Showing posts with label মসজিদে নববী. Show all posts
Showing posts with label মসজিদে নববী. Show all posts

Sunday, 4 June 2017

মদীনায় কুবা মসজিদ ও মসজিদে নববী

0 Comments

মদীনায় প্রথম ইসলামি শাসন প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর মসজিদ ছিল প্রথম সামাজিক প্রতিষ্ঠান যা সরাসরি বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)’র উদ্যোগে নির্মিত হয়েছিল। এই পবিত্র প্রতিষ্ঠানটি গত ১৪০০ বছরে বহু চড়াই উৎরাই পেরিয়ে আজকের অবস্থানে এসে দাঁড়িয়েছে। কখনো কখনো মসজিদের বাহ্যিক চেহারাকে রাজপ্রাসাদের আকৃতি দেয়া হলেও ইবাদত-বন্দেগীর পবিত্র স্থান হিসেবে মসজিদের ভূমিকা কখনো ম্লান হয়ে যায়নি।
মসজিদ হচ্ছে কিবলামুখী একটি পবিত্র স্থান যা নির্ধারিত হয়েছে জামাতে নামাজ আদায় করার জন্য। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মসজিদ দেয়াল দিয়ে ঘেরা থাকলেও কোথাও কোথাও দেয়ালবিহীন মসজিদও দেখতে পাওয়া যায়। কোনো কোনো মসজিদে রয়েছে রেশমি কার্পেট আবার কোনো কোনো মসজিদে বালুর তপ্ত ভূমির উপরে মুসল্লিদের নামাজ আদায় করতে হয়। কোনো কোনো মসজিদে রয়েছে সুউচ্চ ছাদ, আকাশচুম্বী মিনার এবং দেয়ালে রয়েছে চোখ ধাঁধানো কারুকাজ। আবার কোনো কোনো মসজিদে এসবের কোনো কিছুর বালাই নেই। কিন্তু মজার ব্যাপার হচ্ছে, পবিত্রতা এবং আল্লাহর নৈকট্য অর্জিনের দিক দিয়ে এই দুই ধরনের মসজিদের মধ্যে কোনো গুণগত পার্থক্য নেই। ইবাদত কবুল হওয়ার জন্য মসজিদের বাহ্যিক বেশভূষা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয়। তবে হ্যাঁ মসজিদে যতই দারিদ্রের ছাপ থাকুন না কেন এটিকে পরিচ্ছন্ন, পরিপাটি ও পাকপবিত্র রাখতে হবে।
মহানবী (সা.) মক্কা থেকে মদীনায় হিজরত করার পরপরই সর্বপ্রথম ইসলামি শাসনকাজ পরিচালনার স্থান হিসেবে মসজিদ নির্মাণের কাজে হাত দেন। শুধু নামাজ আদায় নয় সেইসঙ্গে রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার লক্ষ্যে তিনি এই পবিত্র স্থাপনাটি নির্মাণ করেছিলেন। যে স্থানে শাসক ও শাসিত দুজনই উপস্থিত থাকবেন এবং যেখানে আল্লাহর হুকুম-আহকাম শিক্ষা দেয়া হবে। সাহাবীদের সঙ্গে বিশ্বনবীর মিলনমেলা ছিল এই মসজিদ। রাসূলুল্লাহ (সা.) অত্যন্ত আন্তরিকতা ও বন্ধুত্বপূর্ণ ব্যবহারের মাধ্যমে মানুষের কাছে ধর্মের দাওয়াত দিতেন। সমাজে আল্লাহর হুকুম বাস্তবায়ন করার লক্ষ্যে কোনো কাজ তিনি আগে নিজে করে দেখাতেন এবং তারপর সবাইকে করতে বলতেন। দূর-দূরান্ত থেকে কেউ বিশ্বনবীর সঙ্গে দেখা করতে আসলে তার সঙ্গে তিনি মসজিদে সাক্ষাৎ করতেন। কোনোকিছু জনগণকে জানাতে চাইলে এই মসজিদে বসেই তিনি নিজে কিংবা কোনো একজন সাহাবীর মাধ্যমে তা সবাইকে জানাতেন।
মদীনায় ইসলামের প্রথম মসজিদটি নির্মিত হয়েছিল কুবা নামক স্থানে। নির্ভরযোগ্য হাদিসগ্রন্থে এই মসজিদ নির্মাণের ইতিহাস এভাবে বর্ণিত হয়েছে- মহানবী (সা.) সোমবার দিন মদীনার কুবা এলাকায় প্রবেশ করেন। এলাকাটিতে ছিল প্রচুর খেজুরের বাগান। এই এলাকার মানুষ সর্বপ্রথম আল্লাহর রাসূলকে স্বাদরে গ্রহণ করেন। কুবায় প্রবেশ করার পর তিনি চারদিন সেখানেই অবস্থান করেন। এরইমধ্যে হযরত আলী (আ.) এবং ফাতিমা সালামুল্লাহি আলাইহাসহ তাঁর পরিবারের অন্য সদস্যরা সেখানে পৌঁছে যান। এরপর তাঁরা সবাই মিলে মদীনার দিকে যাত্রা করেন। মদীনা সে সময় ইয়াসরিব নামে বেশি পরিচিত ছিল। কুবায় অবস্থান করার দিনগুলোতে বিশ্বনবী (সা.) প্রথম মসজিদ নির্মাণ করেন যার নাম দেয়া হয় কুবা মসজিদ। তিনি এই মসজিদে নামাজ আদায় করার ব্যাপারে বলেন, “যে ব্যক্তি আমার নির্মিত মসজিদ অর্থাৎ কুবা মসজিদে দুই রাকাত নফল নামাজ আদায় করবে তার আমলনামায় একটি ওমরাহ হজের সওয়াব লিখে দেয়া হবে। পরবর্তীতে রাসূলুল্লাহ (সা.) মূল মদীনা শহরে বসবাস শুরু করলেও সপ্তাহে একবার- কখনো শনিবার বা কোনো কোনো সপ্তাহে সোমবার নামাজ আদায় করার জন্য কুবা মসজিদে যেতেন।
আগেই যেমনটি বলেছি, মহানবী (সা.) চারদিন কুবায় অবস্থানের পর সবাইকে সঙ্গে নিয়ে মূল মদীনা শহরের দিকে অগ্রসর হন। স্থানীয় জনগণ বিশ্বনবী ও তাঁর সাহাবীদের বিপুল সংবর্ধনা দেন। প্রতি গোত্রের প্রতিনিধিরা তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে নিজ নিজ গোত্রে বিশ্বনবীকে আতিথেয়তা গ্রহণের আমন্ত্রণ জানাতে থাকেন। কেউ কেউ এসে রাসূলের উটের রশি ধরে টানাটানি শুরু করেন। বিশ্বনবী একটু কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়েন। কাকে রেখে কাকে খুশি করবেন! এ অবস্থায় তিনি নিজের সিদ্ধান্তের কথা জানান। বলেন, আপনারা উটের রশি ছেড়ে দিন। দেখি উটটি কোথায় গিয়ে বসে পড়ে। সে যার বাড়ির সামনে বসে পড়বে আমি সেই বাড়ির আতিথেয়তা গ্রহণ করব।

এই ঘটনায় দু’টি উল্লেখযোগ্য বিষয় দেখতে পাওয়া যায়। প্রথমত, রাসূলের উটটি যেখানে থেমেছিল এবং যেখানে এখন মসজিদে নববী রয়েছে সেটি নির্বাচন করে দিয়েছিলেন স্বয়ং আল্লাহ তায়ালা। এমনক এটি নির্ধারণে বিশ্বনবীরও হাত ছিল না। দ্বিতীয়ত, এই পদ্ধতি অনুসরণ করার ফলে মদীনার কোনো গোত্র মন খারাপ করার সুযোগ পেল না। আল্লাহর রাসূলের উটটি বনি মালিক বিন নাজ্জার নামক স্থানে গিয়ে বসে পড়ল। বিশ্বনবী (সা.) ওই জায়গায়ই মসজিদ নির্মাণের নির্দেশ দেন। মসজিদ নির্মাণের কাজে আল্লাহর রাসূল নিজে অংশগ্রহণ করেন এবং তিনি অন্য সবার চেয়ে বেশি পরিশ্রম করেন। তাঁর পরিশ্রম দেখে সাহাবীরা বহুবার তাঁকে বিশ্রাম নেয়ার অনুরোধ করলেও তিনি সে অনুরোধ রক্ষা না করে সবার সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে মসজিদ নির্মাণের কাজে অংশ নিয়েছেন।
মসজিদে নববীকে তখনকার যুগের একটি অনন্য স্থাপনা হিসেবে নির্মাণ করেছিলেন বিশ্বনবী। সে সময় অন্য কোনো স্থাপত্যশিল্প, এমনকি অন্য ধর্মের উপাসনালয়গুলোর নির্মাণশৈলির সঙ্গে এর কোনো মিল ছিল না; বরং ইসলামের গতিপ্রকৃতির সঙ্গে এই মসজিদ ছিল সম্পূর্ণ সঙ্গতিপূর্ণ। নবুওয়াত প্রাপ্তির আগে বিশ্বনবী তৎকালীন শাম বা সিরিয়াসহ আরো কিছু দেশ সফর করেছিলেন। এসব সফরে তিনি বহু গির্জা ও সিনাগগ ঘুরে দেখেছিলেন তিনি। নিঃসন্দেহে এসব উপাসনালয়ের নির্মাণশৈলি রাসূলুল্লাহ (সা.) র মাথায় ছিল। মসজিদে নববী তৈরির সময় ওই সব উপাসনালয় থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি নকশা তিনি দাঁড় করান। ভূমি থেকে এক মিটার উচ্চতা পর্যন্ত মসজিদের দেয়াল পাথর দিয়ে নির্মিত হয়। এরপর ছাদ পর্যন্ত দেয়া হয় রোদে পোড়ানো ইট। আর ছাদ তৈরি হয় খেজুর পাতা দিয়ে।

মসজিদে নববী তৈরি হওয়ার পর এর একাংশকে দরিদ্র মানুষের বসবাসের জন্য বরাদ্দ দেয়া হয়। এসব দরিদ্র মানুষের বেশিরভাগই ছিলেন মক্কা থেকে আসা মুহাজির। মক্কার কাফেরদের অত্যাচারে অতিষ্ট হয়ে তাঁরা নিজেদের ঘর-বাড়ি, সহায়-সম্বল ফেলে এক কাপড়ে রাসূলের সঙ্গে হিজরত করে মদীনায় গিয়েছিলেন। বিশ্বনবীর এসব সাহাবীকে আসহাব আস-সুফফা বলা হয়। মসজিদে নববীর সঙ্গে বিশ্বনবী (সা.)’র বসবাসের জন্য তৈরি হয়  একটি ঘর।  পরবর্তীতে সাহাবীদের মধ্যে সামর্থ্যবানরাও মসজিদের পাশে ঘর তৈরি করে মসজিদ অভিমুখে একটি করে দরজা রেখেছিলেন। নামাজের সময় হলে তারা ওই দরজা দিয়ে মসজিদে প্রবেশ করতেন। তৃতীয় হিজরিতে বিশ্বনবী (সা.) আলী ইবনে আবি তালিব (আ.) ছাড়া আর সবার ঘরের মসজিদ অভিমুখী দরজা বন্ধ করে দেয়ার নির্দেশ দেন।
রাসূলুল্লাহ (সা.)’র ইন্তেকালের পর মুসলমানদের সংখ্যা বৃদ্ধির পরিপ্রেক্ষিতে মসজিদে নববীতে মুসল্লিদের স্থান সংকুলানের সমস্যা দেখা দেয়। ফলে খলিফারা এই মসজিদ সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেন। মসজিদ সম্প্রসারণের এই কাজ কয়েক ধাপে চলে এবং আব্বাসীয় শাসনামলে এর আয়তন দাঁড়ায় ৯,০০০ বর্গমিটার। ওসমানীয় শাসনামলে মসজিদে নববী কয়েকবার পুনর্নির্মাণ করা হয়। ১২৬৫ হিজরিতে সুলতান আব্দুল হামিদ এই মসজিদ সংস্কারের বিশাল পরিকল্পনা হাতে নেন যা বাস্তবায়ন করতে ১৩ বছর সময় লাগে।

মসজিদে নববীর শিলালিপিতে বর্তমানে রাসূলের আহলে বাইত, নিষ্পাপ ইমাম ও খলিফাসহ আরো কয়েকজন উল্লেখযোগ্য সাহাবীর যেসব নাম আজও চোখে পড়ে তা ওসমানীয় শাসকদের লেখা। সৌদ রাজবংশ ক্ষমতায় আসার পরও কয়েক দফায় মসজিদে নববীর সংস্কার ও সম্প্রসারণ ঘটানো হয়েছে।  মদীনা শহরের সম্মান বৃদ্ধি করেছে এই মসজিদ। বিশ্বনবী (সা.) বলেছেন, হযরত ইব্রাহিম মক্কাকে নিরাপদ শহরে পরিণত করেছেন এবং এর অধিবাসীদের জন্য দোয়া করেছেন। আর আমি মদীনাকে করেছি নিরাপদ।
ইসলামের সোনালি যুগের সব শাসনামলে মসজিদে নববীর সাদামাটা গঠনকাঠামো ধরে রাখা হয়েছে। বিশ্বনবী (সা.)’র ওফাতের পর প্রথম খলিফার শাসনামলে এই মসজিদে কোনো ধরনের পরিবর্তন আনা হয়নি। দ্বিতীয় খলিফার আমলে শুধুমাত্র মসজিদের আয়তন এবং এর দরজার সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে। তৃতীয় খলিফার আমলে মসজিদের গঠনকাঠামোয় কিছুটা পরিবর্তন আনা হয়। এর পিলারগুলোতে টিনের পাত বসানো হয়। তবে উমাইয়ারা ক্ষমতায় আসার পর ইসলামি শাসনব্যবস্থায় মৌলিক পরিবর্তন আনা হয় যার প্রভাব মসজিদ নির্মাণের ওপরও পড়ে। মসজিদে নববীও এই পরিবর্তনের বাইরে থাকেনি।

মসজিদে নববীর গঠনকাঠামো ছিল অত্যন্ত সাদামাটা। এটির দেয়াল নির্মিত হয় পাথর ও রোদে পোড়ানো ইট দিয়ে। ছাদ দেয়া হয় খেজুর পাতা বিছিয়ে। মসজিদের মেঝেতে নুড়ি পাথর ও বালুর মিশ্রণ ছড়িয়ে দেয়া হয় যাতে ছাদ দিয়ে বৃষ্টির পানি চুঁইয়ে পড়লে তা দ্রুত শুকিয়ে যায়। ইতিহাসে এসেছে, মসজিদে নববী তৈরির কিছুদিন পরই মসজিদের ভেতরে বৃষ্টির পানি পড়ে জমে গিয়েছিল। এ অবস্থায় সাহাবীরা নুড়ি পাথর ও বালু এনে মসজিদের মেঝেতে ছড়িয়ে দেন যার ফলে পানি শুকিয়ে যায়। রাসূলুল্লাহ (সা.) এটি দেখে বলেন, খুব ভালো কাজ হয়েছে। তখন থেকে বহুকাল পর্যন্ত মসজিদে নববীর মেঝেতে বালু ও নুড়ি পাথর বেছানো ছিল। অবশ্য বর্তমানে এই মসজিদের মেঝেতে রয়েছে বিশালাকৃতির দামী কার্পেট।
মসজিদটি নির্মাণের সময় এটিতে যাতায়াতের জন্য তিনটি দরজা রাখা হয়। অবশ্য পরে মসজিদুল আকসা থেকে মসজিদুল হারামের দিকে কেবলা পরিবর্তিত হয়ে যাওয়ার পর মসজিদের পেছনের দিকের দরজাটি বন্ধ করে দেয়া হয়। এর পরিবর্তে উত্তর দিকে আরেকটি দরজা খোলা হয়। মসজিদের পশ্চিম দিকে ছিল আরেকটি দরজা যার নাম ছিল বাবে আতিকা। আতিকা ছিলেন মক্কার এক নারী যিনি ইসলাম গ্রহণের পর হিজরত করে মদীনায় চলে এসেছিলেন। দরজাটি এই নারীর বসবাসের ঘরের দিকে মুখ করা ছিল বলে এর নাম দেয়া হয় বাবে আতিকা বা আতিকার দরজা। এই দরজাটি বাবে রহমত নামেও প্রসিদ্ধ। এই নামকরণ সম্পর্কে ইতিহাসে এসেছে- একবার এক ব্যক্তি মসজিদে নববীতে এসে রাসূলুল্লাহ (সা.)’র কাছে বৃষ্টির জন্য দোয়া করার অনুরোধ জানান। আল্লাহর রাসূল দোয়া করলে টানা সাতদিন ধরে মদীনায় প্রবল বর্ষণ হয়। এ অবস্থায় বন্যার আশঙ্কায় লোকজন তাঁর কাছে এসে আবার বৃষ্টি বন্ধ করার জন্য দোয়া করার অনুরোধ জানায়। এবার বিশ্বনবী আবার দোয়া করলে বৃষ্টি থেমে যায়। বৃষ্টি যেহেতু আল্লাহর রহমত তাই এই দরজার নাম রাখা হয় বাবে রহমত বা রহমতের দরজা।
এই দরজা দিয়েই রাসূলুল্লাহ মসজিদে যাতায়ত করতেন বলে এটিকে বাবে নববীও বলা হয়। মসজিদের পূর্বদিকে রয়েছে আরেকটি দরজা যেটিকে বাবে জিবরাইল বা জিবরাইলের দরজা বলে অভিহিত করা হয়। বলা হয়ে থাকে, বনু কুরাইজার যুদ্ধের সময় আল্লাহর রাসূল এই দরজার কাছে হযরত জিবরাইলের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলেন বলে এর নাম দেয়া হয় বাবে জিবরাইল।

অবশ্য ধীরে ধীরে মসজিদে নববীর দরজার সংখ্যা বাড়তে থাকে। কারণ, অনেক সাহাবী মসজিদের আশপাশে বসবাসের জন্য ঘর নির্মাণ করেছিলেন। এসব ঘরের দু’টি দরজা থাকত। একটি ঘর থেকে বাইরে যাওয়ার জন্য আরেকটি ঘর থেকে মসজিদে যাতায়াতের জন্য। এই অবস্থা তৃতীয় হিজরি পর্যন্ত চলতে থাকে। ওই বছর আল্লাহর রাসূল নির্দেশ দেন, হযরত আলী (আ.)’র ঘর ছাড়া অন্য সবার ঘরের সঙ্গে মসজিদের দরজাগুলো বন্ধ করে দিতে হবে। অবশ্য বর্তমানে এই মসজিদে প্রবেশের জন্য রয়েছে সাতটি প্রধান ফটক এবং ছোটবড় ৮১টি দরজা।
মসজিদে নববীর একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশের নাম রওজায়ে মুতাহ্‌হারা। হাদিসে এই অংশে উপস্থিত হওয়ার গুরুত্বপূর্ণ ফজিলত বর্ণিত হয়েছে। বিশ্বনবী (সা.)  এই স্থানকে বেহেশতের বাগান বলে উল্লেখ করেছেন। রাসূলের পবিত্র কবর, তাঁর মিম্বর ও মেহরাব এই স্থানে অবস্থিত। যে স্থান থেকে এই মহামানবের পবিত্র ও নূরানি আত্মা আল্লাহর সাক্ষাতে চলে গেছে সেই স্থানেই তাঁর দেহ মোবারক দাফন করা হয়েছে। পরবর্তীতে প্রথম ও দ্বিতীয় খলিফাকে রাসূলুল্লাহর কবরের পাশে দাফন করা হয়। এগুলোর উত্তর পাশের একটি স্থানের নামকরণ করা হয়েছে নবীনন্দিনী হযরত ফাতেমা জাহরা সালামুল্লাহি আলাইহার কবরের নামে। যারা মনে করেন হযরত ফাতেমাকে তাঁর নিজ ঘরে দাফন করা হয়েছে তারা এই নামকরণ করেছেন। অবশ্য ইতিহাসে তাঁকে জান্নাতুল বাকিতে দাফন করার কথা বলা হয়েছে এবং সুন্নী মুসলমানরা এই বর্ণনাকে বেশি গ্রহণযোগ্য মনে করেন। রাসূলুল্লাহর কবর যে বিশাল কক্ষে অবস্থিত তাতে রয়েছে চারটি মজবুত পিলার  এবং এর উপরে রয়েছে সবুজ রঙের একটি সুদৃশ্য গম্বুজ।

মসজিদে নববীর আরেকটি পবিত্র অংশ হচ্ছে রাসূলুল্লাহ (সা.)’র মিম্বর। বর্ণনায় এসেছে, প্রথম দিকে আল্লাহর নবী একটি খেজুর গাছে হেলান দিয়ে খুতবা দিতেন। একদিন একজন সাহাবী খুতবা দেয়ার জন্য মিম্বর তৈরির প্রস্তাব দিয়ে বলেন, এটি নির্মিত হলে আল্লাহর রাসূল যেমন দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে ক্লান্ত হবেন না তেমনি সমবেত সব মুসল্লি উনাকে দেখতে পাবেন। বিশ্বনবী (সা.) এ প্রস্তাব গ্রহণ করেন। তৈরি হয় ইসলামের ইতিহাসের প্রথম মিম্বর। এটিতে দুই ধাপ সিঁড়ি এবং এরপর রাসূলের বসার স্থান তৈরি হয়। পরবর্তীতে একজন কাঠমিস্ত্রি ওই তিন ধাপের মিম্বরের  উপর আরো ছয় ধাপ সিঁড়ি নির্মাণ করেন। ফলে এটি নয় ধাপের মিম্বরে পরিণত হয়।
আব্বাসীয় খলিফাদের শাসনামলে এই মিম্বর কয়েকবার পুনর্নির্মাণ ও সম্পূর্ণ নতুনভাবে তৈরি হয়। ৬৫৪ হিজরিতে এক দুর্ঘটনায় মসজিদে নববীতে আগুন লেগে মিম্বরটি সম্পূর্ণ ভস্মীভূত হয়ে যায়। ঐতিহাসিক দলিলে পাওয়া যায়, ওই পোড়া মিম্বরটির ভস্মীভূত ছাই বর্তমানে যে স্থানে মিম্বর আছে তার ঠিক নীচে দাফন করা হয়েছিল। বর্তমানে মসজিদে নববীতে যে মিম্বরটি আছে সেটি মর্মর পাথরের তৈরি এবং এর উপরের কারুকার্যগুলি স্বর্ণ দিয়ে করা হয়েছে। ১২ ধাপ সিঁড়ির এই মিম্বরটি ৯৯৯ হিজরিতে তৎকালীন ওসমানীয় সুলতান এ মসজিদকে উপহার হিসেবে দিয়েছিলেন।

রাসূলুল্লাহ (সা.)’র জীবদ্দশায় মুসলমানরা মেহরাব নামক কোনো স্থানের সঙ্গে পরিচিত ছিলেন না। পরবর্তীতে ওমর ইবনে আব্দুল আজিজের শাসনামলে রাসূলুল্লাহ (সা.)’র সিজদা দেয়ার স্থানে একটি মেহরাব নির্মিত হয়। বর্তমানে মসজিদে নববীসহ বিশ্বের প্রায় প্রতিটি মসজিদের সামনের দিকে ঠিক মাঝখানে ইমাম সাহেবের নামাজে দাঁড়ানোর জন্য যে স্থান নির্ধারিত রয়েছে সেটিকে মেহরাব বলা হয়। মেহরাবের ফজিলত সম্পর্কে বলা হয়েছে, যে ব্যক্তি মসজিদে নামাজ আদায় করতে এসে মেহরাবের দিকে তাকান তিনি নিজের চোখে কাবা শরীফ দেখার সওয়াব লাভ করেন। মসজিদে নববীতে বর্তমানে মূল মেহরাবের পাশাপাশি আরো কয়েকটি ছোট মেহরাব রয়েছে। এগুলোর একটিকে ‘মেহরাবে তাহাজ্জুদ’ বলা হয়। হযরত ফাতিমা জাহরা সালামুল্লাহি আলাইহার ঘরের পেছনে এই মেহরাবটি অবস্থিত। রাসূলুল্লাহ (সা.) কোনো কোনো রাতে এখানে দাঁড়িয়ে নফল ইবাদতে মশগুল হতেন।
মসজিদে নববীর আরেকটি মেহরাবের নাম মেহরাবে ফাতেমা (সা. আ)। এটি তখনকার সময়ে হযরত ফাতেমা সালামুল্লাহি আলাইহার ঘরে মধ্যে ছিল এবং এখানে দাঁড়িয়ে তিনি নামাজ আদায় করতেন। বর্তমানে এই মেহরাবটি রাসূলুল্লাহ (সা.)’র হুজরার মধ্যে পড়েছে। এ মসজিদের আরেকটি মেহরাবের নাম মেহরাবে ওসমানি। ওসমানীয় সুলতানদের নামে এটির নামকরণ করা হয়েছে। অবশ্য কেউ কেউ বলেন, তৃতীয় খলিফা ওসমান ইবনে আফফানের নামে এই নামকরণ হয়েছিল। রাসূলের মেহরাবের পেছনে অবস্থিত এই মেহরাবটি কিবলার দিকে মুখ করা। বর্তমানে মসজিদে নববীর ইমাম সাহেব এই মিহরাবে দাঁড়িয়ে জামাতের ইমামতি করেন
মসজিদের এই বরকতপূর্ণ ফজিলতের কারণে ইসলামের সোনালী যুগে মুসলমানরা আল্লাহর ঘর নির্মাণে ব্যাপক মনোনিবেশ করেছিলেন। মহানবী (সা.)’র বাস্তবধর্মী দাওয়াতের বাণী তাদের ওপর প্রভাব ফেলেছিল বলে দিকে দিকে মসজিদ নির্মাণের সাড়া পড়ে গিয়েছিল। আল্লাহর রাসূল মক্কা থেকে মদীনায় হিজরতে করেই নিজের হাতে কুবা মসজিদ ও মসজিদে নববী নির্মাণ করেছিলেন। এরপর মদীনায় বিভিন্ন গোত্রের বসবাসের স্থানে আরো নয়টি মসজিদ নির্মিত হয়। বিশ্বনবী (সা.) নিজে গিয়ে এসব মসজিদের স্থান ও কিবলার দিক সঠিকভাবে নির্ধারণ করে দিতেন। মসজিদ নির্মাণ সম্পন্ন হওয়ার পর রাসূলুল্লাহ’র ইমামতিতে প্রথম জামাতটি অনুষ্ঠিত হতো।
রাসূলে খোদা (সা.) যেখানেই সফরে যেতেন সেখানেই নামাজ আদায় করার জন্য একটি স্থান নির্ধারণ করতেন। এভাবে তিনি মসজিদ নির্মাণের সংস্কৃতি ছড়িয়ে দেন। ধীরে ধীরে মুসলিম সমাজের পরিচিতির প্রধান মাধ্যম হয়ে ওঠে মসজিদ। অমুসলিমরা ইসলাম গ্রহণের পরপরই প্রথম যে কাজটি করতেন তা হলো নিজ নিজ এলাকায় মসজিদ নির্মাণ করা। মসজিদ নির্মাণের মাধ্যমে ইবাদত-বন্দেগী করার পাশাপাশি আরেকটি লক্ষ্য অর্জিত হতো। আর তা হলো, মুসলমানদের মধ্যে ঐক্য ও সংহতি বজায় রাখা। রাসূলুল্লাহ (সা.)’র যুগে একবার মুনাফিকরা মুসলমানদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি ও তাদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করার স্থান হিসেবে মসজিদ নির্মাণ করে। বিশ্বনবী এটি বুঝতে পেরে ভীষণ ক্ষুব্ধ হন। তিনি ওই মসজিদে নামাজ আদায় তো করেনইনি, উল্টো মসজিদটি আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেয়ার নির্দেশ দেন। পবিত্র কুরআনে এই মসজিদকে ‘মসজিদে যিরার’ বা ক্ষতি সাধানকারী মসজিদ নামে অভিহিত করা হয়েছে।
মহান আল্লাহ এই মসজিদ সম্পর্কে সূরা তওবার ১০৭ নম্বর আয়াতে বলেছেন: “আর যারা জিদের বশে এবং কুফরীর তাড়নায় মসজিদ নির্মাণ করেছে মুমিনদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির উদ্দেশ্যে এবং ঐ লোকের জন্য ঘাঁটি স্বরূপ যে পূর্ব থেকে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে আসছে, আর তারা অবশ্যই শপথ করবে যে, আমরা কেবল কল্যাণই চেয়েছি। পক্ষান্তরে আল্লাহ সাক্ষী যে, তারা সবাই মিথ্যুক।”  
রাসূলের যুগে কিছু মুনাফিক ইসলামের পোশাক পরে মুসলমানদের ক্ষতি করতে চেয়েছিল। তারা মসজিদকে ইসলামের বিরুদ্ধে ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করে মুসলিম সমাজকে ভেতর থেকেই ধ্বংস করে দিতে চেয়েছিল। কিন্তু এ সময় বিশ্বনবী (সা.)’র বিপ্লবী ও সাহসী সিদ্ধান্তের ফলে মসজিদে যিরার ধ্বংস করে সেখানে ময়লা আবর্জনা ফেলার স্থান নির্ধারিত হয়। এই ঘটনা থেকে বোঝা যায়, ইসলাম বিরোধী ষড়যন্ত্র ও শত্রুতার ঘাঁটি ধ্বংস করে ফেলতে হবে সেটিকে যদি বাহ্যিকভাবে পবিত্র স্থান বলেও মনে হয়।
আল্লাহর রাসূলের এই মসজিদের অনেকগুলো উস্তোয়ানা বা স্তম্ভ ১,৪০০ বছর পর আজও টিকে আছে কালের সাক্ষী হয়ে। এসব স্তম্ভের মধ্যে আটটি বেশি বিখ্যাত। বিশ্বনবীর জামানায়ই এগুলোর নামকরণ করা হয়েছিল। বর্তমানে এই আটটি স্তম্ভের ওপর সাদা রঙের প্রলেপ দিয়ে পরবর্তীতে নির্মিত পিলারগুলো থেকে এগুলোকে আলাদা করা হয়েছে।

মসজিদে নববীর এই ফজিলতপূর্ণ ও বিখ্যাত স্তম্ভগুলোর একটির নাম ‘উস্তোয়ানা তওবা’। আহযাবের যুদ্ধে আবুলুবাবা’র বিশ্বাসঘাতকতা ও তওবা করে তার ইসলামে প্রত্যাবর্তনের ইতিহাসকে কেন্দ্র করে এই পিলারটির নামকরণ করা হয়েছে।  পঞ্চম হিজরিতে আহযাবের যুদ্ধের পর আবুলাবাবা মুসলমানদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতার কারণে অনুতপ্ত হন। তার দেহমন পাপের অনুভূতিতে ছেয়ে যায়। এই পাপ থেকে মুক্তি পেতে বিশ্বনবী (সা.)’র কাছে গিয়ে ক্ষমা চাওয়ার পরিবর্তে তিনি সোজা মসজিদে নববীতে চলে যান। সেখানে গিয়ে একটি স্তম্ভের সঙ্গে নিজেকে বেঁধে ফেলে সবাইকে বলে দেন, আল্লাহর রাসূল ছাড়া কেউ যেন তার  গায়ে বাধা দড়িগুলো খুলে না দেয়। তখন থেকে এই স্তম্ভটির নাম হয় ‘উস্তোয়ানা তওবা’। বিভিন্ন বর্ণনায় এই স্তম্ভের পাশে দাঁড়িয়ে নামাজ আদায় করার অফুরন্ত ফজিলত বর্ণিত হয়েছে। বর্তমানে বিশ্বনবী (সা.)’র  হুজরা ও কবরের পাশের দ্বিতীয় স্তম্ভটিই হলো ‘উস্তোয়ানা তওবা’।
মসজিদে নববীর আরেকটি স্তম্ভের নাম ‘উস্তোয়ানা মুখাল্লাকা’। বিশ্বনবী যে স্থানে দাঁড়িয়ে নামাজ আদায় করতেন তার সবচেয়ে কাছের স্তম্ভ এটি। বর্তমানে এই স্তম্ভের শীর্ষে সোনালি রং দিয়ে গোলাকৃতিতে লেখা রয়েছে ‘উস্তোয়ানাতুল মুহাল্লাকা’। এই স্তম্ভের কাছে একটি সুগন্ধী পোড়ানো হতো যার ফলে গোটা মসজিদ আতরের ঘ্রাণে ভরে উঠত।
মসজিদে নববীর প্রধান স্তম্ভগুলোর ঠিক মাঝখানে রয়েছে ‘উস্তোয়ানা আয়েশা’। এটি মুহাজিরান বা আল-কুর’আ’ স্তম্ভ নামেও সমধিক পরিচিত। বর্তমানে এই স্তম্ভের উপরে লেখা রয়েছে ‘উস্তোয়ানাতুন আয়েশা’।
মসজিদে নববীর আরেকটি স্তম্ভের নাম ‘উস্তোয়ানা তাহাজ্জুদ’। বর্ণনায় এসেছে, সবাই যখন এশার নামাজ আদায় করে যার যার বাড়িতে চলে যেত তখন আল্লাহর রাসূল এই স্তম্ভের পাশে দাঁড়িয়ে তাহাজ্জুদ নামাজ আদায় করতেন। এ কারণে এটির নাম হয়েছে তাহাজ্জুদ স্তম্ভ। এই স্তম্ভটি নবী নন্দিনী হযরত ফাহেমা সালামুল্লাহি আলাইহার ঘরের ঠিক পেছনে অবস্থিত। এখানে মরমর পাথরে খোদাই করে আরবিতে যে কথাটি লেখা আছে তার অর্থ হলো- “এটি বিশ্বনবী (সা.)’র তাহাজ্জুদের স্থান।”
রাসূলের পবিত্র মাজার কক্ষের উত্তর অংশের সঙ্গে লাগোয়া অবস্থায় রয়েছে ‘উস্তোয়ানা মুরাব্বাআ’ল কাব্‌র’। এটিকে মাকামে জিবরাইলও বলা হয়। বর্তমানে এই স্তম্ভটি বাইরে থেকে দেখা যায় না। এই স্তম্ভের ঠিক পেছনেই হযরত আলী (আ.) ও ফাতেমা সালামুল্লাহি আলাইহার ঘরের প্রবেশ পথ ছিল। এই স্তম্ভের ফজিলত সম্পর্কে আবিল হামরা বলেছেন, আমি রাসূলে খোদাকে দেখেছি তিনি টানা ৪০ দিন ধরে প্রতিদিন আলী, ফাতেমা, হাসান ও হোসেইনের বাড়ির সামনে আসতেন এবং দরজার ওপর হাত রেখে বলতেন, “হে আহলে বাইত তোমাদের ওপর সালাম।” সেইসঙ্গে তিনি সূরা আহযাবের ৩৩ নম্বর আয়াত পাঠ করতেন যেখানে বলা হয়েছে, হে আহলে বাইত নিশ্চয় আল্লাহ চান তোমাদের থেকে অপবিত্রতা দূর করতে এবং তোমাদেরকে সম্পূর্ণরূপে পবিত্র করতে।
মসজিদে নববীর তওবা স্তম্ভের ঠিক পূর্ব পাশে কিবলামুখী যে স্তম্ভটি রয়েছে তার নাম ‘উস্তোয়ানা সারীর’। রাসূলুল্লাহ (সা.) পবিত্র মাহে রমজানের শেষ ১০ দিন মসজিদে নববীতে এতেকাফ করার সময় এই স্তম্ভের পাশে দাঁড়িয়ে নামাজ আদায় করতেন এবং ইবাদত করতে করতে ক্লান্তি আসলে এখানেই বিশ্রাম নিতেন।
উস্তোয়ানা সারীরের পাশেই রয়েছে ‘উস্তোয়ানা মাহ্‌রাস’। হযরত আলী (আ.) এই স্তম্ভের পাশে দাঁড়িয়ে বিশ্বনবী (সা.)কে পাহারা দিতেন।  এ কারণে এই স্তম্ভকে ‘উস্তোয়ানা আলী ইবনে আবি তালিব’ও বলা হয়।
মাহরাসের দক্ষিণ পাশে কিবলার দিক থেকে তৃতীয় অবস্থানে থাকা স্তম্ভটির নাম ‘উস্তোয়ানা ওফুদ’। মহানবী (সা.)’র দৈনন্দিন একটি কাজ ছিল মদীনার গোত্র প্রধানদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করা। তিনি এই স্তম্ভের পাশে বসে সেই সাক্ষাতের কাজটি সম্পন্ন করতেন। এটি পরবর্তীতে ‘উস্তোয়ানাতুল ওফুদ’ নামে পরিচিতি পায় যে নামটি আজও এই স্তম্ভের গায়ে লেখা রয়েছে।

Monday, 20 March 2017

বাগে ফদক ও খেলাফত সম্পর্কে ফাতেমা জাহরার (আঃ) বক্তব্য

0 Comments
হজরত ফাতেমা (সাঃ আঃ) বক্তব্যঃ
আবু বকরের (রাঃ) ও খেলাফতের দুর্বিষহ আচরণে জীবনের সকল ক্ষেত্র থেকে নিজেকে গুটিয়ে ফেলা হজরত ফাতেমা (সাঃ আঃ) অত্যন্ত রাগান্বিত হলেন। কয়েক জন নারীকে নিয়ে তিনি মসজিদে নববীতে আবু বকরের দরবারে উপস্থিত হলেন, যেখানে বহু আনসার ও মুহাজির উপস্থিত ছিলেন। তাঁর এবং উপস্থিতদের মধ্যে পর্দা টেনে দেবার পর হজরত ফাতেমা (সাঃ আঃ) এমন ব্যাথাতুর আর্তনাদ করলেন যে কেউ চোখের পানি ধরে রাখতে পারেনি। এরপর তিনি দরবারের সবার সামনে হৃদয়গ্রাহী এক বক্তব্য প্রদান করেন।

মহান আল্লাহ্‌ তালাহ যে অশেষ নেয়ামত দিয়েছেন তার জন্য সকল প্রশংসা একমাত্র তারই প্রাপ্য। এজন্য তার প্রতি আমাদের অফুরন্ত কৃতজ্ঞতা।
তিনি আমাদের যে অবিরাম দয়া ও অনুগ্রহ প্রদান করেছেন এবং অফুরন্ত করুণা আমাদের দান করেছেন তার জন্য আমরা প্রকাশ করি তার প্রতি আমাদের আনুগত্য। তিনি প্রদান করেছেন সকলকে অপরিসীম ও অপরিমিত ভাবে, অনাবিল ও অবারিত ধারায় যা গণনার অতীত, হিসাবের বাহিরে; যা অননুমেয় তুলনার ঊর্ধ্বে, সীমাহীন, চিরন্তন, অনন্ত স্থায়ী ও চির অম্লান। এসব নেয়ামতের ধরণ, প্রকৃতি, পরিমাণ ও সীমানা অনুধাবন করাও মানুষের পক্ষে অসম্ভব। এই সকল নেয়ামতের প্রাচুর্যতা ও অবিরাম ধারা বিরাজমান রাখার লক্ষে তিনি তার সকল প্রশংসা করা ও তার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের জন্য আমাদের আহব্বান জানিয়েছেন।
সকল প্রশংসা আল্লাহ্‌র যিনি আমাদের স্বীয় অন্তরে বিশ্বাস সৃষ্টির মাধ্যমে তার তাকে সাড়া দিয়ে উভয় জগতে সফলকাম হওয়ার সুজগ সৃষ্টি করে দিয়েছেন। আমি এই মর্মে সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ্‌ ছারা কোন কোন উপাস্য নেই, তিনি একক ও অদ্বিতীয়, তার সমতুল্য ও সমকক্ষ আর কেউ নেই। এই সাক্ষ্য আত্মসমর্পণের নির্দেশ বহন করে। এভাবে এই সাক্ষ্য প্রত্যেকের সামর্থ্য অনুযায়ী তাদের অন্তরকে পরিপূর্ণ ও চেতনাকে প্রস্ফুটিত করে।
আমাদের চোখে তিনি দৃশ্যমান নন। তার গুণাবলি বর্ণনা করার ভাষা আমাদের সাধ্যের অতীত। তার অস্তিত্ব ও প্রভাব সম্পর্কে কিছু অনুমান করতে আমরা অক্ষম। যখন কোন কিছুই বিদ্যমান ছিল না তখন তিনি এই বিশ্বজগৎ সৃষ্টি করেছেন। তিনি এই বিশ্বজগতকে অস্তিত্ব দিয়েছেন হয়তো শুধু সৃষ্টিরই কারনে অথবা শুধু অতীত ও ভবিষ্যতের বিদ্যমান উদাহরণ হিসাবে। তিনি জ্ঞান ও প্রজ্ঞার আলোকে এই অস্তিত্ব প্রদান করেছেন এবং আপন শক্তি ও ক্ষমতা বলে তিনি এগুলোকে আকৃতি প্রদান করেছেন।
কিন্তু এই সৃষ্টি সম্ভার না তার কোন প্রয়োজন ছিল আর না এগুলোর আকৃতি রুপ প্রদান তার কোন উপকারের জন্য ছিল। তিনি সীমাহীন ক্ষমতার বহিঃপ্রকাশ ঘতিয়েছেন এবং চেয়েছেন তার এই সৃষ্টি তার ইচ্ছার কাছে আত্মসমর্পণ করুক ও তার প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করুক। তিনি আরও চেয়েছেন তার অপরিসীম ক্ষমতা প্রতিষ্ঠিত হোক ও আমারা তার বাধ্য থাকি এবং তার ঐশ্বরিক লক্ষ অম্লান হোক।  
অতঃপর তিনি তার প্রতি আনুগ্যতের জন্য পুরুস্কার এবং তার আদেশ অমান্যকারীদের জন্য শাস্তির বিধান নির্দিষ্ট করেছেন যাতে এই বিশাল সৃষ্টি জগত তার ক্রোধ থেকে পরিত্রাণ পায় এবং তার সৃষ্টি জান্নাতে স্থান পায়।
আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মদ তার বান্দা ও রাসুল। তিনি তাঁকে এই পৃথিবীতে প্রেরণের পূর্বেই মনোনীত করে রেখেছিলেন। মহান আল্লাহ্‌ তাঁকে সৃষ্টির পূর্বেই তাঁর মর্যাদা ও নাম নির্ধারণ করে রেখেছিলেন। তিনি তাঁকে নবুয়াত প্রদানের পূর্বেই এই পদে অধিষ্ঠিত করে রেখেছিলেন। এ সবকিছুই ঘটেছে যখন সমস্ত সৃষ্টি জগত ছিল গুপ্ত ও অনস্তিতের অন্ধকারে লুক্কায়িত।
আল্লাহ্‌ ভবিষ্যৎ সম্পর্কে অবহিত। কেননা তিনি এর কারিগর ও স্রষ্টা। তাই, তিনি জানতেন এর পরিণতি আর ভবিষ্যৎ, এই বিশ্বজগতে দুঃখ-দুর্দশা এবং এর পরিবর্তিত অবস্থা। আল্লাহ্‌ তার ঐশ্বরিক পরিকল্পনা পরিপূর্ণ করার মানসে এবং তার ইচ্ছা ও নির্দেশ বাস্তবায়নের লক্ষে তার রাসুল কে প্রেরন করেছেন। রাসুল পৃথিবীতে এসে প্রত্যক্ষ করলেন যে, মানবতা বিভিন্ন অনৈতিক ও অসম ধারায় দ্বিধা-বিভক্ত। কেউ আগুনের পূজা করছে। যা সে নিজেই প্রজ্বলিত করেছে, অন্যেরা নিজেদের তৈরি মূর্তিকে পূজা করছে। তাদের অন্তর গুলো আল্লাহ্‌ ও সত্যকে সাক্ষ্য দিলেও কার্যত তা তারা অস্বীকার করছে।
আল্লাহ্‌ ইচ্ছা পোষণ করলেন যে, মুহাম্মদের মাধ্যমে তিনি অন্ধকার দূরীভূত করে (এসব অন্তর গুলোকে) আলোয় উদ্ভাসিত করবেন, তাদের মন থেকে কলুষতা ও অবিশ্বাস দূর করবেন এবং কুয়াশার পর্দা যা তাদের চোখ গুলোকে অন্ধ করে রেখেছে তা বিদুরিত করবেন।
রাসুলের (সাঃ) অতুলনীয় অধ্যবসায় ও অসিম বলিষ্ঠটায় মানব জাতিকে সত্যের পথে আহবান জানিয়ে তাদের হেদায়েতের কাজে আত্মনিয়োগ করেন। এবং তাদের পথভ্রষ্টটার হাত থেকে রক্ষা করেন, তাদের চোখের অন্ধত্ব দূর করেন এবং তাদের অটল ও অবিচল বিশ্বাসের প্রতি দিকনির্দেশনা প্রদান করেন।
অতঃপর আল্লাহ্‌ তাঁকে ফিরিয়ে নেয়ার ইচ্ছা করেন। স্রষ্টা হিসাবে তার ঐশ্বরিক ইচ্ছার আলোকে, তার অসীম ক্ষমাশীল ও সহৃদয়তার নিদর্শন হিসাবে এবং তার সীমাহীন ভালবাসার বহিঃপ্রকাশ হিসাবে তিনি তাঁকে ফিরিয়ে নেন। মুহাম্মদ এখন সকল প্রকার কষ্ট, লাঞ্ছনা ও উৎকণ্ঠা থেকে মুক্ত। তার আত্মা এখন পরম শান্তিতে স্বর্গসুখে অবস্থান করছে। আল্লাহ্‌ একান্ত আনুগত ফেরেস্তা দ্বারা পরিবেষ্টিত হয়ে তিনি এখন আল্লাহ্‌র প্রবিত্র সান্নিধ্যে কালযাপন করছেন।
আল্লাহ্‌ তায়ালার সর্বোৎকৃষ্ট রহমত ও দয়া আমার পিতার ওপর বর্ষিত হোক যিনি তার রাসুল, তার প্রত্যাদেশের ধারক ও তার সবচেয়ে প্রিয়তম সৃষ্টি। তার সৃষ্টিকুলের মধ্যে তিনিই সর্বাধিক পছন্দনীয় ও প্রশংসনীয়। অনন্তকালব্যাপী তার ওপর অবিরাম ধারায় আল্লাহ্‌র অশেষ নেয়ামত, রহমত ও বরকত বর্ষিত হোক।
হে আল্লাহ্‌র বান্দারা! রাসুলের (সাঃ) আদেশ, নির্দেশ ও নিষেধাজ্ঞা মেনে চলা তোমদের ওপর ওয়াজিব। তোমরা তাঁর ধর্ম ও দ্বীনের বাহক। আল্লাহ্‌ তোমাদের নিজ নিজ আত্মার প্রতিনিধিত্ব করার দায়িত্ব দিয়ে পাঠিয়েছেন এবং তার বাণী অন্যদের কাছে পৌঁছানো ও তোমাদের দায়িত্ব। তোমাদের ওপর আল্লাহ্‌ যে দায়িত্ব অর্পণ করেছেন তা পুরাপুরি যথার্থ। কারন পূর্বেই যে শর্তাবলি নির্ধারণ করা হয়েছে তার আলোকে তোমরা তার নির্দেশ পালনে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ও তার প্রতিনিধি হিসাবে তোমাদের সাথে রয়েছে রাসুল’র মাধ্যমে প্রেরিত মহান আল্লাহ্‌র প্রত্যাদেশ। অতএব আমাদের সাথে রয়েছে কুরআন-এ-নাতিক, কুরআন-এ-সাদিক, উজ্জল নূর এবং প্রাচুর্যপূর্ণ ও অত্যুৎকৃষ্ট দীপ্তিময়তা।
এই মহাগ্রন্থের দৃশ্যমান দিক অকাট্য ও স্পষ্ট এবং অন্তর্নিহিত চেতনা সহজবোধ্য। এর বাণীসমূহ দীপ্তিময়, সুস্পষ্ট ও অতি প্রাঞ্জল। এর অনুসারীদের জীবন সাফল্যের ক্ষেত্রে ইরস্নিয়, এরা মহা সম্মানিত। এই মহাগ্রন্থই আল্লাহ্‌র সন্তুষ্টি অর্জনের পথপ্রদর্শক। এই মহাগ্রন্থ তাদের জন্য মুক্তির নিশ্চয়তা দেয় যারা আন্তরিক ও গভীর প্রেমে এর আনুসরণ করে।
এই মহাগ্রন্থের যথার্থ অনুশীলনের মাধ্যমে আমরা যে শিক্ষা গ্রহণ করতে পারি তা হলঃ
-         এর অন্তর্নিহিত মর্মবাণী ও দিকনির্দেশনা;
-         এর মৌলিক বাণী ও ঐশ্বরিক নির্দেশনার বিষয়বস্তু;
-         যা কিছু আমাদের জন্য নিষেধ বা হারাম তা নিয়ন্ত্রনের বিধান;
-         আল্লাহ্‌র বিধান ও আহকামের সুস্পষ্ট বর্ণনা;
-         এর যৌক্তিকতার স্বপক্ষে পর্যাপ্ত উৎকর্ষ;
-         এর যথার্থতার প্রগাঢ়তা;
-         আমাদের জন্য যা কিছু বৈধ তার বর্ণনা;
-         মানবীয় শিষ্টাচারের সুনিপুণ ব্যাখ্যা;
অতএব আল্লাহ্‌ কুরআনের মাধ্যমে আমাদেরঃ
-         ঈমান প্রতিষ্ঠার নির্দেশ দিয়েছেন- বহু ঈশ্বরবাদ থেকে মুক্ত থাকার জন্য;
-         সালাত (দায়েমি ও ওয়াক্তিয়া) প্রতিষ্ঠার নির্দেশ দিয়েছেন – অহংকার ও ঔদ্ধত্য থেকে বিমুক্ত ও বিশোধিত থাকার জন্য;
-         দান – খয়রাতের নির্দেশ দিয়েছেন –নিজ অন্তরকে পরিশুদ্ধ করা এবং রিজিকের প্রসার ঘটানোর জন্য;
-         রোজা রাখার নির্দেশ দিয়েছেন –বিশ্বাসের ভিত দৃঢ় করার জন্য;
-         হজ পালনের নির্দেশ দিয়েছেন –দ্বীন কে নিরাপদ ও শক্তিশালী করার জন্য;
-         ন্যায়পরায়ণতার নির্দেশ দিয়েছেন –পরস্পরের মাঝে সংহতি বজায় রাখার জন্য;
-         আমাদের (আহালে বায়াত) মেনে চলার নির্দেশ দিয়েছেন –সুষ্ঠু শাসনকার্য পরিচালনা ও সংহতি সুদৃঢ় রাখার জন্য;
-         আমাদের (আহালে বায়াত) ধারাবাহিক নেতৃত্ব কে মেনে চলার নির্দেশ দিয়েছেন –তোমাদের ঐক্যমত অটুট রাখার ও অবিচ্ছন্নতার বিচ্যুতি প্রতিরোধের জন্য;
-         জিহাদ (রাসুল বা আহালে বায়াতের ইমামের আদেশে) করার নির্দেশ দিয়েছেন –ইসলামের মর্যাদা বৃদ্ধির জন্য;
-         ধৈর্যশীল ও সংযমী হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন –পরকালের পুরস্কার প্রাপ্তির জন্য;
-         সহানুভূতি, সহমর্মিতা ও সৎ কাজ করার নির্দেশ দিয়েছেন –জনগণের কল্যাণ নিশ্চিত ও নিরপেক্ষতাকে উৎসাহিত করার লক্ষে;
-         পিতামাতার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা ও তাদের অনুগত থাকার নির্দেশ দিয়েছেন –মহান আল্লাহ্‌র ক্রোধ থেকে নিজেকে বাঁচার জন্য;
এর পর ফাতেমা (সাঃ আঃ) বললেন, হে লোক সকল তোমরা অবগত আছ যে আমি ফাতিমা এবং আমার পিতা মুহাম্মদ। আমি যা বলি তাতে কখনো বৈপরীত্য খুঁজে পাবে না এবং আমার আমল ত্রুটিহীন। অবশ্যই তোমাদের মাঝ থেকেই তোমাদের জন্য একজন রাসুল এসেছেন। তাঁর ওপর অর্পিত প্রত্যাদেশ অত্যন্ত ভারী যা বহনে তোমরা অনেক কষ্টের সম্মুখীন হবে তোমাদের নিয়ে তিনি অত্যন্ত উদ্বিগ্ন এবং মুমিনদের প্রতি তিনি অত্যন্ত সদয় ও সহানুভূতিশীল; (তওবা-২৮)
তোমরা যদি শ্রদ্ধার সাথে তাঁর প্রতি দৃষ্টি নিবন্ধ করো এবং তাঁর মহিমান্বিত অবস্থান স্বীকার করো তাহলে তোমরা আনুধাবন করতে সক্ষম হবে যে তিনি শুধু আমারই পিতা, তোমাদের কোন নারীর নয় এবং আমার স্বামীর ভাই, তোমাদের কোন পুরুষের নয়। এর তাঁর সাথে এভাবে সম্পর্কিত হতে পারাটা কতই না সম্মানের!
তিনি মানব জাতির কাছে আল্লাহ্‌র বাণী পৌঁছিয়েছেন এবং আল্লাহ্‌র অসন্তুষ্টির ব্যাপারে সতর্ক করেছেন। তিনি বহু ঈশ্বরবাদের মতবাদকে ঘৃণার সাথে প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি মানব জাতি কে সত্যের পথে, মহান প্রভুর পথে আসার জন্য আহবান জানিয়েছেন, তাদের নিবিড় ভাবে পরামর্শ দিয়েছেন এবং যারপরনাই প্রাণান্তকর চেষ্টা করেছেন জেন তারা অন্ধকার ছেড়ে আলোর পথে ফিরে এসে। তিনি তাদের মূর্তি গুলো ধ্বংস করে দিয়েছেন এবং তাদের দর্প চূর্ণ করে দিয়েছেন। তিনি ততক্ষণ পর্যন্ত তাঁর সংগ্রাম অব্যাহত রেখেছেন যতক্ষণ পর্যন্ত না বাতিলের মিলিত শক্তি বিভক্ত হয় এবং তারা পরাজয় মেনে নিয়ে পৃষ্ঠপ্রদর্শন করতে বাধ্য হয়। অতঃপর অন্ধকারকে বিদীর্ণ করে আলো তার পথ করে নিল, যা সত্য কে তার আসল রুপে উন্মোচিত করল। সত্যের বাহকের দৃঢ় কণ্ঠ তখন হলো আরও দৃঢ় এবং তা ধীরে ধীরে স্তব্ধ করে দিল অবিশ্বাসীদের কুপ্ররোচনা ও সকল শয়তানি কর্মকাণ্ড।
এভাবেই অসৎ মতাদর্শের বিশ্বাসীরা ধ্বংস হয়ে গেল এবং আক্রোশ ও অবিশ্বাসের শেষ যোগসূত্রও বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল।  এরপর তোমরা কালেমা পাঠ করলে যা তোমরা তাদের কাছ থেকে যারা অর্ধ আহারে থাকলেও তাদের মুখমণ্ডল থাকত অজাগতিক এক আলোয় উতদ্ভাসিত।
সংকট পূর্ণ এই সন্ধিক্ষণে তোমরা ছিলে ভয়াবহ এক গহ্বরের প্রান্তসীমায়; (আল-ইমরান-১০৩)
তখন তোমরা ছিলে অসহায়, দুর্বল ও সংখ্যালঘুতোমরা ছিলে এক গ্রাস খাবারের সমতুল্য, যা মানুষের পক্ষে পানি দিয়ে গিলে খাওয়া অসম্ভব ছিল না। তোমরা ছিলে অঙ্গারের ন্যায়, যে কোন ব্যাক্তি তাকে নিমিষের মধ্যে নিশ্চিহ্ন করে ফেলতে পারত। তোমরা ছিলে তেমনই যা বিনা দ্বিধায় পদদলিত করা মোটেও কঠিন কাজ ছিল না। তোমরা এতটাই অপরিণত ও অমার্জিত ছিলে যে তোমরা ময়লা, দুর্গন্ধযুক্ত পানি পান করতে এবং প্রাণীর দেহ ও গাছের পাতা ছিল তোমাদের আহার্য। তোমরা ছিলে সবচেয়ে হীনাবস্থাসম্পন্ন এবং সবার কাছে প্রত্যাখ্যাত। তোমাদের নিয়ে এই ভয় ছিল যে, পাছে সবাই মিলে তোমাদের সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করে না ফেলে।
মহান আল্লাহ্‌ আমার পিতা মুহাম্মদের মাধ্যমে তোমাদের পরিত্রাণ দান করেছেন। অনেক প্রতিকূলতা পেরিয়ে, অনেক উত্থান-পতন, যন্ত্রণা ও তিক্ততার সম্মুখীন হয়ে এবং পশুসম ভাড়াটে বাহিনী, লোলুপ স্বভাবের নেকড়েতুল্য ও ভয়ঙ্কর হিংস্র প্রকৃতির বিদ্রোহীদের সাথে যুদ্ধ করে তিনি এই সফলতা লাভ করেছেন। বার বার তারা যুদ্ধের আগুন প্রজ্বলিত করেছে আর আল্লাহ্‌ তা নির্বাপিত করেছেন (মায়েদা; ৬৮)।
উঠের পিঠে আরোহণ করে দ্রুত বেগে যেয়ে তাদের গলা চেপে ধরার জন্য রাসুল তাঁর চাচাত ভাই কে নিয়োগ করলেন। আর আলী তাদের মস্তক গুলো পদদলিত না করা পর্যন্ত, আপন তরবারি দিয়ে তাদের অগ্নিশিখা গুলো নির্বাপিত না করা পর্যন্ত কখনও যুদ্ধ ক্ষেত্র থেকে ফেরত আসেনি। আল্লাহ্‌র মাহত্য সমুন্নত রাখার জন্য তিনি কঠোর পরিশ্রম করেছেন। তার ইচ্ছা ও নির্দেশ সমুন্নত রাখার জন্য সর্বদা সংগ্রাম করেছেন। তিনি ছিলেন রাসুলের সবচেয়ে প্রিয় আপনজনতিনি ছিলেন বিশ্বাসীদের নেতা। ন্যায়ের স্বপক্ষে তিনি ছিলেন সদা প্রস্তুত, পরামর্শের ক্ষেত্রে ছিলেন আন্তরিক, আল্লাহ্‌র ইচ্ছা পূরণের লক্ষে ছিলেন সদা সন্ধানী, আল্লাহ্‌র পথে ছিলেন সার্বক্ষণিক অক্লান্ত পরিশ্রমে লিপ্ত এবং অবিশ্বাসীদের অভিযোগ ও অন্যায় আচরণের মুখামুখি হওয়ার জন্য সদা প্রস্তুত।
অথচ, তোমরা উচ্ছৃঙ্খল ভোগ-বিলাসে কাল যাপন করেছ। সবার ধরা ছোঁয়ার বাহিরে থেকে জীবনের আরাম আয়েশ ও সুখ শান্তি উপভোগ করেছ এবং অপেক্ষা করেছ সেই সময়ের যখন দিন আমাদের বিরুদ্ধে ঘুরে দাঁড়াবে এবং সেই দুঃসংবাদ কবে তোমাদের কানে পৌঁছাবে। বিপদের দিনে তোমরা সবসময় দূরে সরে থেকেছ এবং যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালিয়ে গেছ।
যখন আল্লাহ্‌ তার নবীগনের ও প্রিয় বান্দাদের পবিত্র ভূমিতে তার রাসুলের আগমন ঘতালেন তখন বিদ্বেষ, শত্রুতা, ও কপটতা তোমাদের মাঝে মাথাচাড়া দিয়ে উঠল যা ধর্মের পবিত্রতাকে আঘাত করতে শুরু করল। যারা নীরবে অসন্তোষ বয়ে বেড়াচ্ছিল তারা মাথাচাড়া দিয়ে উঠল। অখ্যত কুখ্যত অনেকেই মুখ খুলতে শুরু করল। অবিশ্বাসীরা গাধার ডাকের ন্যায় একে অন্যের সঙ্গে কণ্ঠ মিলাতে শুরু করল এবং তোমাদের সঙ্গে মিলিত হল। শয়তান এই সঙ্গে মাথা তুলে দাঁড়াল এবং তোমাদের আহ্বান জানাল। সে তার ছলনার ও প্রতারণার ডাকে তোমাদের কাছ থেকে দ্রুত সাড়া পেয়ে গেল। সে তোমাদের পদক্ষেপ নেয়ার জন্য উদ্বুদ্ধ করতেও সক্ষম হল। এরপর তোমরা রোষের আগুন জ্বালাতে শুরু করলে এবং ক্রোধের দাবানলে আত্মহারা হয়ে পড়লে। তোমরা অন্যের প্রাণী, অন্যের জলাধার ইত্যাদি জোরপূর্বক ব্যাবহার ও জবরদখল করতে শুরু করলে। এসব যখন ঘতছিল তখনও রাসুলের ওফাতের ঘটনা একেবারেই সদ্য ঘটে যাওয়া একটি বিষয়, যার নিদারুণ ব্যাথা তখনও মানুষের হৃদয় থেকে মুছে যায়নি এবং গভীর ক্ষত এতটুকু প্রশমিত হয়নি। এমনকি রাসুল কে তখনও সমাধিস্থ করা হয় নি।
পাছে কোন সামাজিক অশান্তি সৃষ্টি হয় এই খোঁড়া যুক্তি দাঁর করিয়ে তোমরা তোমাদের এই কাজগুলো অত্যন্ত দৃঢ়তার সংগে সম্পন্ন করে চলেছিলে। কিন্তু এর চেয়ে জঘন্যতম যুক্তি এর কি হতে পারে? সাবধান! তারাই ফিতনাতে লিপ্ত আছে। নিশ্চয় জাহান্নাম কাফিরদের গ্রাস করবে; (তওবা; ৪৯)।
হায়! সত্য পথ থেকে তোমরা কতই না দূরে সরে গিয়েছ! তোমরা এ কোন অপ্রত্যাশিত পথে পা বাড়িয়েছ! পথভ্রষ্ট হয়ে তোমরা এ কোন পথে চলতে শুরু করেছ? মহান আল্লাহ্‌র পবিত্র কুরআন তোমাদের হাতেই রয়েছে। এর ঘোষণা সুস্পষ্ট, এর হুকুম পরিষ্কার, এর পথ নির্দেশনা অত্যুজ্বল, এর বিধি-নিষেধ বিশিষ্ট পূর্ণ এবং এর আদেশ স্পষ্টত প্রতীয়মান। তথাপি তোমরা এই ধর্মগ্রন্থ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছ। তোমরা এ থেকে বিমুখ হতে চলেছ? নাকি তোমরা কোন পৃথক কোন ধর্মগ্রন্থ দ্বারা পরিচালিত হতে চাইছ! হায়, আফসোস!
অত্যাচারীরা পবিত্র কুরআনের পরিবর্তে কতই না নিকৃষ্ট এর আদর্শকে অনুসরণ করতে চলেছে; (ক্বাহাফ;৫০)    
যদি কেউ ইসলামের পরিবর্তে অন্য কোন ধর্মের অনুসরণ করে তবে তা তার নিক্ত কখনই গ্রহণযোগ্য হবে না, পরকালে তারা শুধু ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে; (আল ইমরান- ৮৫)
তোমরা সামান্যতম সময়ের জন্যও অপেক্ষা করোনি এই উষ্ট্রি (খেলাফত) তো নির্দিষ্ট সময়ে আপন পথেই নিজের দায় মুক্ত করত এবং শান্ত হয়ে যেত এবং সর্বসম্মত পথেই চলতে শুরু করত। তারপর তোমরা ফিতনার আগুনে ঘৃতাহুতি দিয়েছ এবং এর জ্বলন্ত অঙ্গারে ইন্ধন জুগিয়ে অগ্নিশিখার বিস্তার ঘটিয়েছতোমরা প্রতারক ও প্রবঞ্চক শয়তানের ডাকে সাড়া দিয়েছ। কারন তোমরা মহান আল্লাহ্‌র পবিত্র ধর্মের দীপ্তিমান আলোকরশ্মি নিভিয়ে দিতে এবং তার নির্বাচিত সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ, তার রাসুলের রেখে যাওয়া নিদর্শন ও সুন্নাত সমূহ মুছে দিতে চেয়েছিলে। দুধের ফেনা সরানোর উসিলায় তোমরা এখন মাখন খেয়ে নিয়েছ। তোমরা গোপন চক্রান্ত ও ছলনার আশ্রয় নিয়ে রাসুলের আহালে বায়াতের ক্ষতি করার পরিকল্পনা প্রণয়ন করেছ। আমরা এসব কিছুই ধৈর্যের সাথে এমন ভাবে সহ্য করে নিয়েছি অথচ খঞ্জরের আঘাতে ছিন্ন বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছি এবং আমাদের অন্ত্রগুলো বর্শার ফলায় বিদ্ধ হয়ে পড়েছে। এখন তোমরা দাবি করছ যে, উত্তরাধিকারী থেকে আমরা বঞ্চিত। তারা কি সেইসব কুসংস্কারাচ্ছন্ন পৌত্তলিকদের অধীনেই শাসিত হতে চায়?
বিশ্বাসীদের জন্য আল্লাহ্‌র চেয়ে শ্রেষ্ঠ বিচারক আর কে হতে পারে; (মায়েদা-৫০)।
তোমরা কি এইসব বিষয়ে অবহিত নও? নিশ্চয় তোমরা জানো? উজ্জল সূর্যের মত এ কথা তোমাদের কাছে সুস্পষ্ট যে আমি হলাম পবিত্র রাসুলের কন্যা। ওহে মুসলমানেরা! উত্তরাধিকার সুত্রে প্রাপ্ত আমার পৈত্রিক সম্পত্তি কি এভাবেই বেদখল হয়ে যাবে?
হে আবু কুহাফার সন্তান (আবু বকর)! আল্লাহ্‌র কিতাবে কি এ কথা লিখা আছে যে তুমি তোমার পিতার উত্তরাধিকারী হতে পারবে আর আমি আমার পিতার ক্ষেত্রে তা হতে পারব না? কতই না নিকৃষ্ট সব পন্থা উদ্ভবন করা হয়েছে; (মারিয়াম-২৭)।
মহান আল্লাহ্‌ এই ধর্মগ্রন্থ কি তোমরা সজ্ঞানে পরিত্যাগ ও উপেক্ষা করছ? পবিত্র এই গ্রন্থেই বলা হয়েছে, “সুলাইমান ছিলেন দাউদের উত্তরাধিকারী”; (আল-নামাল-১৬)। এবং নবী জাকারিয়ার (আঃ) ঘটনা বর্ণনা করার সময় উল্লেখ করা হয়েছে, “তোমার মহিমা আমাকে প্রদান করো এমন একজন প্রতিনিধি যিনি হবেন আমার উত্তরাধিকারী এবং ইয়াকুবের বংশেরও উত্তরাধিকারী”; (মারিয়াম-৫)।
আরও বলা হয়েছে, “আল্লাহ্‌র বিধান অনুসারে রক্তের সম্পর্কযুক্ত আত্মীয় স্বজন অন্যান্যদের থেকে বেশি অগ্রাধিকার পাবে”; (আনাফাল-৭৫)।
সন্তানদের উত্তরাধিকার সম্পর্কে আল্লাহ্‌র নির্দেশ হিসাবে ঐ মহান গ্রন্থে আরও বলা হয়েছে যে, “দুই কন্যার অংশের সমপরিমাণ হবে এক পুত্রের অংশ” (নিসা-১১)।
যদি কেউ ধনসম্পত্তি রেখে মারা যায় তবে ন্যায়পরায়ণতার সাথে তা পিতা মাতা ও নিকট আত্মীয় স্বজনদের মধ্যে অসিয়তের মাধ্যমে দান করে যায়। এটা তাদের কর্তব্য, যারা ঐশ্বরিক বিধানের প্রতি পরিপূর্ণ সজাগ থাকে এবং এর ব্যত্যয় থেকে নিজেদের সুরক্ষিত রাখে; (বাকারা-১৮০)।
তোমরা দাবি করছ যে, আমি আমার পিতার উত্তরাধিকারী নই এবং এতে আমার কোন অংশ নেই। কুরআনে কি আল্লাহ্‌ এমন কোন আয়াত নাজিল করেছেন যার ফলে আমার পিতাকে পূর্বোক্ত বিধান থেকে রহিত করা হয়েছে? নাকি তোমরা বলতে চাও যে, আমরা (রাসুল ও আমি) পৃথক দুই আদর্শ বা বিশ্বাসের অনুসারী এর তাই আমরা একে অপরের উত্তরাধিকারের কোন হক রাখি না? আমি এবং পিতা কি একি গোত্র, বংশ ও আদর্শের মানুষ নই? নাকি তোমরা কুরআনের সাধারন ব্যখ্যা ও বিশেষ তাৎপর্য সম্পর্কে আমার পিতা এবং আমার চাচাতো ভাই আলীর চেয়ে বেশি জ্ঞান রাখ? তাই যদি ভেবে থাক, তবে ফাদক কিংবা খেলাফত কিংবা উভয়ই প্রস্তুত রয়েছে, নিয়ে যাও। তবে মনে রেখো, কিয়ামতের দিন তোমাদের অবশ্যই এর মুখামুখি হতে হবে। সেদিন কতই না উত্তম হবে, ঐ শেষ বিচারের দিন, যেদিন স্বয়ং আল্লাহ্‌ হবেন বিচারক, যিনি সর্বশ্রেষ্ঠ এবং রাসুল হবেন ফরিয়াদি।
সে দিন অবিশ্বাসী ও বিপথগামীরা ক্ষতিগ্রস্থ হবে, সেদিন তাদের অনুতাপ কোন উপকারেই আসবে না; (জাসিয়া-২৭)।
মহান আল্লাহ্‌ প্রতিটি দানের বিপরীতেই রয়েছে আমাদের জবাবদিহিতা ও তার পরিণতি। শীঘ্রই তোমরা জানতে পারবে, কারা সেই দুর্ভাগা অসহনীয় কলঙ্কময় যন্ত্রণা যাদের গ্রাস করবে এবং তারা আল্লাহ্‌র চিরন্তন শাস্তি ভোগ করবে; (হুদ-৩৯)।
হজরত ফাতেমা আনসারদের উদ্দেশে বললেন, হে বীরপুরুষ নেতারা, হে জাতীয় সেনারা, হে ইসলামের রক্ষকেরা, আমার ন্যায্য অধিকারের ব্যাপারে তোমাদের এরূপ অনীহা ও দোদুল্যমানতার কারন কি? এই অন্যায়ের প্রতি তোমাদের সমর্থনের কারন কি? আমার পিতা আল্লাহ্‌র রাসুল কি তোমাদের বলেনি যে, প্রতিটি মানুষকে তার সন্তানের অধিকার ভোগের মর্যাদা দিতে হবে? কত স্বল্প সময়ের ব্যবধানেই না তোমরা সব কিছু বদলে দিয়েছ, কত দ্রুতই না তোমরা পথভ্রষ্ট হয়ে পড়েছ এবং বিচ্যুতির সিকার হয়েছ! অথচ আমার অধিকার প্রতিষ্ঠা ও আমার দাবি আদায়ে যথাযথ শক্তি ও সামর্থ্য তোমাদের রয়েছে। নাকি তোমরা ভাবতে বসেছ যে, মোহাম্মদ ওফাতের সাথে সব কিছুর সমাপ্তি হয়েছে। তাঁর ওফাত নিঃসন্দেহে একটি মহাদুর্যোগসম ঘটনা, অসহনীয় এই কষ্ট-যন্ত্রণা, গভীর এই বিচ্ছিন্নতা। তাঁর অনুপস্থিতি আমাদের ঐকে ফাটল ধরিয়েছে, তাঁর বিয়োগ-ব্যথায় পৃথিবী হয়ে পড়েছে অন্ধকারাচ্ছন্ন, গ্রহ-নক্ষত্র হয়ে পড়েছে শোকাচ্ছন্ন, সূর্য-চন্দ্র হয়ে পড়েছে গ্রাসাচ্ছন্ন, পাহাড়-পর্বতের শির নুয়ে পড়েছে, সকল প্রত্যাশা আজ হতাশায় পরিণত হয়েছে। তাঁর গৃহের পবিত্রতাকে অমান্য করা হয়েছে। তাঁর মহা প্রণয়ের পর যার যার প্রাপ্য সম্মান, শ্রদ্ধা পদদলিত করা হয়েছে। আল্লাহ্‌ শপত! এটাই রাসুলের ওফাত মানুষের জন্য গভীরতম দুঃখের ঘটনা এবং ভয়াবহতম এক যন্ত্রণার কারন। আর কোন কষ্টই এতটা অসহনীয় বা এত বেশি দুর্ভাগ্যজনক নয়।
হে কিলাহ’র(আনসার) সন্তানেরা! তোমরা যারা আমাকে দেখতে ও শুনতে পাচ্ছ, আমার চার পাসে সমবেত হয়ে আছ, আমার আহ্বান  তোমাদের কানে প্রবেশ করছে, তথাপি কি উত্তরাধিকার সুত্রে প্রাপ্ত আমার পিতার সম্পত্তি জবরদখল হয়ে যাবে? এখানে কি ঘটেছে তা তোমরা ভাল করেই জানো। তোমাদের রয়েছে যথেষ্ট জনবল, শক্তি, সম্পদ ও উপায়। তোমাদের হাতে মজুদ রয়েছে যথেষ্ট অস্ত্র সম্ভার। বার বার আমি আহ্বান জানাচ্ছি কিন্তু তাতে তোমরা সাড়া দিচ্ছ না। সাহায্যের জন্য এই আকুল আবেদন জা তোমরা শুনতে পাচ্ছ কিন্তু আমাদের উদ্ধারে এগিয়ে আসছ না। তোমাদের বীরত্ব সুবেদিত এবং অন্যের কল্যাণে এগিয়ে আসাটাও প্রশংসনীয়। তোমরা সেই নির্দিষ্ট গ্রোত্র যাদের পূর্ব থেকেই মর্যাদা প্রদান করা হয়েছে। আহালে বায়াতের পাশে থাকার জন্য রাসুল তোমাদেরই নির্বাচিত করেছেন। তোমরা অবিশ্বাসী আরবদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছ এবং অপরিসীম দুঃখ কষ্ট সহ্য করেছ। তোমরা যুদ্ধবাজ গোত্রগুলোর বিরুদ্ধে অবিরাম লড়াই করেছ এবং সবচেয়ে অনমনীয় মুশরিকদেরও ছত্রভঙ্গ করেছ এবং তাদের পালিয়ে যেতে বাধ্য করেছ। তোমরা কখনও আমাদের অবাধ্য হওনি, আমাদের পাশে থেকে আমাদের নেতৃত্বে ইসলামের বিজয় নিশ্চিত করেছ। জনগণ এর সুফল পেতে শুরু করেছিল। অবিশ্বাসীদের খোঁড়া যুক্তি ধুলায় মিশে গিয়েছিল এবং অন্যায় ও অসত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত তাদের দম্ভের প্রচণ্ডতা নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছিল। ধর্মের প্রতি অবিশ্বাস ও বহু ঈশ্বরবাদ অগ্নিশিখা প্রশমিত হয়ে গিয়েছিল। বিদ্রোহের কণ্ঠস্বর স্তিমিত হয়ে গিয়েছিল ইসলামের বিধান পুরোপুরি প্রতিষ্ঠা হয়েছিল।
আজ তোমরা কেন দ্বিধান্বিত হয়ে পড়েছ? যে সত্য পরিপূর্ণ ভাবে প্রকাশিত হয়েছিল আজ কেন তাকে তোমরা গোপন করছ? এতদূর অগ্রসর হওয়ার পর আজ কেন তোমরা প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করার পথে পা বাড়িয়েছ। ঈমান আনার পর আবার কেন তোমরা শিরকের দিকে ধাবিত হচ্ছ? যারা প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেছিল, রাসুলকে বহিষ্কার সিদ্ধন্ত নিয়েছিল এবং তোমাদের বিরুদ্ধচারন করেছিল তোমরা কি আজ তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে না। কি হল আজ তোমাদের? তোমরা কি তাদের ভয় পাও!
সত্যিকারের মুমিনের জন্য আল্লাহ্‌ ছাড়া এর কাউকে ভয় পাওয়া সমীচীন হবে না; (আত-তাওবা-৩১)।
আজ আমি দেখতে পাচ্ছি যে তোমরা সত্যের পথ থেকে দূরে সরে গিয়েছ। ন্যায্য অধিকারের আলোকে নেতৃত্ব যার প্রাপ্য তোমরা তাঁকে দূরে ঠেলে দিয়েছ। তোমরা আরাম আয়েশ ও সহজলভ্যতার সাথে সমঝোতা ক্রেছাবন দুঃখ কষ্টময় জীবন থেকে পালিয়ে সুখ সম্ভোগের জীবন বেছে নিয়েছ। যে আদর্শ তোমরা লালন ও ধারন করেছিলে তা তোমরা নিজেদের চোখের আড়াল করে দিয়েছ এবং যে সত্য গ্রহণ করেছিলে তা পরিত্যাগ করেছ।
যদি তোমরা এবং বিশ্বের সকলেই অকৃতজ্ঞ হয়ে যাও, তবু আল্লাহ্‌ কারো মুখাপেক্ষী নন এবং তিনি সকল প্রশংসার অধিকারী; (ইব্রাহিম-৮)।
ভুলে যেওনা, আমার যা বলার ছিল তা আমি বলেছি। সবকিছু জেনে শুনেই তোমরা আমাদের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছ। কারন তোমাদের অন্তর গুল এখন ষড়যন্ত্র ও বিশ্বাসহীনতায় পরিপূর্ণ হয়ে গেছে। সত্যি হতাশা ও বেদনা আমাকে এতটাই দহন করছিল যে, নিরুপায় হয়েই আমাকে এসব বলতে হয়েছে, আর তাই তো, দুঃখ ব্যথায় পরিপূর্ণ আমার অন্তরের কষ্ট কিছুটা লাঘব হল। পরিস্থিতির কারনে আমি যে প্রচণ্ড রাগে জর্জরিত ছিলাম তা কিছু তা কম হল। কারন আমি তোমাদের সামনে আমার যুক্তি সংগত দাবি উত্থাপন করতে পেরেছি, অন্যায়ের মুখোস খুলে দিয়েছি এবং সত্য কে উন্মোচিত করেছি, যেন তোমরা কেউ কোনদিন কোন অজুহাত দাঁড় করাতে না পার। অতএব তোমরা যদি এমনই চাও তাহলে এই খেলাফত এবং আর যা কিছু চাও, তা নিয়ে যাও এবং তা আঁকড়ে ধরে থাক। তবে স্মরণ রেখো, তোমাদের জন্য এই খেলাফত বাহন যথার্থই যন্ত্রণাদায়ক প্রমাণিত হবে। কেননা অন্যায় ভাবে দখলের স্থায়িত্ব কখনোই শুভ হয় না। আর পা-দানিগুলো অমসৃণ, এর আসন গর্তে পরিপূর্ণ। আল্লাহ্‌র অনন্ত ক্রোধের চিহ্নাবলি এতে লিপিবদ্ধ করা আছে। অনাদি কলঙ্ক এর অবিচ্ছেদ্য অংশ। আল্লাহ্‌র ক্রোধাগ্নিতে এই প্রজ্বলিত হবে, যা হ্রদয় কে করে দিবে অশান্ত। তোমরা যা কিছুই করো না কেন, সবই আল্লাহ্‌র দৃষ্টির অন্তর্ভুক্ত। যারা মিথ্যার পথে চলছে তারা অতি সত্বরই জানতে পারবে যে কত ভয়াবহ পরিণাম তাদের জন্য অপেক্ষা করছে। আমি তাঁরই কন্যা যিনি তোমাদের এক ভয়াবহ শাস্তির ব্যাপারে সাবধান করে গেছেন।
সুতরাং তোমরা তোমাদের মত কর্মসম্পাদন করতে থাক, আমরা আমাদের মতো চলি। আর অপেক্ষা করো, আমরাও অপেক্ষায় থাকব; (সূরা হুদ-১২১-১২২)।
এরপর আবু বকর (রাঃ) জবাবে বললেন, হে রাসুল কন্যা! নিঃসন্দেহে আপনার পিতা বিশ্বাসীদের জন্য ছিলেন স্নেহশীল, দয়ালু, সান্তনা দাতা ও সহানুভূতিশীল এবং অবিশ্বাসীদের জন্য রয়েছে আল্লাহ্‌র ভয়াবহতম শাস্তি এবং কঠোরতম প্রতিদান। গোত্রীয় বিচারে তাঁকে আমরা আপনার পিতা হিসাবে পাই, অন্য কোন নারীর নয় এবং নিঃসন্দেহে তিনি ছিলেন আপনার স্বামীর ভাই, অন্য কোন সুহ্রদের নয়। রাসুল আলী কে তাঁর ঘনিষ্ঠ সহচর হিসাবে স্থান দিতেন। এবং আলী রাসুলের সকল সংঘাতময় পরিস্থিতিতে সর্বাধিক সমর্থন প্রদান করতেন। আপনাকে যারা ভালবাসতে সক্ষম হয়েছে তারা অবশ্যই আশীর্বাদ প্রাপ্ত ও সৌভাগ্যবান। আর যারা বিরোধিতা করেছে তারা নিঃসন্দেহে অভিশপ্ত ও ধ্বংসপ্রাপ্ত। কারন আপনি রাসুলের পরিবারভুক্ত, যারা সর্বাধিক পবিত্র ও সর্বশ্রেষ্ঠ মর্যাদা সম্পন্ন হিসাবে নির্ধারিত। মঙ্গল ও করুণা প্রাপ্তির ক্ষেত্রে আপনারা (আহালে বাইত) আমাদের জন্য অনুসরণ যোগ্য। আপনারা আমাদের জন্য জান্নাত প্রাপ্তির পুরোধা। আর আপনি, নিঃসন্দেহে নারীদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠা। আপনি সর্বশ্রেষ্ঠ ও সর্বশেষ রাসুলের কন্যা। আপনি যা বলেন তা ই সত্য। জ্ঞানের সর্ব শিখরে আপনার অবস্থান। আপনার অর্জিত অধিকার থেকে আপনাকে বঞ্চিত করার কোন ইচ্ছাই আমাদের নাই এবং আপনার বানীর সত্যতা ও আমরা অস্বীকার করতে চাই না। আল্লাহ্‌র শপথ! আমি আল্লাহ্‌র রাসুলের মত ধারার বিপক্ষে এতটুকু ও অগ্রসর হই নি এবং তাঁর অনুমোদনের বিপরীতে ও কিছু করিনি। নেতৃত্বে অবস্থানকারীরা কখনোই জনগণের সাথে মিথ্যাচার করতে পারে না। আমি মহান আল্লাহ্‌কে সাক্ষ্য মানছি এবং তিনি সাক্ষী হিসাবে যথেষ্ট।
আমি আল্লাহ্‌র রাসুল কে বলতে শুনেছি, আমরা যারা আল্লাহ্‌র রাসুল তারা বংশধরদের জন্য কোন সোনা রুপা রেখে যাই না, না কোন বসত বাটি বা জমি জমা রেখে যাই। আমরা রেখে যাই শুধু ধর্ম গ্রন্থ, এর জ্ঞান ভাণ্ডার, পাণ্ডিত্য আর নবুয়াত। জীবিকা নির্বাহের জন্য অথবা দৈনন্দিন জীবনের বাস্তবিক চাহিদা পূরণের জন্য আমাদের যা কিছু আছে তা শাসকের নিয়ন্ত্রণে থাকবে এবং তিনি প্রয়োজনের আলোকে সেগুলি ব্যবহার করবেন। আপনি যা দাবি করছেন তা আমরা যুদ্ধসামগ্রী ক্রয় করার জন্য সংরক্ষণ করেছি যেন মুসলিমরা আর সাহায্যে ভালভাবে যুদ্ধ করতে পারে, অবিশ্বাসীদের বিরুদ্ধে জিহাদে শরিক হতে পারে এবং যে সকল বিদ্রোহী মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে তাদের পুরোপুরি দমন করতে পারে। এটা আমার একার সিদ্ধন্ত নয়; সকল মুসলমানের সর্বসম্মতিক্রমে এই সিদ্ধন্ত নেয়া হয়েছে। আমি যে সিদ্ধান্ত নিয়েছি তাতে কোন বল বা শক্তি প্রয়োগ করা হয় নি। আর এই দেখুন, এগুলো আমার সম্পত্তি। এখানে যা কিছু রয়েছে সবই আমি আপনাকে দিয়ে দিলাম। আমি এগুলো আপনাদের কাছে কখনো ফেরত চাইব না। এগুলো কারো জন্য সংরক্ষণ করে রাখার দরকার নাই। আপনি আপনার পিতার গোত্রের প্রধান এবং সবচেয়ে অগ্রগণ্য। আপনার বংশধরদের জন্য আপনি বৃক্ষ স্বরূপ এবং শ্রদ্ধেয়জন। আপনি যা বলবেন তা অস্বীকার করার কিংবা নবীকন্যা হিসাবে আপনার সম্মান ও মর্যাদা ক্ষুণ্ণ করব এমন দুঃসাহস আমাদের নাই। আমার ব্যাক্তিগত মতামত যা-ই হোক না কেন, এক্ষেত্রে আপনার সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত বলে গণ্য হবে। কিন্তু আপনি কি প্রত্যাশা করেন যে, এই বিষয়ে আমি আপনার পিতার বক্তব্যের বিপক্ষে অবস্থান নেব?
এর পর ফাতিমা (রাঃ) বললেনঃ
সকল প্রশংসা একমাত্র আল্লাহ্‌র। আবু কুহাফা তোমার বক্তব্য কতই না অযৌক্তিক ও অস্বাভাবিক। আমার পিতা কখনোই পবিত্র কুরআনের সাথে অসঙ্গতিপূর্ণ কোন কিছু বলেননি বা করেননি। তিনি এর নির্দেশেরও কখনো কোন বিরোধিতা করেননি। বরং তিনি পূর্ণ আস্থার সাথে পরিপূর্ণ ভাবে একে অনুসরণ করেছেন এবং এর প্রতিটি পারা ও আয়াত অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছেন। আপনারা কি তবে বিশ্বাস ভঙ্গ করে মিথ্যা উদ্ভাবনের মাধ্যমে অন্যায় ভাবে তাঁকে দোষারোপ করার জন্য একত্র হয়েছেন? তাঁর ওফাতের পর আপনাদের এসব পদক্ষেপ তাঁর জীবদ্দশায় তাঁকে হত্যার চক্রান্তের সাথে সংগতি পূর্ণ মনে হচ্ছে। এখন এই গ্রন্থই আমাদের বিচারক যা সত্য মিথ্যার প্রভেদ সুস্পষ্ট ভাবে তুলে ধরেছে। এখানে {জাকারিয়া (আঃ)সম্পর্কে} বলা হয়েছেঃ
“আমার কাছ থেকে উত্তরাধিকার সুত্রে প্রাপ্ত হবে এবং ইয়াকুবের পরিবার থেকে”; (মারিয়াম-৬)।
আরও বলা হয়েছে,
“সুলায়মান প্রাপ্ত হয়েছিলেন দাউদ থেকে”; (আল-নামাল-১৬)।
আল্লাহ্‌ এভাবেই যার যার প্রাপ্য অংশের সুস্পষ্ট বর্ণনা দিয়েছেন। উত্তরাধিকারীর ক্ষেত্রে কি বিধান হবে তাও বলেছেন। পুরুষ ও নারীর ক্ষেত্রে বণ্টনের পরিমাণ কি হবে তাও বেলেছেন। এভাবেই আল্লাহ্‌ অবিশ্বাসীদের সকল খোঁড়া যুক্তি চূর্ণ করে দিয়েছেন। আগামী প্রজন্মের জন্য এভবেই সকল দ্বিধা দ্বন্ধ ও সন্দেহ দূর করেছেন। নিশ্চয় আপনার বিবেক আপনার সাথে প্রতারনা করছে এবং আপনাকে ভুল পথে পরিচালিত করছে। কিন্তু আমি অত্যন্ত সুচিন্তিত ভাবেই আমার অবস্থান গ্রহণ করেছি।
“তুমি যখন কোন সিদ্ধান্ত আরোপ করো তখন তুমি আল্লাহ্‌র সাহায্য প্রার্থনা করো”; (ইউসুফ-১৮)।
এরপর আবু বকর (রাঃ) বললেনঃ নিশ্চয় আল্লাহ্‌ সত্যের পথে রয়েছেন এবং তাঁর রাসুল ও রাসুলের কন্যাও সত্য কথা বলছেন। নিঃসন্দেহে আপনি জ্ঞান আলোকের সূতিকাগার নেতৃত্ব ও করুণার উৎসস্থল, বিশ্বাসের স্তম্ভ এবং আল্লাহ্‌র চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের প্রস্রবণ ধারা। আমি আপনার যুক্তি অস্বীকার করছি না বা আপনার বক্তব্য প্রত্যাখ্যান ও করছি না। কিন্তু এখানে আপনার ও আমার মাঝে উপস্থিত মুসলমানেরা রয়েছে, যারা আমাকে এই খেলাফতে অধিষ্ঠিত করেছে এবং যে মতামত আমি ব্যক্ত করেছি তা এদেরই সম্মতিক্রমে। কারন আমি নিজের মত বা ধারনা যে নির্ভুল তৎসম্বন্ধে অতিমাত্রায় অনড় স্বভাবের নই কিংবা স্বনির্ধারিত বা স্বেচ্ছাচারী কিংবা স্বার্থ সাধনে ব্যাস্ত এমন প্রকৃতির কোন ব্যক্তি নই। এর এগুলোই আমার স্বপক্ষের যুক্তি।
এরপর ফাতেমা (সাঃ আঃ) বললেনঃ
হে মুসলমানেরা! তোমরা মিথ্যার আশ্রয় গ্রহণ করেছ এবং অতিশয় ঘৃণ্য ও অনিষ্টকর এক কর্মযজ্ঞ দেখেও চোখ বন্ধ করে আছ। তোমরা কি পবিত্র কুরআনকে গভীর ভাবে পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ করো না? নাকি তোমাদের অন্তর গুলো মোহর অঙ্কিত হয়ে গেছে; (মুহাম্মদ-২৪)।
বস্তুত তোমাদের অন্তর গুলো অসৎ কর্মের আতিশয্যে ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে গেছে যা করতে তোমরা অভ্যস্থ; (মুতাফফিফিন-১৪)।
তোমাদের শ্রবণশক্তি ও দৃষ্টি শক্তি গুলো ফাঁদের জালে আটকে গেছে। তোমরা যে সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছ তা অত্যন্ত অনৈতিক ও অধার্মিকতা পূর্ণ। তোমরা চলেছ অসৎ পথে। পারস্পারিক সমঝোতার মাধ্যমে তোমরা বিদ্বেষকে বেছে নিয়েছ। আল্লাহ্‌র শপথ! বেশি ভারী হয়ে উঠবে তোমাদের জন্য এই বোঝা বহন করা এবং ধ্বংস হবে এর শেষ পরিণতি। একদিন সকল পর্দা উন্মোচিত হবে, পর্দার আড়ালে পুঞ্জিভূত সকল দুঃখ কষ্ট, যন্ত্রণা বেদনা, অন্যায় অত্যাচার পরিস্ফুটিত হয়ে পড়বে। সেদিন আল্লাহ্‌র পক্ষ থেকে এর এমন এক প্রতিদান তোমরা পাবে যা তোমরা ধারনাও করতে পারছ না।
যারা মিথ্যার ওপর অটল ছিল তারা সেদিন ধ্বংস প্রাপ্ত হবে; (মুমিন-৭৮)।
ক্ষমা প্রত্যখানঃ
আবু বকর(রাঃ) এবং উমর (রাঃ) আলীর (আঃ) সাহায্যে ফাতিমার (সাঃ আঃ) সঙ্গে সাক্ষাতের অনুরধ করলে ফাতিমা (সাঃ আঃ) অনুমতি দিলেন। তারা ফাতিমা (সাঃ আঃ) সামনে উপস্থিত হলে তিনি অন্য দিকে মুখ ঘুরিয়ে রাখলেন। তাদের কর্মের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করলে ফাতিমা (সাঃ আঃ) প্রশ্ন করলেন আমি তোমাদের রাসুল (সাঃ) এর কিছু কথা বলব, তোমরা কি তা গ্রহণ ও মান্য করবে?
“অবশ্যই” তারা জবাব দিলেন।
ফাতিমা (সাঃ আঃ) বললেন, আমি আল্লাহ্‌র কসম দিয়ে জিজ্ঞাসা করছি, তোমরা রাসুলকে (সাঃ) বলতে শুনেছ, ফাতিমার সন্তুষ্টি আমার সন্তুষ্টি আর ফাতিমার ক্রোধ আমার ক্রোধ। আবার, যে আমার কন্যা ফাতিমাকে ভালবাসে সে পক্ষান্তরে আমাকেই ভালবাসে, যে আমার কন্যা ফাতিমাকে সন্তুষ্ট করে, সে আমাকেই সন্তুষ্ট করে। তোমরা কি শোন নি?
হ্যাঁ, আমরা রাসুল (সাঃ) কে এমনটা বলতে শুনেছি। তারা নিশ্চিত করলেন।
ক্ষিপ্রতার সাথে ফাতিমা (সাঃ আঃ) আবু বকর (রাঃ) ও তার সাথিদের উদ্দেশ করে বললেন, আমি আল্লাহ্‌ ও তার ফেরেশতাদের সাক্ষী করে বলছি যে, তোমরা আমাকে অসন্তুষ্ট করেছ এবং আর কোনদিন সন্তুষ্ট করতে পারবে না। অবশ্যই আমি রাসুলের (সাঃ) সাথে মিলিত হয়ে তোমাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করব। তার পর আরও তীব্র ভাষায় ফাতিমা (সাঃ আঃ) তাদের উদ্দেশ করে বলেন, আল্লাহ্‌র কসম আমি প্রত্যেক নামাজে তোমাদের ওপর আল্লাহ্‌র লানাত প্রদান করব। ফলে আবু বকর (রাঃ) ও উমর (রাঃ) ফাতিমার (সাঃ আঃ) সন্তুষ্টি অর্জন না করেই ফিরে গেলেন।    
হজরত জয়নাব বিনতে আলী (রাঃ), আবু তালেব আত-তাব্রিজি। (পৃষ্ঠা ৭৩-৯৫) 

Monday, 19 October 2015

হারারা যুদ্ধ, 'ইয়াজিদ সেনারা মদীনায় ৩ দিন ধরে গণহত্যা ও গণ-ধর্ষণ'

1 Comment
১৩৭৩ চন্দ্র-বছর আগে কারবালার মহা-ট্র্যাজেডির দুই বছরেরও কম সময় পর ৬৩ হিজরির এই দিনে (২৮ জিলহজ) খোদাদ্রোহী ইয়াজিদের বাহিনী মদীনায় মসজিদে নববী ও রাসূল (সা.)’র রওজার অবমাননাসহ গণহত্যা এবং গণ-ধর্ষণের মত নানা মহাঅপরাধযজ্ঞে লিপ্ত হয়। ইয়াজিদের নর-পশু সেনারা পরে মক্কায়ও হামলা চালিয়ে পবিত্র কাবা ঘর ধ্বংস করেছিল।


নরপশু ইয়াজিদের নির্দেশে কুফায় নিযুক্ত তার গভর্নরের অনুগত সেনাদের হাতে বিশ্বনবী (সা.)’র প্রিয় দৌহিত্র হযরত ইমাম হুসাইন (আ.) ও তাঁর পরিবার-পরিজনসহ প্রায় ১০০ জন সঙ্গীর বেশিরভাগেরই কারবালায় শাহাদত বরণ করার  হৃদয়বিদারক এবং মহাবিয়োগান্তক ঘটনার খবর শুনে মদীনাবাসী ইয়াজিদের চরিত্র ও প্রকৃতি সম্পর্কে তদন্ত চালায়। তারা এ লক্ষ্যে দামেস্কে একটি তদন্ত-টিম পাঠায়।  তদন্ত-টিম তাকে ইসলামী মূল্যবোধ-শূন্য  ও একজন নৈতিক চরিত্রহীন ব্যক্তিত্ব হিসেবে দেখতে পায়। ইমাম হুসাইন (আ.) এবং তাঁর মহান বিপ্লব ও তাঁর সঙ্গী-সাথীদের সহযোগিতা করতে না পারার জন্য মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে গণ-অনুশোচনা ক্রমেই জোরদার হতে থাকে।
এ অবস্থায় মদীনাবাসী তাদের শহর থেকে ইয়াজিদের নিযুক্ত গভর্নরকে বের করে দেয় এবং ইয়াজিদের অনৈসলামী শাসনকে বৈধ শাসন হিসেবে মেনে নিতে অস্বীকার করে। ফলে মহাপাপিষ্ঠ ইয়াজিদ সিরিয়া থেকে  কুখ্যাত মুসলিম বিন উকবার নেতৃত্বে ১০ হাজার সেনা পাঠায়। হাজ্জাজ ইবনে ইউসুফও ছিল এই সেনাবাহিনীর এক সাধারণ সেনা। (হাজ্জাজ পরবর্তীকালে উমাইয়া শাসক হয়েছিল এবং হাজার হাজার সাহাবীকে হত্যা করেছিল।)

উকবা মদীনার উত্তর-পূর্ব দিকে হাররা অঞ্চলে মদীনার প্রতিরোধকামীদের ওপর হামলা চালায়। অস্ত্রে সুসজ্জিত উমাইয়ারা বিপুল সংখ্যক মুজাহিদকে হত্যার পর শহরের ভেতরেও প্রতিরোধকামীদের ওপর নৃশংস হামলা চালিয়ে তাদের শহীদ করে। এমনকি যারা বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ(সা.)’র পবিত্র মসজিদে ও তাঁর পবিত্র মাজার বা রওজায় আশ্রয় নিয়েছিল তাদেরকেও নির্মমভাবে শহীদ করেছিল ইয়াজিদের পাষণ্ড সেনারা। বিশ্বনবী (সা.)’র বহু সাহাবীসহ ৭০০ জন গণ্যমান্য ব্যক্তিত্ব শহীদ হয় তাদের হামলায়। ইয়াজিদের সেনারা মদীনায় অন্তত ১০ হাজার মানুষকে ঠাণ্ডা মাথায় হত্যা করে। এরপর উকবার নির্দেশে তার নেতৃত্বাধীন ইয়াজিদের সেনারা তিন দিন ধরে মদীনা লুট-তরাজ করে এবং নারীদের সম্ভ্রমহানি করে। তারা মদিনার মসজিদে নববীকে ঘোড়ার আস্তাবল বানায় এবং ঘোড়ার মলমূত্রে অবমাননা করা হয় মুসলিম বিশ্বের পবিত্রতম এই স্থানের।এরপর এই  অভিশপ্ত সেনাদল মক্কার দিকে যায় এবং এমনকি পবিত্র কাবা ঘরেও হামলা চালিয়ে তা ধ্বংস করেছিল।

মদীনায় নারীদের ওপর ইয়াজিদ-সেনাদের গণ-ধর্ষণ বা পালাক্রমিক ধর্ষণের পরিণতিতে এক হাজারেরও বেশি অবৈধ সন্তান জন্ম নিয়েছিল এবং তাদের বাবা কে ছিল তা সনাক্ত করার কোনো উপায় ছিল না। ইতিহাসে এদেরকে ‘হাররা বিদ্রোহের সন্তান’বলে উল্লেখ করা হত। হাররার যুদ্ধ বা হাররার গণহত্যা নামে পরিচিত এই ঘটনা বহু বছর ধরে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মের মধ্যে স্মরণ করা হয়েছে।

অনেকেই বলেন এইসব অবৈধ সন্তান ও তাদের পিতামাতাদের অজুহাত দেখিয়েই বিতর্কিত ওয়াহাবী মতবাদের নানা ধারণার পক্ষে, বিশেষ করে কবর-জিয়ারত এবং মৃতের জন্য দোয়া ও কুরআনের সুরা পড়া নিষিদ্ধের যুক্তি দেখানো হয় ।
উল্লেখ্য, ইয়াজিদ মক্কা ও কাবা ঘরে হামলার ঘটনার পর পরই মারা যায়।
অনেকের মনেই এ প্রশ্ন জাগে যে ৬৩ হিজরির মধ্যেই মুসলমানদের এত দুর্দশা কেন ঘটেছিল? মুসলমানদের মধ্যে কি মুনাফিকদের প্রাধান্য বৃদ্ধি পেয়েছিল?
বলা হয়ে থাকে, কারবালায় ইমাম হুসাইন (আ.) ও তার মহান সঙ্গীরা যখন শাহাদত বরণ করেন তখন ইয়াজিদ খুশি হয়ে একটি কবিতা আবৃত্তি করেছিল যেখানে সে স্পষ্টভাবে এটা উল্লেখ করে যে " হুসাইনকে হত্যার মাধ্যমে আমরা উমাইয়ারা মুহাম্মাদকেই হত্যা করেছি এবং বদর, উহদ ও খন্দকের প্রতিশোধ নিয়েছি।" আসলে বনি উমাইয়াদের অনেকেই কেবল মুখে মুখে ইসলাম গ্রহণ করেছিল। বিভিন্ন জিহাদে, বিশেষ করে বদর, উহুদ ও খন্দকে আমিরুল মুমিনিন হযরত আলী (আ.)'র হাতে ততকালীন কাফিরদের বড় বড় ব্যক্তিত্বরা নিহত হওয়ায় এবং তাদের অনেকেই বনি উমাইয়া গোত্রের লোক ছিল বলে সেই বংশীয় বা গোত্রীয় ক্ষোভ তাদের মধ্যে সুপ্ত ছিল। উমাইয়াদের অনেকেই বা বেশিরভাগই মক্কা বিজয়ের পর শক্তিহীন হয়ে পড়ায় প্রভাব-প্রতিপত্তি নিয়ে টিকে থাকার আশায় অনিচ্ছা সত্ত্বেও ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিল। তাদের জন্য এ ছাড়া অন্য কোনো উপায়ও ছিল না। আবু সুফিয়ানসহ অনেক উমাইয়া ব্যক্তিত্ব ইসলামের সঙ্গে শত্রুতায় সবচেয়ে অগ্রণী ছিল। তাই তারা ভেতর থেকেই ইসলামের ওপর আঘাত হানার দীর্ঘ মেয়াদী ষড়যন্ত্র করে যাতে এক সময় মুসলিম বিশ্বের নেতৃত্ব তাদের হাতেই চলে আসে।

ইসলামী বর্ণনায় এসেছেকোনো এক সময় মহানবী (সা.) স্বপ্নে দেখেন যে, বনী উমাইয়্যা তাঁর মিম্বরে বানরের মত নাচানাচি করছে। এ স্বপ্ন দেখে তিনি এমনই শোকাহত হলেন যে, এরপর যতদিন বেঁচে ছিলেন তিনি আর হাসেননি। তাঁর এই স্বপ্ন দেখার পর পবিত্র কুরআনের সুরা বনি ইসরাইলের ৬০ নম্বর আয়াত নাজেল হয়েছিল। ওই আয়াতে বলা হয়েছে:

 “এবং (স্মরণ কর) যখন আমরা তোমাকে বলেছিলাম যে, নিশ্চয় তোমার প্রতিপালক মানুষকে পরিবেষ্টন করে আছেন এবং আমরা তোমাকে যে স্বপ্ন দেখিয়েছিলাম  তা কেবল মানুষের জন্য পরীক্ষার মাধ্যম ছিল এবং কুরআনে বর্ণিত অভিশপ্ত বৃক্ষটিও। আমরা মানুষকে ভীতি প্রদর্শন করতে থাকি, কিন্তু তা তাদের চরম ঔদ্ধত্যকেই কেবল বৃদ্ধি করে।”  তাফসিরে তাবারিসহ কয়েকটি সুন্নি সূত্রমতে, কুরআনে উল্লিখিত ওই “অভিশপ্ত বৃক্ষ”বলতে আবু সুফিয়ানের বংশধর তথা উমাইয়াদের বোঝানো হয়েছে এবং রাসূল (সা.) স্বপ্নে তাঁর মিম্বরে বানরদের নাচানাচির যে ঘটনাটি দেখেছিলেন তার অর্থ উমাইয়াদের মাধ্যমে খেলাফত দখল করা হবে।

 
back to top