময়ে।
হিন্দু-মুসলমানের মিলনের প্রয়াসে তিনি যে-ভূমিকা রেখেছিলেন, নজরুল নিজেই তার মূল্যায়ন করেছেন: 'আমি মাত্র হিন্দু-মুসলমানকে এক জায়গায় ধরে এনে হ্যান্ড শেক করাবার চেষ্টা করেছি। কিন্তু আজও হিন্দু-মুসলমান এক হতে পারেননি। স্বাধীনতা লাভের পরে শিক্ষা এবং অর্থনীতির উন্নতির ফলে তাদের পারপরিক রক্তপাত এবং হানাহানি বন্ধ হওয়া উচিত ছিলো। কিন্তু তা হয়নি। বরং পশ্চিমবঙ্গে গৈরিক পতাকা এখন পতপত করে উড়তে শুরু করেছে। আর বাংলাদেশে হিন্দু খেদানোর সহিংস প্রক্রিয়া আরও জোরদার হয়েছে। বাংলাদেশে ইদানীং দাঙা হলে, হিন্দু খুন করে পুণ্য অর্জনের চেষ্টা না-করে ধর্মান্ধরা হিন্দু মেয়েদের ধর্ষণ করে আর বাড়িতে আগুন লাগায়। তাদের লক্ষ্য; ভয়ভীতি দেখিয়ে হিন্দুদের তাড়িয়ে দিয়ে তাদের সম্পত্তি আত্মসাৎ করা। এমন কি, তথাকথিত গণতান্ত্রিক নির্বাচনের পরেও হিন্দুদের ওপর নেমে আসে অত্যাচারের খড়গ কৃপাণ তাদের অপরাধ: সম্ভবত তারা অসাম্প্রদায়িক প্রার্থীদের ভোট দিয়েছেন। মোট কথা, রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হলেও, হিন্দু-মুসলমানের প্রেম কিছু বৃদ্ধি পায়নি। নজরুলের প্রয়াস ব্যর্থ হয়েছে। আশি বছর আগে চিত্তরঞ্জন সম্পর্কে তিনি লিখেছিলেন, হিন্দু-মুসলমানের পরানে তুমিই বাধিলে সেতু! কথা সমান সত্য তার সম্পর্কেও। কিন্তু মর্মান্তিক সত্য হলো: চিত্তরঞ্জন এবং নজরুল প্রেমের আহবান জানালেও, দুজনার ললিত বাণীই হাওয়ায় ভেসে গেছে। নজরুলের অসাম্প্রদায়িকতা আমরা যে কেবল সাহিত্যের মধ্যেই লক্ষ্য করি, তাই নয়। ব্যক্তিগত জীবনেও তিনি আনুষ্ঠানিক ধর্মের উর্ধ্বে উঠতে পেরেছিলেন। তার বন্ধুত্ব কোনো ধর্মীয় গভীর মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিলো না। এমন কি, বিয়েও তিনি করেছিলেন নিজের ধর্মের সীমানা অতিক্রম করে। এসব ক্ষেত্রে মুসলমানরা স্ত্রীকে ধর্মান্তরিত করেন। অপর পক্ষে, নজরুলের সেই সৎসাহস ছিলো যে, প্রমীলার ধর্মবিশ্বাসের ওপর প্রভাব না-খাটিয়েই তাকে বিয়ে করতে পেরেছিলেন। যে পরিবারে তিনি বিয়ে করেছিলেন, সেই পরিবারের সদস্যরা তাকে ভালোবাসতেন। কিন্তু তাদের বাড়ির কন্যাকে মুসলমানের সঙ্গে বিয়ে দেওয়ার জন্যে তৈরি ছিলেন না। এই পরিবারের বিরজাসুন্দরী দেবীকে নজরুল নিজের মায়ের শূন্য আসনে বসিয়েছিলেন, কিন্তু তিনিও বিয়ে মেনে নিতে পারেননি। হিন্দু সমাজের অনেক রক্ষণশীল সদস্যরাও নয়। কারণ, একে তারা বিবেচনা করেছিলেন তাদের জাত মারার একটি চোখ-ধাধানো দৃষ্টান্ত হিশেবে সন্তানদের নামকরণ এবং শিক্ষায়ও এই অসাম্প্রদায়িকতার প্রমাণ দিয়েছিলেন নজরুল। তার প্রথম সন্তানের নাম তিনি দিয়েছিলেন কৃষ্ণ মহাম্মদ। মুসলমানদের মধ্যে এখন বাংলায় নাম রাখেন অনেকেই। কিন্তু কৃষ্ণ এবং মহাম্মদের মিলন ঘটিয়ে নয়। দ্বিতীয় পুত্রের নাম দিয়েছিলেন অরিন্দম খালেদ তৃতীয় এবং চতুর্থ পুত্রের নাম দিয়েছিলেন যথাক্রমে সব্যসাচী আর অনিরুদ্ধ। অরিন্দম, সব্যসাচী এবং অনিরুদ্ধতিনটি নামেরই ধর্মনিরপেক্ষ অর্থ থাকলেও, তাদের ধর্মীয় অনুষঙ্গই প্রধান মুসলমানরা এতে তার প্রতি প্রসন্ন হতে পারেননি। কিন্তু নজরুল সে সমালোচনা অগ্রাহ্য করতে পেরেছিলেন। কারণ, আনুষ্ঠানিক ধর্মের চেয়েও মানবিক এবং ভাষিক পরিচয় তার কাছে বড়ো ছিলো। সন্তানদের তিনি কোনো ধর্মীয় শিক্ষাও দেননি। নিজেও ব্যক্তিগত জীবনে কোনো ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালন করতেন না। দ্বিতীয় পুত্র মারা যাওয়ার পর তিনি যখন শোকে প্রায় উন্মাদ হয়ে যান, তখন অবশ্য বরদাচরণ মজুমদারের প্রভাবে পড়ে তিনি কালী পূজো করতে আরম্ভ করেছিলেন বলে কেউ কেউ লিখেছেন

অদৃষ্টের পরিহাস এই যে, যে-নজরুল ধর্মনিরপেক্ষ মানবতার গান গেয়েছেন, মুসলমানরা, বিশেষ করে পূর্ব পাকিস্তানের মুসলমানরা সেই নজরুলের নাম ব্যবহার করেই মুসলিম জাতীয়তাবাদের নিশান উড়িয়েছেন। তারা নজরুলের নাম ভাঙিয়েছেন নিজেদের সাম্প্রদায়িক উদ্দেশ্য হাসিল করার জন্যে। রবীন্দ্রনাথ থেকে সাধারণ মানুষের দৃষ্টি সরিয়ে রাখার জন্যে পাকিস্তানীরা নজরুলকে খাড়া করেন মুসলমান-রবীন্দ্রনাথ হিশেবে তার কবিতার ভাষা সংস্কার করে তারা নজরুলের ভগবান'কে 'রহমানে পরিণত করেন। মহাশ্মশানকে বদলে করেন গোরস্থান সামগ্রিক নজরুলকে নয়, তারা খাড়া করলেন এক খণ্ডিত নজরুলকে নজরুলের ইসলামী গান বাজানো হলো বেতারে, টিভিতে। নজরুল যে শ্যামাসঙ্গীত, কীর্তন এবং অন্যান্য ভক্তিবাদী গানও লিখেছিলেন, তার কথা কেউ জানলোও না। পাঠ্যবইতে তিনি যে-প্রাধান্য পেলেন তা তার অবদানকে ছাড়িয়ে গেলো। এমন কি, অনেক সময়ে রবীন্দ্রনাথ স্নান হয়ে গেলেন নজরুলের ছায়ায় যে-কালে রবীন্দ্রজয়ন্তী পালন করাকে সরকার ভালো চোখে দেখতো না, এই কালে নজরুল-জয়ন্তী পালনে সরকারের উদার পৃষ্ঠপোষণ মিললো। এমন কি, যে-নজরুলকে ১৯২০-এর দশকে মুসলমানরা নমরুদ, ফেরাউন, শয়তানের অবতার এবং কাফের বলে গাল দিয়েছিলেন, সেই নজরুল পঞ্চাশের দশকে সংস্কার-সাপেক্ষে মুসলমান হয়ে উঠলেন, আর শতাব্দীর শেষে এসে নব্যসাম্প্রদায়িকতায়-উন্মত্ত লোকেদের কাছে তিনি পাক্কা মুসলমানে পরিণত হলেন নজরুল একদিনে মরেননি তিনি নির্বাক হয়ে বেঁচেছিলেন পয়তিরিশ বছর। তারপর কেটে গেছে আরও তিরিশ বছর এই প্রায় পয়ষট্টি বছরের মধ্যে তিনি কয়েকবার মারা যান। তার গানের চরম অনাদর থেকে মনে হয়, তিনি প্রথম বার মারা যান পশ্চিমবাংলায়, দেশবিভাগের ঠিক পরে। মনে হয়, তার পেছনেও ছিলো সাম্প্রদায়িকতা। দ্বিতীয় বার তিনি মারা যান পূর্ব পাকিস্তানে, তাকে খণ্ড খণ্ড করে হাজির করায়। তৃতীয়বার মারা যান বাংলাদেশে, শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করায়। চতুর্থবারও মারা যান বাংলাদেশে মৌলবাদীদের হাতে এবারে কেবল ব্যক্তি নজরুল নন, তার আদর্শও ভূত অর্থাৎ অতীত হয়ে যায়। নজরুল মরেও মুসলিম জাতীয়তাবাদের হাত থেকে রেহাই পাননি। পরিজনের মতামত ছাড়াই তাকে যে ঢাকায় সমাধিস্থ করা হয়, সেও ইসলামের প্রতীক হিশেবে তার নাম ব্যবহার করার জাতীয়তাবাদী উদ্দেশ্য থেকেই অথচ ধমীয় জাতীয়তাবাদের প্রভাবে উভয় বাংলাতেই বাঙালিত্ব যখন বিপন্ন, এমন কি, বিপন্ন যখন মনুষ্যত্ব, তখন নজরুলের বেঁচে থাকাটাই খুবই দরকার ছিলো। বস্তুত, একজন নজরুল নয়, খুবই দরকার ছিলো ঘরে ঘরে নজরুলের।

 
back to top