Showing posts with label মওলা আলী (আঃ). Show all posts
Showing posts with label মওলা আলী (আঃ). Show all posts

Wednesday, 6 December 2017

শাস্ত্র থেকে সত্য বড়!

0 Comments
১.আমাদের কাছে ঠাহর হচ্ছে আমরা কেবলই বই পড়ে সত্য অনুসন্ধানকারী। বইয়ের পুঁথিগত বিদ্যা, জ্ঞান, তত্ত্ব ও তথ্য অনুসন্ধানকারী। আমরা যদি সে-পুঁথিগত বিদ্যাবুদ্ধি- তত্ত্বকে আমাদের জীবনে, কর্মে কাজে বাস্তবায়ন বা রূপায়িত না করি এবং বাস্তব জীবনে প্রয়োগ ও অনুশীলনের মধ্যদিয়ে না যায় তাহলে পুঁথিগতবিদ্যার সত্যায়ন (সত্যমিথ্যার যাচাই) হয় না। কারণ শাস্ত্র থেকে সত্য বড়!
এজন্য সত্যদ্রষ্টা পুরুষোত্তম নজরুল বলেছেনঃ
★ ওরে মূর্খ ওরে জড়, শাস্ত্র চেয়ে সত্য বড়ো, (তোরা) চিনলিনে তা চিনির বলদ, সার হল তাই শাস্ত্র বওয়া॥
★ "তোমাতে রয়েছে সকল কেতাব সকল কালের জ্ঞান, সকল শাস্ত্র খুঁজে পাবে সখা খুলে দেখ নিজ প্রাণ!"
তিনি আক্ষেপের সুরে বলেছেনঃ ★ "পেটে পিঠে কাঁধে মগজে যা-খুশি পুঁথি ও কেতাব বও, কোরান-পুরাণ-বেদ-বেদান্ত-বাইবেল-ত্রিপিটক- জেন্দাবেস্তা-গ্রন্থসাহেব প’ড়ে যাও, যত সখ- কিন্তু, কেন এ পন্ডশ্রম, মগজে হানিছ শূল?"
আমাদের সমাজের ভিন্ন মতের প্রতি শ্রদ্ধা নাই কেবল অবজ্ঞা, অবহেলা। পরমত সহিষ্ণুতা নেই বললেই চলে। ক্ষয়িষ্ণুতা দেখা যায় ভিন্ন মত ও পথের ব্যক্তির উপর। মতের ভিন্নতা দূষণীয় নয়। ধর্ম/মত/পথ যখন অন্যের উপর চড়াও হয় তখনই সমস্যা।
ধর্ম কী একটা ইন্দ্রিয়দ্বার? যে- তার অনুভূতি থাকবে, অনুভূতিতে আঘাত লাগবে! কেউ বলে মানুষের পঞ্চ ইন্দ্রিয়, কেউ বলে ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়, আবার কেউ বলে সপ্ত ইন্দ্রিয়। যথা: চোখ, কান, নাক, কণ্ঠ, জিহ্বা, ত্বক এবং মন দিয়ে যথাক্রমে দৃশ্য, শব্দ, গন্ধ, কথা (বা ভাব), স্বাদ, স্পর্শ এবং অনুভূতি উদয়-বিলয় হয়। অন্যদিকে যার যার কর্ম তার তার ধর্ম। ধর্মকর্ম এক-, একাকার। ধর্ম থেকে কর্ম আলাদা বা স্বতন্ত্র কিছু নয়। কারণঃ ধর্ম অর্থ স্বভাব, বৈশিষ্ট্য, ব্যবহার, আচার আচরণ, চাল-চলন, গতিপ্রকৃতি। তাইতো ড. মোতাহের হোসেন চৌধুরী বলেছেনঃ
ধর্ম সাধারণ লোকের কালচার, কালচার শিক্ষিত লোকের ধর্ম।
সমাজের সর্বাধিক মানুষ যাকে ধর্ম বলে। ঐগুলি ধর্মের বাহিরের অংশ, আনুষ্ঠানিকতা, প্রাতিষ্ঠানিককরণ, শাস্ত্রকথা বা শাস্ত্রীয়করণ, বিধানসমূহ, প্রথামত, স্থূলতা, মতাবলম্বী। যেমনঃ সনাতন/খ্রিষ্টান/বৌদ্ধ/ইসলাম প্রভৃতি ধর্মাবলম্বী বা মতাবলম্বী। ধর্ম ব্যক্তিগত চর্চার বিষয়, ইহা মনের ব্যাপার ও মানসিক বিষয়, আসলে ধর্ম যখন ব্যক্তিগত পর্যায় থেকে প্রাতিষ্ঠানিককরণ, সামাজিকরণ, আনুষ্ঠানিককরণ, শাস্ত্রীয়করণ করা হয় তখনই ধর্মীয় গোলযোগ, অনাচার, অবিচার, অপরাধ প্রবণতা শুরু হয়! কারণ এ-কাজগুলি ঘটে সাধারণত সমাজের অজ্ঞানী, অযোগ্য, ক্ষমতালোভী, অসুর-ইতর প্রকৃতি, বাটপার, ধর্মান্ধ, স্বার্থপর, বস্তুবাদী -ভোগবাদী, মালিকশ্রেণী মানুষের দ্বারা।
মূর্খ উগ্র গোয়ার নিষ্ঠুর ও ইতর প্রকৃতির ধর্মান্ধ, কাণ্ডজ্ঞানহীন মানুষের কর্মকাণ্ডকে কেউ যদি ধর্মানুভূতি বলে চালিয়ে দেয় এর চেয়ে ইতরামি, ধূর্তামি, মোটা শয়তানি বলে আর কিছু নেই।
সুতরাং ধর্মের কোন অনুভূতি নেই, ধর্ম নিরপেক্ষ। অনুভূতি থাকে মানুষের। ধর্মানুভূতি বলেও কিছু নেই!?
মরমী মহাত্মা মাওলা সুফি সদর উদ্দিন আহমদ চিশতী সাহেবে'র মতের উপর অতীতে অনেক সামাজিক অবিচার- অনাচার করা হয়েছে এখনো সাম্প্রতিককালেও করা হচ্ছে নানা প্রকারে, নানা ভাবে। আমরা তাঁর মতের বিরোধিতা করতে পারি তার মানে এ- নয় ব্যক্তিগত আক্রমণ করা, ব্যক্তিবিদ্বেষী হওয়া। ব্যক্তির বিরুদ্ধে আমাদের কোন অভিযোগ থাকার কথা না; কিন্তু নীতির বিরোধিতা, সমালোচনা করা যেতে পারে।
সুফি সদর উদ্দিন আহমদ চিশতী তাঁর মতাদর্শের জন্য তাকে জেলে যেতে হয়েছে, উগ্রবাদী ধর্মান্ধ সমাজ তার বাড়ীঘর, আস্তানা, লাইব্রেরি জ্বালিয়ে পুড়িয়ে দিয়েছিল। সরকার বইগুলি বাজেয়াপ্ত, নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছিল। তার পরিবারকে সমাজে অবাঞ্ছিত- লাঞ্ছিত করা হয়েছিল। মসজিদে মসজিদে তার বিরুদ্ধে কুৎসা অপপ্রচার করা হয়েছিল। এমনকি ঢাকা শহরে তাঁর ফাঁসির দাবীতে পোষ্টার দিয়ে ছেয়ে গিয়েছিলো। এখনো তাঁদের উপর চলছে সামাজিক নির্যাতন, অন্যায়- অবিচার।
উনি পরমত সহিষ্ণুতার মানুষ ছিলেন। অন্যকে, অন্যের মতকে শ্রদ্ধা করতেন। যেমন: একদিন তার এক ভক্ত, নিজের সন্তানকে নিয়ে এসেছেন নাস্তিক বলে। সুফি সাহেব তার ভক্তকে বললেন থাক না উনাকে উনার মত থাকতে দিন।
১৯৯২ সালে ৩০ডিসেম্বরে 'জামাত-বিএনপি' সরকারের মদদে 'ওহাবি-এজিদপন্থি, মৌলবাদী জঙ্গিশক্তি'র (যাদের অপর নাম লাহাব/লাহাবী অর্থাৎ অগ্নিশিখা বা মোহাগ্নি শিখা জন্মদাতা) দ্বারা অগ্নিসংযোগের পর অগ্নিধ্বসে আজো রয়ে গেছে মাওলা সুফি সদর উদ্দিন আহমদ চিশতী পোড়ানো বাড়িটি, সেই বাড়িটি সুফি সাহেব ও তাঁর স্ত্রী গওহর আরা বেগম এ-দু'জনের পেনসনের টাকায় গড়া। সেই স্মৃতি কথা বলতে গিয়ে একদিন আক্ষেপ করে গওহর আরা বেগম বলেছিলেন: যারা আমাদের গৃহহারা করলো, তারা ঠিকই একদিন গৃহহীন হবে। আশ্চর্য হলে সত্য, বাস্তবে ক্ষেত্রবিশেষে অনেকের ক্ষেত্রে তাই ঘটেছিল ......! প্রকৃতির কি মধুর প্রতিশোধ! এইতো সেদিনের কথা, হাসিনা সরকারের আমলে স্বয়ং বিরোধী দলের নেত্রী বেগম খালেদাকে যখন তার ব্যবহৃত বাড়ি থেকে তাকে উচ্ছেদ করেছিল তখন গৃহহারা বেগম খালেদার অশ্রুসিক্ত, কান্নায় ভেঙ্গে পড়ার সেই দৃশ্য দেখে তাঁ'র সেই কথাগুলো স্মৃতির মধ্যে জেগে উঠেছিল!!
শুনেছি যারা কোরআন তফসীর আর কোরআন দর্শনের মধ্যে পার্থক্য বুঝতে পারে না...তাদের উদ্দেশ্য করে সুফি সাহেব বলেছিলেনঃ "মোল্লারা বাংলা পড়িতে পারে কিন্তু ইংরেজী পড়িতে পারে না। যদি তফসীরের দর্শনগুলি ইংরেজীতে অনুবাদ করিয়া দিতাম, তাহা হইলে শিক্ষিত সমাজের কাছে সুগৃহীত হইতো। গাধাগুলি চেচাঁমেচি করিয়া সকলের মাথাগুলি খারাপ করিয়া ফেলিতে পারিতো না। আফসোস! সর্বসাধারণের সুবিধার কথা চিন্তা করিয়া বাংলায় রুপান্তর করিলাম। অথচ, তাহা হিতে বিপরীত হইলো।"
সুফি সাহেবের এক গুণমুগ্ধ ভক্ত তাকে উদ্দেশ্যে লেখেছেনঃ
হে আলোকিত প্রশংসিত সত্তা, তুলে ধরেছ মোহাম্মদীর ঝাণ্ডা। হাজার বছরের লুকায়িত অবগুণ্ঠিত মোহাম্মদের স্বরূপ প্রকাশে গেছে তোমার দেহকাল। উড়িয়েছ দ্বীনে মোহাম্মদীর বিজয়কেতন।
সহস্রবছরের (দ্বীনের মোহাম্মদীর উপর) চাপিয়ে দেওয়া পাহাড়সম মিথ্যাপ্রবাহকে ভেঙ্গে করেছ চুরমার। (ভেঙ্গে গুড়িয়ে, মিশিয়ে দিয়েছ সমতলে)
তোমার উপর নেমে এসেছিল বস্তুবাদী_ভোগবাদীর নিমর্ম আঘাত, অগ্নিসংযোগ, জেলজুলুম, দমননিপীড়ন, অত্যাচার। তোমার প্রকাশিত মোহাম্মদী দর্শনকে বাজেয়াপ্ত, নিষিদ্ধ করেও আটকিয়ে রাখতে পারেনি- তোমাকে, দাবিয়ে রাখতে পারেনি তোমার আনীত দর্শনকে..... (যা' জগতের ইতিহাসে বিরল!)
কোলাহলপ্রিয় নিন্দুকের দল, দলবেঁধে করে তোমার নিন্দাপাঠ, যারা বস্তুবাদী- ধর্মান্ধ, ধর্মমাতাল- ভোগের নেশায় মত্ত, অবৈধ খেলাফত ও খলিফাপ্রিয়, যারা ধর্মব্যবসায়ী, ক্ষমতালোভী- গদিনাসীন, অজ্ঞানী, ফেতনাফ্যাসাদসৃষ্টিকারী।
*২
মানুষকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য -অবজ্ঞা করে, উপেক্ষা করে বা বাদ দিয়ে এমনকি ঘৃণা করে যারা ব্যাবসাবাণিজ্য, রাজনীতি, ধর্মকর্ম, শিল্পসাহিত্য, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি চর্চা করে কিছু পেতে বা দিতে চায় তারা আসলে কি? বা কে? তাঁরা বিভিন্ন পেশায় অনেক বড়, দক্ষ বা বিশেষজ্ঞ হতে পারে, প্রচুর বইপুস্তক পড়তে, ও লেখতে পারে! কিন্তু আর যাইহোক তাঁরা মানবতাবাদী নয় বরং মানবতাবিরোধী! তাঁদের দিয়ে প্রকৃতপক্ষে মানুষের সার্বিক কল্যাণ আশা করা যায় না, বরং ক্ষেত্রবিশেষে তারা মানুষের অকল্যাণ, ক্ষতিসাধন করে থাকে! তাই তাঁদেরকে হয়তো ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, কবি, ধার্মিক ইত্যাদি বলা যেতে পারে তাদের পেশা ও জীবিকা অনুসারে কিন্তু প্রকৃত মানুষ বলা যায় কি? মানুষের জন্য সবকিছু -এই জগতসৃষ্টি, সমাজসংসার সবকিছু। আর তাকে প্রাধান্য না-দিয়ে উপেক্ষা, অবজ্ঞা, তুচ্ছতাচ্ছিল্য, ঘৃণা ও বাদ দিয়ে কোনকিছু করা মানবকেন্দ্রিক না। একজন মানুষ সেই যে মানুষকে ভালবাসে, মানুষের ব্যথায় ব্যথিত হয়, মানুষের কল্যাণ করে। সবার উপরে, সবকিছু থেকে তার কাছে মানুষই বড়! মানুষই শ্রেষ্ঠ!
"সবার উপরে মানুষ সত্য তাহার উপরে নাই"- কবি চন্ডিদাসের এই সুপ্রাচীন উক্তিটি মাতবতাবাদের (Humanism) মূল কথা। এ-ধারায় পরবর্তীতে স্বভাবকবি সাইজি লালন ফকির গেয়ে উঠেনঃ

"এমন মানব সমাজ কবে গো হবে সৃজন যেদিন হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, খৃষ্টান জাতি গোত্র নাহি রবে।"
কিংবা পুরুষোত্তম নজরুলের ভাষায়ঃ "গাহি সাম্যের গান- মানুষের চেয়ে কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান,"
*হিন্দু হিন্দু থাক, মুসলমান মুসলমান থাক, শুধু একবার এই মহাগগনতলের সীমা হারা মুক্তির মাঝে দাঁড়াইয়া মানব তোমার কন্ঠে সেই সৃষ্টিতে আদিমবাণী ফুটাও দেখি। বল দেখি "আমার মানুষ ধর্ম"। মানবতার এই মহান যুগে একবার গন্ডী কাটিয়া বাহির হইয়া আসিয়া বল যে, তুমি ব্রাহ্মন নও, শুদ্র নও, হিন্দু নও, মুসলমানও নও, তুমি মানুষ - তুমি ধ্রুব সত্য। _________________ পুরুষত্তোম নজরুল।
সাম্য, মৈত্রী ও স্বাধীনতা--- এ তিনটি হল মানবতাবাদের ভিত্তি। মানবতাবাদ এমন একটি মতবাদ- "যা মানুষকে যথার্থ মানবধর্মী করে তোলে, যেখানে মানুষই সর্বস্ব, কোনকিছুর জন্য মানুষ নয় বরং মানুষের জন্য সবকিছু, ধর্ম, বিজ্ঞান ও দর্শন প্রভৃতির। এবং প্রকৃতি ও ইতিহাসের সে সব উপাদান তার মনকে সমৃদ্ধ করতে পারে, সে সবকিছুতেই তাকে অংশগ্রহণ করে তার অন্তরস্থিত মহত্ত্বের অভিব্যক্তি ঘটায়...
মানবতাবাদ ইশ্বরকেন্দ্রিক (Theocentric) অথবা মানবকেন্দ্রিক (Anthropocentric) হতে পারে। পাশ্চাত্যদর্শনে ইশ্বরকেন্দ্রিক মানবতাবাদের ওপর খ্রিষ্টধর্মের প্রভাব স্পষ্ট। এই মানবতা অনুযায়ী মানব জগতের তথা বিশ্বের কেন্দ্রস্থলে আছেন ইশ্বর। আর দ্বিতীয় মতবাদ অনুযায়ী সবকিছুর কেন্দ্রস্থলে রয়েছে মানুষ। ............অস্তিত্ববাদের সুফি দর্শনে- 'ওহ্‌দাতুল ওজুদ' তথা 'একক অস্তিত্ব' তত্ত্বে জগতে সকল বস্তু বা শক্তির অস্তিত্ব একটি। প্রকাশ-বিকাশ যাই হোক তা মূলত একই উৎসের বৈচিত্র্যময় উপস্থাপনা মাত্র। সুতরাং স্রষ্টা এবং সৃষ্টি স্বতন্ত্র নয়। ফলে মানুষ প্রচলিত গৎবাঁধা নিয়মে তার বিকাশকে নিশ্চিত করতে পারে না। তাকে নতুন দৃষ্টি মেলে তাকাতে হয়। অভিজ্ঞ কারো কাছে শিখতে হয়। তবে 'একক অস্তিত্ববাদ'---যা বিশেষভাবে শায়খে আকবর মহিউদ্দিন ইবনুল আরাবির দ্বারা ব্যাখ্যাকৃত ও প্রচারিত হয়েছিল, তা প্রচণ্ড বাধার সম্মুখীন হয় 'ওহ্‌দাতুশ শহুদ' মতবাদ দ্বারা। মোজাদ্দেদি তরিকার প্রতিষ্ঠাতা আহমদ সারহিন্দ (যিনি মোজাদ্দেদি আলফেসানি বলে খ্যাত) দ্বারা ওহদাতুল শহুদ ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয়। এ মতবাদে স্রষ্টা ও সৃষ্টি স্বতন্ত্র। এমন মতবাদ ওহাবি মতবাদের মূল ভিত্তি। ফলে মানুষ বিষয়ে ভিন্ন ধারণার উদয় ও বিকাশ ঘটে চলেছে। এবং দুটো মতাদর্শন একে অপরের বিপরীতে অবস্থান করায় মানুষ নিয়ে মুসলিম অস্তিত্ববাদী দর্শন জটিলতায় রয়েছে। সমগ্র অস্তিত্বের পরিপ্রেক্ষিতে মানুষকে দেখার জন্য অস্তিত্ববাদ বিশেষ ভুমিকা রাখতে প্রয়াসী হতে পারে।
(কৃতজ্ঞতা ও তথ্যসুত্রঃ *১.নুরনবি, অস্তিত্ববাদ ও মানবতাবাদঃ প্রাসঙ্গিক ভাবনা। *২.হিলালুজ্‌জামান হেলাল, কোরানে মানুষতত্ত্ব পরম্পরা-১ *৩. জেহাদুল ইসলাম ও ড. সাইফুল ইসলাম খান, দিওয়ান-ই-মুঈনুদ্দিন) ___________
★৪.
শাস্ত্র থেকে সত্য বড়, কিংবা কেন দানিয়াছ, মিছে শূল? শাস্ত্রজ্ঞানের সে-ই শূল আত্মজ্ঞান বা কাণ্ডজ্ঞানকে ঢেকে দেয়! হৃদয়ের জ্ঞান, বা প্রেম হতে যে জ্ঞান অর্থাৎ নিজের ভিতর উৎসারিত যে সত্য জ্ঞান তার বিকাশের দ্বার রুদ্ধ করে দেয়। শাস্ত্রের এলকোহল মস্তিষ্কের ভিতরে মিছে শূল বা ইন্ধন দেয়! শাস্ত্রজ্ঞান মানুষকে পণ্ডিত করে তোলে যদি না সে মানুষ দেহশাস্ত্র পাঠ না করে। কারণ দেহের মধ্যে সমস্ত জ্ঞান গুণ লুকায়িত। তাকে কর্মের মধ্য বাস্তবায়ন ঘটাতে হবে এবং কর্মের মধ্যে জ্ঞানের গুণের বিস্তার সাধন করতে হবে। সেজন্য জীবনাচরণের মধ্যে পূর্বপ্রস্তুতি ও অনুশীলন থাকতে হবে। নিচে কিছু দৃষ্টান্ত দ্র.___
*'গাধার পৃষ্ঠে কেতাব বোঝা এলেম পড়া সোজারে ওহেরে পাপিষ্ঠ মর্ম না বুঝিলিরে' --খাজা শাহপির চিশতী নিজামি (.)।
★ওরে মূর্খ ওরে জড়, শাস্ত্র চেয়ে সত্য বড়ো, (তোরা) চিনলিনে তা চিনির বলদ, সার হল তাই শাস্ত্র বওয়া॥
*"পেটে পিঠে কাঁধে মগজে যা-খুশি পুঁথি ও কেতাব বও, কোরান-পুরাণ-বেদ-বেদান্ত-বাইবেল-ত্রিপিটক- জেন্দাবেস্তা-গ্রন্থসাহেব প’ড়ে যাও, যত সখ- কিন্তু, কেন এ পন্ডশ্রম, মগজে হানিছ শূল?" --_পুরুষোত্তম নজরুল
*
*তাহাদের মেশাল, যাহারা তৌরাতের ভার গ্রহন করিয়াছে, তারপর তাহারা ইহাকে অন্তরে প্রবেশ করায় নাই, গাধার মেশালের মত-- গ্রন্থের বোঝা বহন করে। আল্লাহর পরিচয়ের উপর যে কওম মিথ্যা আরোপ করে তাহাদের মেশাল মন্দ। এবং আল্লাহ জালেম কওমকে হেদায়েত করেন না।" ---আল-কোরান (৬২:৫).
ব্যাখ্যাঃ-- ধর্ম শাস্ত্রবিদ ইহুদী পন্ডিতগণের প্রসংগ উল্লেখ করিয়া সকলকে স্পষ্ঠভাবে জানাইয়া দেওয়া হইতেছেঃ যাহারা আল্লাহ হইতে প্রেরিত গ্রন্থকে সত্য বলিয়া মানিয়া লইয়াছে, কিন্তু আমলের দারা হামেল করিয়া লইতে পারে না, অর্থাৎ উহার ভাবধারাকে অন্তরস্থ করিয়া উহা চরিত্রে অভিব্যক্ত করিয়া তুলতে পারে নাই তাহারা গাধার বোঝা বহন করে মাত্র। আল্লাহর নিদের্শিত বাণীদ্বারা চরিত্র সংগঠন না করিয়া শুধু ধর্মের বাণী বহন করাকে অতিশয় মন্দ বলিয়া গর্দভের সংগে তুলনা করা হইয়াছে। যাহারা আল্লাহর পরিচয়কে ঢাকিয়া রাখিল অর্থাৎ নিজের মধ্যে জাগ্রত করিয়া তুলিল না, অথচ বহুল পরিমাণ ধর্মের বানীর বোঝা বহন করে তাহারা আসলেই হতভাগ্য; যেহেতু কি বহন করিতেছে তাহার পরিচয় জ্ঞানও তাহাদের নাই। ইহারাই সত্যিকার জালেম, অর্থাৎ অত্যাচারী। এবং এইরূপ অত্যাচারী দলকে বা কওমকে আল্লাহ হেদায়েত করেন না বলিয়া স্পষ্ট ঘোষণা করিতেছেন। ইহাতে প্রমাণ করিতেছে যে, না বুঝিয়া কোরান পড়ার কোন মূল্য নাই। এবং কথা বুঝিয়া লইবার পর উহা আমলের দ্বারা চরিত্রগত না করিলে তাহাকেও গাধার সংগে তুলনীয় এবং অত্যাচারী অর্থাৎ জালেম বলিয়া ঘোষনা করা হইয়াছে। আল্লাহর নির্দেশের সাহায্যে নফসকে জীবন্ত করিয়া না তুলিলে তাহা নফসের প্রতি জুলুম করার সমতূল্য। (দ্র. কোরান দর্শনঃ সদর উদ্দিন আহ্‌মদ চিশতী) ________________________
★৩.
* 'ও যার আপন খবর আপনার হয় না তার আপনারে চিনতে পারলে রে যাবে অচেনারে চেনা '
* 'ক্ষ্যাপা তুই না জেনে তোর আপন খবর যাবি কোথায়! আপন ঘর না বুঝে, বাহিরে খুঁজে পড়বি ধাঁধায়।' _________-মহামতি মহাত্মা স্বভাব কবি লালন সাঁইজি।
এখানে সাইঁজীর খুব সুন্দর ও সত্য উপস্থাপনা। যা' পাঠ করে মুগ্ধ হই বারবার। মুগ্ধতায় চিত্তে উদয় হল পূর্বসঞ্চিত দু'টি বানীঃ___
১) মহাত্মা সক্রেটিস সাহেবের একটি উক্তি আছে, "আমি কি জানি না, তা জানি, কিন্তু লোকেরা কি জানেনা সেই জানেনা" (খুব সম্ভবত: যতটুকু মনে পড়ে! )
২) বিজ্ঞানী আইনস্টাইন মহোদয় বলেছেনঃ "আমি শুধু সমুদ্র তীরের বালু নিয়ে নাড়াচাড়া করে গেলাম কিন্তু সমুদ্রের অতল রহস্য কিছুই বুঝলাম না।" (খুব সম্ভবত:)
যাইহোক, নোনাপানির সমুদ্রের তো দুই/চার হাজার মাইল পাড়ি দিয়ে কুল কিনারা পাওয়া যায় কিন্তু জ্ঞান-সমুদ্রের, সংস্কার-সমুদ্রের কোন সীমা-পরিসীমা, কোন সীমান্ত নাই। যেখানে নিজেকে চেনাজানাদেখা' হয় নাই মানে আমি কি/কে? আত্মদর্শন হয় নাই, সেটাই নির্ণয় বা নির্ধারণ হয় নাই! সেখানে আমি কি জানি বা জানি না? তা' তো পরের বিষয়।
সর্বযুগে প্রশংসিত প্রতিষ্ঠিত সকল মহাপুরুষগণ এই বিধান বা concept প্রদান করে থাকে (Know thyself, See thyself, Watch thyself& Read thyself ) __ ''নিজেকে জানো_চিনো_দেখো এবং পাঠ কর অর্থাৎ আত্মদর্শন (সালাত, ধ্যান, মানসিক ব্যায়াম ) করো!? সে পদ্ধতি আপন আপন সম্যক গুরুর নিকট থেকে জেনে নিতে হয়।
"মান_আরাফা_নাফসুহু_ফাক্বাদ_আরাফা_রাব্বাহু"_ (-হাদিসে_রসুল)। অর্থাৎ যে তাঁর নফসকে চিনলো জানলো সে তাঁর রবকে চিনলো/জানলো।
মাওলা সুফি সদর উদ্দিন আহমদ চিশতী বলেছেনঃ যে সাধকের আত্মপরিচয় সুপরিজ্ঞাত হয় অর্থাৎ 'মান আরাফা নাফসাহু' হয় তাহার কলুষিত অস্তিত্ব চিরতরে ধ্বংস করা হয়। পরিণামে সে জন্মচক্র হইতে মুক্তি লাভ করে। "চিত্তবৃত্তির সামগ্রিক অভিব্যক্তিকে নফস বলে। নফস দর্শন তথা আত্মদর্শনকে সালাত বলে। 'নফস_দর্শন' অর্থ অসারতা দর্শন, অনাত্মা দর্শন।" অর্থাৎ নিজেকে দেখা, নিজের কর্মচিন্তাকে দেখা, নিজেকে পাঠ করা এবং নিজের মধ্যে কি আসে, কি যায়? তা' এক এক করে, অনু অনু করে, ভেঙে ভেঙে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র ভাবে দেখা, ও পাঠ করা।
এই হাদিসটি রসুলুল্লাহ (আ) একার কথা নয়। বরং সর্বযুগের সর্বভাষার সর্বকালীন সার্বজনীন কামেল গুরুগণের পবিত্র মুখের একটি বানী চিরন্তনী পরম্পরা। যে-কোন একটি ধর্মদর্শনগ্রন্থে এর উল্লেখ থাকবেই। একমাত্র বস্তুবাদী বস্তভোগী মানুষ এ-হাদিসটির বিরোধীতা করে রেফারেন্স খোঁজে বা চাই এবং তাঁরা রসুলুল্লাহর ১৫ বৎসর ১ মাস ১৯ দিন হেরাগুহার ধ্যানের ব্যাপারে নিশ্চুপ থাকবে!? কাজেই ''শাস্ত্র থেকে সত্য বড়। শাস্ত্র না ঘেঁটে ডুব দাও, সখা, সত্য-সিন্ধু-জলে (-নজরুল)।'' 'সবার উপর মানুষ সত্য তার উপরে নাই।(-চণ্ডীদাস)'
এ-হাদিসটি বিষয়ে বিস্তারিত বর্ণনাকারী শ্রদ্ধের জহির দা (Zahirul Haque) লেখেছেন:___
সুফীবাদ তথা আধ্যাত্মবাদে বহুল প্রচারিত একটি হাদিস "মান আরাফা নাফসাহু ফাকাদ আরাফা রাব্বাহু" হাদিসের নামে বানোয়াট কথা বলে উল্লেখ করেছেন আই সি এস পাবলিকেশন্স এর "বিষয়ভিত্তিক আয়াত ও হাদিস সংকলন" নামক বইয়ে।
মহাগ্রন্থ আল কোরানের সঙ্গে উক্ত বাক্যটি সত্যতা ও সামঞ্জস্যতা কতটুক একটু দেখে নেই,,,
কোরানুল মাজিদে বলা হয়েছে- "ওয়াফিল আরদ্বি আইয়াতুল্লিল মুকিনীন, ওয়াফি আনফুসিকুম আফালা তুবসিরুন।" অর্থাৎ "এবং পৃথিবীর/বস্তুজগতের/দেহের মধ্যে পরিচয়/চিহ্ন বা নিদর্শন আছে দৃঢ় বিশ্বাসীদের জন্য, এবং তোমাদের নফসের মধ্যেও কিন্তু তোমরা তা দেখ না বা লক্ষ্য কর না।"
কোরানের অন্যত্র আরো বলা হয়েছে, "শীঘ্রই আমি তাদেরকে স্বীয় নিদর্শন সমূহ পৃথিবীতে এবং নিজের মধ্যে দেখিয়ে দিব যতক্ষণ না তাদের জন্য প্রকাশিত হবে যে, নিশ্চয়ই ইহা সত্য।" কাজেই কুল আলমে যা আছে তা এই জুযু আলমেও অর্থাৎ দেহের মধ্যেও আছে এবং নিশ্চিত জ্ঞানে ও ইয়াকিনে তথা হাক্কুল ইয়াকিনে প্রতিষ্ঠিত না হওয়া পর্যন্ত বুঝা যাবে না। সুতরাং আপন রবের পরিচয় বা নিদর্শন সমূহের জ্ঞান লাভ করিতে চাইলে আপন দেহের মাঝে মনের ভ্রমনের দ্বারা নফসকে অর্থাৎ মানবিক চিত্তবৃত্তির অভিব্যক্তিগুলিকে চিনিয়া লইতে হইবে।
প্রিয় পাঠক ! পূর্বকালের পয়গম্বরদের গ্রন্থেও উল্লেখ রহিয়াছে যে, আল্লাহতা'লা তাহাদিগকে বলিয়াছেনঃ "আ'রিফ নাফসাকা, তা'রিফু রাব্বাকা" অর্থ- "আত্মপরিচয় লাভ করিতে পারিলে তুমি তোমার প্রভুর পরিচয় লাভ করিতে পারিবে।"
এতৎসমন্ধে সালেহীন বুযুর্গানে দ্বীনদার দ্বারা স্বীকৃত রসুলের হাদিস হিসেবে মশহুর- "মান আরাফা নাফসাহু ফাকাদ আরাফা রাব্বাহু" অর্থঃ যে ব্যক্তি নিজেকে চিনিতে পারিয়াছে সে তার রবকে (প্রভুকে) চিনিতে পারিয়াছে।"
প্রিয় সহৃদগণ ! সত্যিই কি ইহা হাদিসের নামে বানোয়াট কথা নাকি মুর্শিদ প্রদত্ত "মান আরাফা"-র তালিমকে সূফীবাদী সমাজ থেকে মুছে দেবার তাগুত পূজারীদের ষড়যন্ত্র ???
* যদি ইসলাম কায়েম হয় শরায় কী জন্যে নবীজি রহে পনের বছর হেরাগুহায়।। পঞ্চবেনায় শরা জারি মৌলভীদের তম্বী ভারি নবীজি কি সাধন করি নবুয়তী পায়।। না করিলে নামাজ রোজা হাসরে হয় যদি সাজা চল্লিশ বছর নামাজ কাজা করেছেন রসুল দয়াময়।। কায়েম উদ্ দ্বীন হবে কিসে অহর্নিশি ভাবছি বসে দায়েমী নামাজের দিশে লালন ফকির কয়।।
_____ স্বভাব কবি সাইজী ফকির লালন শাহ্‌।
* হেরা গুহাকে অবলম্বন করিয়া কোরানের আগমন। হেরাগুহায় প্রবেশ করিয়া ধ্যানস্থ না হইলে কেহই সত্য উদ্ধার করিতে সক্ষম হইবে না। অতএব যিনি হেরা গুহায় প্রবেশ করিয়া ধ্যান করিয়াছেন তিনি সত্য উদ্ধারকারী সাধক হইয়াছেন বা হইবেন। এই হেরাগুহা প্রত্যেক মানুষের ভিতরেই বিদ্যামান রহিয়াছে। এই হেরা গুহা হইল একমাত্র জ্ঞান কেন্দ্র। আপন দেহের গভীরে ধ্যান করাই ছিল হেরা গুহার ধ্যান। হেরা গুহা ধ্যান করা ব্যতীত অর্থাৎ আত্মদর্শনে নিমগ্ন হওয়া ব্যতীত জীবন রহস্য এবং ইহার দর্শন উদ্ধার করা কঠিন বিষয়। হেরা গুহার ধ্যান করা রসুলাল্লাহর (আ) সর্বপ্রথম সুন্নাত। যে কোন সত্য প্রকাশের উৎস হইতে হইবে হেরা গুহার ধ্যান, তথা আত্মদর্শন বা সালাত। দেহের সকল কর্মকাণ্ড লক্ষ করিবার অপর নাম সালাত। সালাত সকল মৌলিক জ্ঞানের মূল উৎস। (সংকলিত) ____সুফি দার্শনিক মাওলা সদর উদ্দিন আহমদ।
হেরা_গুহা নামক জ্ঞানকেন্দ্রকে কেন্দ্র করে কোরান বা বানীসমষ্টির অবতীর্ণ বা উদয়, আবির্ভাব বা আগমন। 'সিরুফিল_আর্দ্ তথা আপন দেহে ভ্রমণ', 'সাবাত_দিবস বা সপ্তমদিবস অর্থাৎ একদিন আল্লাহর ধ্যানে ব্যয় করা', 'শাহারুল_হারাম- বা চার মাস দুনিয়া হারাম অর্থাৎ চার মাস দুনিয়া কর্ম থেকে বিরত থাকা, একজন মুসল্লীর জন্য জীবনে অন্ততঃ একবার করে হলে তা করা বাঞ্চনীয়- এই রূপে ইত্তেকাফ, মোরাকাবা_মোশাহেদা, চিল্লা ইত্যাদি ধ্যানকেন্দ্রিক দায়েমি সালাত হেরাগুহার নামান্তর। হেরাগুহা মানব দেহের প্রতীক। হেরা গুহায় তথা মানবদেহে প্রবেশ করে আপন দেহে মানসিক ভ্রমণ তথা মানসিক ব্যায়ামের অনুশীলন না করলে প্রকৃত সত্যানুসন্ধান, সত্যুদ্ধার করা অসম্ভব ব্যাপার। আপন দেহের গভীরে ধ্যান করাই হেরা গুহার ধ্যান। দেহের সকল কর্মকাণ্ডকে এক এক করে (অনু অনু করে) ভেঙ্গে ভেঙ্গে তার স্বরূপকে জ্ঞান দ্বারা বিস্তারিত লক্ষ্য করার অপর নাম ধ্যানসালাত। সালাত মূলতঃ আপন দেহ বা নিজেকে পাঠ করা বা দর্শন করা। নিজের ভিতরের বিষয়বস্তুকে এক এক করে দেখতে (সালাত) আরম্ভ করলে ওর যে মোহ উচ্ছেদ বা ত্যাগ করার অপর নাম যাকাত। উদ্বৃত্ত আয়ের আড়াই ভাগ ট্যাক্স দেওয়াকে কোরানে কোথাও যাকাত বলে নাই। সালাত হল দায়েমি অর্থাৎ সার্বক্ষণিক, অবিরাম, ধারাবাহিক এবং স্বর্গীয় বা প্রভুর জ্ঞান ও গুণ অর্জন করা। অন্যদিকে নামাজ হলঃ "সালাতের অংশ, খণ্ডকালীন বা ওয়াক্তিয়া, আনুষ্ঠানিক, প্রাথমিক ব্যবস্থা, সালাতের মহড়া দেওয়া এবং প্রভুর গুণকীর্তন করা!"
ধ্যানসালাত কর্মপন্থা সমস্ত মহাপুরুষের আদিকর্ম। হেরাগুহার ধ্যান রসুলাল্লাহর সর্বপ্রথম সুন্নাত। হেরাগুহায় ধ্যান করা ব্যতীত অর্থাৎ আত্মদর্শনে নিমগ্ন হওয়া ব্যতীত জীবন রহস্য এবং জীবন দর্শন উদ্ধার করা কঠিন। সত্যপ্রকাশের মূল উৎস হতে হবে হেরাগুহার ধ্যান, তথা আত্মদর্শন বা সালাত। ইহা সকল মৌলিক জ্ঞানের মূল উৎস। সালাতের ফলশ্রুতি হলঃ যাকাত, কোরবানি, সদক্বা, সিয়াম, এফতার, তালাক ইত্যাদি। শুরুতে গুরুকে কেন্দ্র করে শুরু করতে হয়। তারপর গুরুভাব, গুরুপ্রেম, গুরুময়ের মধ্যদিয়ে সত্যজ্ঞান চলে আসে। তখন গুরুপ্রাপ্ত তথা আল্লাহপ্রাপ্ত সাধক, সিদ্ধপুরুষ জ্ঞানবাদী সালাতে দায়েম বা সালাতরত থাকেন। তাঁর প্রতিটি কর্মচিন্তা, প্রতিটি মুহূর্ত সালাত কর্ম ব্যতীত হয় না। তার সপ্তইন্দ্রিয় এলহাম ব্যতীত চলে না। তখনই রসুলাল্লাহর হাদিস বাস্তবায়ন হয়, তাঁর হাত আল্লাহ্‌র হাত, তাঁর চোখ আল্লাহর চোখ অর্থাৎ তিনি আল্লাওয়ালা ব্যক্তিতে রূপান্তরিত হন।
★কর্মকে অনু অনু করে ভেঙ্গে ভেঙ্গে তার স্বরূপ দেখার মাধ্যমে
★গুরুভাবে গুরুপ্রেমে থেকে, গুরুমুখী হয়ে সমস্তকর্ম সম্পাদন করা অর্থাৎ গুরুকে অগ্রভাগে বা সম্মুখে রেখে সমস্ত কর্মসম্পাদন করা। অর্থাৎ গুরুময় বা গুরুপরায়ণের মাধ্যমে বা গুরু-সংযোগে কর্ম সম্পাদন করে
★সম্যককর্ম সম্যকসময় যথাবিহিত সম্পাদন করার মাধ্যমে..
প্রভৃতি....
(তথ্য উৎসঃ কোরান দর্শনঃ সদর উদ্দিন আহ্‌মদ চিশতী)
শাস্ত্রকেতাব বনাম দেহকেতাবঃ

পুরুষোত্তম নজরুলের বলেছেনঃ
'তোমাতে রয়েছে, সকল কেতাব সকল কালের জ্ঞান, সকল শাস্ত্র খোজে পাবে সখা খুলে দেখ নিজ প্রাণ! "
অন্যদিকে কেতাব সম্পর্কে ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে দয়াল মুর্শিদ সদরজান কেবলা বলেছেনঃ-
"নূরে মোহাম্মদীর মাধ্যমে বিচিত্র সৃষ্টিরূপে বিকাশ বিজ্ঞানকে কেতাব বলে। উচ্চমানের বিশিষ্ট সাধকের উপর কেতাব জ্ঞান নাজেল হওয়া বিষয়টি সর্বকালের একটি চিরন্তন ব্যবস্থা। কেতাব হইল বিশ্বপ্রকৃতির সামগ্রিক বিকাশ-বিজ্ঞান। মানুষের জন্য আল্লাহর দেওয়া জীবনবিধানও কেতাবের অন্তর্ভুক্ত। আল্লাহর বিকাশ বিজ্ঞানকে কেতাব বলে। যেই যন্ত্রের মধ্যে বা যেই সকল রূপের মধ্যে আল্লাহর উক্ত বিজ্ঞানময় বিকাশ ঘটে তাহার মধ্যে মানব দেহ সর্বশ্রেষ্ঠ। এইজন্য মানবদেহকে "আল কেতাব" বলা হইয়াছে। আল কেতাবের জাহের রূপ 'মানব দেহ' এবং বাতেন প্রক্রিয়া 'বিকাশ বিজ্ঞান'। আল কেতাবের উভয় প্রকার বিকাশের মূল উৎস নূর-মোহাম্মদ (যে কোন একজন মোহাম্মদ দ্বারা অর্জিত স্বর্গীয় চরিত্র এবং গুণাবলীকেই 'নূরে-মোহাম্মদী' বলে। আল্লাহর আপন চরিত্রই সৃষ্টির মধ্যে মহা গুরুর অভিব্যক্তি রূপে যুগ যুগ যে সকল বিকাশ হইয়া থাকে তাহাকে নূরে মোহাম্মদী।)
'আল_কেতাব_পাঠ_করা' অর্থ আপন_দেহ_পাঠ_করা তথা আপন দেহের মধ্যে আত্মদর্শনের অনুশীলন করা। আপন দেহই সকল জ্ঞানের মূল উৎস। সহজ কথায় কেতাব অর্থ মানব দেহ। আল-কেতাব অর্থ বিশিষ্ট মানব দেহ বা সিদ্ধপুরুষ অর্থাৎ প্রতিষ্ঠাপ্রাপ্ত একজন মহাপুরুষ। (অর্থাৎ যে দেহ কেতাব পাঠ হয়ে গেছে যাকে বুদ্ধ কেতাব বা আল কেতাব বলা যায়।)। আল কেতাব হইতে ধর্মগ্রন্থ সমূহের আগমন। " বিস্তারিত দ্র. নিচের লিংকেঃ______________ https://www.facebook.com/notes/mithu-shamim/%E0%A6%A6%E0%A7%87%E0%A6%B9-%E0%A6%95%E0%A7%87%E0%A6%A4%E0%A6%BE%E0%A6%AC-%E0%A6%AC%E0%A6%A8%E0%A6%BE%E0%A6%AE-%E0%A6%AA%E0%A7%81%E0%A6%B8%E0%A7%8D%E0%A6%A4%E0%A6%95-%E0%A6%95%E0%A7%87%E0%A6%A4%E0%A6%BE%E0%A6%AC%E0%A6%83%E0%A6%B8%E0%A6%A6%E0%A6%B0-%E0%A6%89%E0%A6%A6%E0%A7%8D%E0%A6%A6%E0%A6%BF%E0%A6%A8-%E0%A6%86%E0%A6%B9%E0%A7%8D%E0%A6%AE%E0%A6%A6-%E0%A6%9A%E0%A6%BF%E0%A6%B6%E0%A6%A4%E0%A7%80/980440398718223/)
পুরুষোত্তম নজরুলের লোকোত্তর দর্শন এবং (আত্মজ্ঞানতত্ত্ব বাণী চিরন্তনী): ---- ১. *তোমাতে রয়েছে সকল কেতাব সকল কালের জ্ঞান, সকল শাস্ত্র খুঁজে পাবে সখা খুলে দেখ নিজ প্রাণ!
২. *তোমাতে রয়েছে সকল ধর্ম সকল যুগাবতার, তোমার হৃদয় বিশ্ব দেউল সকলের দেবতার।
৩. *কেন খুঁজে ফের দেবতা ঠাকুর মৃত পুঁথি কঙ্কালে হাসিছেন তিনি অমৃত হিয়ার নিভৃত অন্তরালে।
৪. *বন্ধু, বলিনি ঝুট্‌, এইখানে এসে লুটাইয়া পড়ে সকল রাজমুকুট।
৫. *এই হৃদয়ই সে নীলাচল, কাশী, মাথুরা, বৃন্দাবন, বুদ্ধা-গয়া এ, জেরুজালেম্‌ এ, মদিনা, কাবা-ভবন, মসজিদ এই, মন্দির এই, গির্জা এই হৃদয় এইখানে ব'সে ঈশা মুসা পেল সত্যের পরিচয়।
৬. *এই হৃদয়ের ধ্যান-গুহা-মাঝে বসিয়া শাক্যমুনি ত্যজিল রাজ্য মানবের মহা-বেদনার ডাক শুনি'।
৭. *মিথ্যা শুনিনি ভাই, এই হৃদয়ের চেয়ে বড় কোনো মন্দির-কাবা নাই।
৮. * আমি সহসা আমারে চিনেছি, আমার খুলিয়া গিয়াছে সব বাঁধ! *জগদীশ্বর-ঈশ্বর আমি পুরুষোত্তম সত্য,
(#বিদ্রোহী) ..___________
মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি।
মানুষকে ভালবেসে আপন করি কাছে টানি। সময়টা বড় অল্প। দমের ঘরের দম ফুরালেই সাঙ্গ হবে ভবের খেলা!
কী লাভ মানুষকে দূরে ঠেলে জীবনের প্রয়োজনে মিছে এতো সব আয়োজনে!
দমেদমে প্রতিটা কদমে রয় যেন মানুষগুরুর স্মরণে- সংযোগে প্রেম/ভক্তি/দয়ামায়া/বিশ্বাস/ক্ষমা ও ধৈর্য গুণের সাথে বড় ভালো মানুষ হয়ে উঠি মানুষের তরে। ____
* ধর্মের কাল্পনিক স্বর্গ নরক লোভ লালসায় মত্ত ধর্মান্ধ; তাই অন্যের অনিষ্ট করেও কি করে স্বর্গের আশা করে? এরা পাপিষ্ঠ বেহায়া বেহুঁশ! মান আর হুঁশকে ধুলোয় মিশিয়েছে। স্রষ্টার সৃষ্টিকে তারা ধ্বংস করে স্বর্গের আশা করে! সৃষ্টিকে না ভালবেসে স্রষ্টাকে কি ভালবাসা যায়? যাকে চেনা নেই, জানা নেই, কথা নেই তাঁর সাথে ভালবাসা হয় কি-করে? স্রষ্টা থেকে সৃষ্টি আলাদা কিছু নয়। তাই সৃষ্টিকে অর্থাৎ যাকে দেখা যায় স্পর্শ করা যায়, তাকেই ভালোবাস। মানুষ-খোদার বিধান তাহাই মানুষকে ভালবাস, আপন কর, কাছে টানো.. মানুষের মাঝে খোদা ঈশ্বর ভগবান!
★ মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি। মানুষ ছাড়া ক্ষ্যাপা রে তুই মূল হারাবি।। ★ ভজ মানুষের চরণ দু’টি নিত্য বস্তু হবে খাঁটি। মরিলে সব হবে মাটি ত্বরায় এই ভেদ লও জেনে।। ___ লালন
★ মানুষ থুইয়া খোদা ভজ এই মন্ত্রণা কে দিয়াছে ।। মানুষ ভজ কোরান খুঁজ পাতায় পাতায় সাক্ষী আছে ।। __
মানুষেরি ছবি আক পায়ের ধুলো গায়ে মাখ শরীয়ত সঙ্গে রাখ তত্ত্ব বিষয় গোপন আছে ।।
★ মানুষ ধর মানুষ ভজ শোন বলি রে পাগল মন। মানুষের ভিতরে মানুষ করিতেছে বিরাজন।।
★ “ শুনহে হে মানুষ ভাই, সবার উপরে মানুষ সত্য তাহার উপরে নাই ” __ চন্ডীদাস
★ "গাহি সাম্যের গান মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই নহে কিছু মহীয়ান," ___ নজরুল।
★ তনমন বিদায় কর ধরিয়া মুর্শিদের চরণ রাহাতে বসি থাক সর্বদা যদি সে চাহ তাঁর মিলন' ......! ____ ডুবিয়ে যাও চরণ তলে ভেসনা কখন সংসার হাওয়ায়। ভক্তি রসে প্লাবিত হয়ে অমর হও কদম তলায়।। ___ শাহ্‌পীর।
★ আমার মাথা নত করে দাও হে তোমার চরণধুলার তলে। সকল অহংকার হে আমার ডুবাও চোখের জলে॥ ___
★ চরণ ধরিতে দিয়ো গো আমারে, নিয়ো না, নিয়ো না সরায়ে জীবন মরণ সুখ দুখ দিয়ে বক্ষে ধরিব জড়ায়ে।। ___ রবীন্দ্রনাথ।

Monday, 20 March 2017

বাগে ফদক ও খেলাফত সম্পর্কে ফাতেমা জাহরার (আঃ) বক্তব্য

0 Comments
হজরত ফাতেমা (সাঃ আঃ) বক্তব্যঃ
আবু বকরের (রাঃ) ও খেলাফতের দুর্বিষহ আচরণে জীবনের সকল ক্ষেত্র থেকে নিজেকে গুটিয়ে ফেলা হজরত ফাতেমা (সাঃ আঃ) অত্যন্ত রাগান্বিত হলেন। কয়েক জন নারীকে নিয়ে তিনি মসজিদে নববীতে আবু বকরের দরবারে উপস্থিত হলেন, যেখানে বহু আনসার ও মুহাজির উপস্থিত ছিলেন। তাঁর এবং উপস্থিতদের মধ্যে পর্দা টেনে দেবার পর হজরত ফাতেমা (সাঃ আঃ) এমন ব্যাথাতুর আর্তনাদ করলেন যে কেউ চোখের পানি ধরে রাখতে পারেনি। এরপর তিনি দরবারের সবার সামনে হৃদয়গ্রাহী এক বক্তব্য প্রদান করেন।

মহান আল্লাহ্‌ তালাহ যে অশেষ নেয়ামত দিয়েছেন তার জন্য সকল প্রশংসা একমাত্র তারই প্রাপ্য। এজন্য তার প্রতি আমাদের অফুরন্ত কৃতজ্ঞতা।
তিনি আমাদের যে অবিরাম দয়া ও অনুগ্রহ প্রদান করেছেন এবং অফুরন্ত করুণা আমাদের দান করেছেন তার জন্য আমরা প্রকাশ করি তার প্রতি আমাদের আনুগত্য। তিনি প্রদান করেছেন সকলকে অপরিসীম ও অপরিমিত ভাবে, অনাবিল ও অবারিত ধারায় যা গণনার অতীত, হিসাবের বাহিরে; যা অননুমেয় তুলনার ঊর্ধ্বে, সীমাহীন, চিরন্তন, অনন্ত স্থায়ী ও চির অম্লান। এসব নেয়ামতের ধরণ, প্রকৃতি, পরিমাণ ও সীমানা অনুধাবন করাও মানুষের পক্ষে অসম্ভব। এই সকল নেয়ামতের প্রাচুর্যতা ও অবিরাম ধারা বিরাজমান রাখার লক্ষে তিনি তার সকল প্রশংসা করা ও তার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের জন্য আমাদের আহব্বান জানিয়েছেন।
সকল প্রশংসা আল্লাহ্‌র যিনি আমাদের স্বীয় অন্তরে বিশ্বাস সৃষ্টির মাধ্যমে তার তাকে সাড়া দিয়ে উভয় জগতে সফলকাম হওয়ার সুজগ সৃষ্টি করে দিয়েছেন। আমি এই মর্মে সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ্‌ ছারা কোন কোন উপাস্য নেই, তিনি একক ও অদ্বিতীয়, তার সমতুল্য ও সমকক্ষ আর কেউ নেই। এই সাক্ষ্য আত্মসমর্পণের নির্দেশ বহন করে। এভাবে এই সাক্ষ্য প্রত্যেকের সামর্থ্য অনুযায়ী তাদের অন্তরকে পরিপূর্ণ ও চেতনাকে প্রস্ফুটিত করে।
আমাদের চোখে তিনি দৃশ্যমান নন। তার গুণাবলি বর্ণনা করার ভাষা আমাদের সাধ্যের অতীত। তার অস্তিত্ব ও প্রভাব সম্পর্কে কিছু অনুমান করতে আমরা অক্ষম। যখন কোন কিছুই বিদ্যমান ছিল না তখন তিনি এই বিশ্বজগৎ সৃষ্টি করেছেন। তিনি এই বিশ্বজগতকে অস্তিত্ব দিয়েছেন হয়তো শুধু সৃষ্টিরই কারনে অথবা শুধু অতীত ও ভবিষ্যতের বিদ্যমান উদাহরণ হিসাবে। তিনি জ্ঞান ও প্রজ্ঞার আলোকে এই অস্তিত্ব প্রদান করেছেন এবং আপন শক্তি ও ক্ষমতা বলে তিনি এগুলোকে আকৃতি প্রদান করেছেন।
কিন্তু এই সৃষ্টি সম্ভার না তার কোন প্রয়োজন ছিল আর না এগুলোর আকৃতি রুপ প্রদান তার কোন উপকারের জন্য ছিল। তিনি সীমাহীন ক্ষমতার বহিঃপ্রকাশ ঘতিয়েছেন এবং চেয়েছেন তার এই সৃষ্টি তার ইচ্ছার কাছে আত্মসমর্পণ করুক ও তার প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করুক। তিনি আরও চেয়েছেন তার অপরিসীম ক্ষমতা প্রতিষ্ঠিত হোক ও আমারা তার বাধ্য থাকি এবং তার ঐশ্বরিক লক্ষ অম্লান হোক।  
অতঃপর তিনি তার প্রতি আনুগ্যতের জন্য পুরুস্কার এবং তার আদেশ অমান্যকারীদের জন্য শাস্তির বিধান নির্দিষ্ট করেছেন যাতে এই বিশাল সৃষ্টি জগত তার ক্রোধ থেকে পরিত্রাণ পায় এবং তার সৃষ্টি জান্নাতে স্থান পায়।
আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মদ তার বান্দা ও রাসুল। তিনি তাঁকে এই পৃথিবীতে প্রেরণের পূর্বেই মনোনীত করে রেখেছিলেন। মহান আল্লাহ্‌ তাঁকে সৃষ্টির পূর্বেই তাঁর মর্যাদা ও নাম নির্ধারণ করে রেখেছিলেন। তিনি তাঁকে নবুয়াত প্রদানের পূর্বেই এই পদে অধিষ্ঠিত করে রেখেছিলেন। এ সবকিছুই ঘটেছে যখন সমস্ত সৃষ্টি জগত ছিল গুপ্ত ও অনস্তিতের অন্ধকারে লুক্কায়িত।
আল্লাহ্‌ ভবিষ্যৎ সম্পর্কে অবহিত। কেননা তিনি এর কারিগর ও স্রষ্টা। তাই, তিনি জানতেন এর পরিণতি আর ভবিষ্যৎ, এই বিশ্বজগতে দুঃখ-দুর্দশা এবং এর পরিবর্তিত অবস্থা। আল্লাহ্‌ তার ঐশ্বরিক পরিকল্পনা পরিপূর্ণ করার মানসে এবং তার ইচ্ছা ও নির্দেশ বাস্তবায়নের লক্ষে তার রাসুল কে প্রেরন করেছেন। রাসুল পৃথিবীতে এসে প্রত্যক্ষ করলেন যে, মানবতা বিভিন্ন অনৈতিক ও অসম ধারায় দ্বিধা-বিভক্ত। কেউ আগুনের পূজা করছে। যা সে নিজেই প্রজ্বলিত করেছে, অন্যেরা নিজেদের তৈরি মূর্তিকে পূজা করছে। তাদের অন্তর গুলো আল্লাহ্‌ ও সত্যকে সাক্ষ্য দিলেও কার্যত তা তারা অস্বীকার করছে।
আল্লাহ্‌ ইচ্ছা পোষণ করলেন যে, মুহাম্মদের মাধ্যমে তিনি অন্ধকার দূরীভূত করে (এসব অন্তর গুলোকে) আলোয় উদ্ভাসিত করবেন, তাদের মন থেকে কলুষতা ও অবিশ্বাস দূর করবেন এবং কুয়াশার পর্দা যা তাদের চোখ গুলোকে অন্ধ করে রেখেছে তা বিদুরিত করবেন।
রাসুলের (সাঃ) অতুলনীয় অধ্যবসায় ও অসিম বলিষ্ঠটায় মানব জাতিকে সত্যের পথে আহবান জানিয়ে তাদের হেদায়েতের কাজে আত্মনিয়োগ করেন। এবং তাদের পথভ্রষ্টটার হাত থেকে রক্ষা করেন, তাদের চোখের অন্ধত্ব দূর করেন এবং তাদের অটল ও অবিচল বিশ্বাসের প্রতি দিকনির্দেশনা প্রদান করেন।
অতঃপর আল্লাহ্‌ তাঁকে ফিরিয়ে নেয়ার ইচ্ছা করেন। স্রষ্টা হিসাবে তার ঐশ্বরিক ইচ্ছার আলোকে, তার অসীম ক্ষমাশীল ও সহৃদয়তার নিদর্শন হিসাবে এবং তার সীমাহীন ভালবাসার বহিঃপ্রকাশ হিসাবে তিনি তাঁকে ফিরিয়ে নেন। মুহাম্মদ এখন সকল প্রকার কষ্ট, লাঞ্ছনা ও উৎকণ্ঠা থেকে মুক্ত। তার আত্মা এখন পরম শান্তিতে স্বর্গসুখে অবস্থান করছে। আল্লাহ্‌ একান্ত আনুগত ফেরেস্তা দ্বারা পরিবেষ্টিত হয়ে তিনি এখন আল্লাহ্‌র প্রবিত্র সান্নিধ্যে কালযাপন করছেন।
আল্লাহ্‌ তায়ালার সর্বোৎকৃষ্ট রহমত ও দয়া আমার পিতার ওপর বর্ষিত হোক যিনি তার রাসুল, তার প্রত্যাদেশের ধারক ও তার সবচেয়ে প্রিয়তম সৃষ্টি। তার সৃষ্টিকুলের মধ্যে তিনিই সর্বাধিক পছন্দনীয় ও প্রশংসনীয়। অনন্তকালব্যাপী তার ওপর অবিরাম ধারায় আল্লাহ্‌র অশেষ নেয়ামত, রহমত ও বরকত বর্ষিত হোক।
হে আল্লাহ্‌র বান্দারা! রাসুলের (সাঃ) আদেশ, নির্দেশ ও নিষেধাজ্ঞা মেনে চলা তোমদের ওপর ওয়াজিব। তোমরা তাঁর ধর্ম ও দ্বীনের বাহক। আল্লাহ্‌ তোমাদের নিজ নিজ আত্মার প্রতিনিধিত্ব করার দায়িত্ব দিয়ে পাঠিয়েছেন এবং তার বাণী অন্যদের কাছে পৌঁছানো ও তোমাদের দায়িত্ব। তোমাদের ওপর আল্লাহ্‌ যে দায়িত্ব অর্পণ করেছেন তা পুরাপুরি যথার্থ। কারন পূর্বেই যে শর্তাবলি নির্ধারণ করা হয়েছে তার আলোকে তোমরা তার নির্দেশ পালনে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ও তার প্রতিনিধি হিসাবে তোমাদের সাথে রয়েছে রাসুল’র মাধ্যমে প্রেরিত মহান আল্লাহ্‌র প্রত্যাদেশ। অতএব আমাদের সাথে রয়েছে কুরআন-এ-নাতিক, কুরআন-এ-সাদিক, উজ্জল নূর এবং প্রাচুর্যপূর্ণ ও অত্যুৎকৃষ্ট দীপ্তিময়তা।
এই মহাগ্রন্থের দৃশ্যমান দিক অকাট্য ও স্পষ্ট এবং অন্তর্নিহিত চেতনা সহজবোধ্য। এর বাণীসমূহ দীপ্তিময়, সুস্পষ্ট ও অতি প্রাঞ্জল। এর অনুসারীদের জীবন সাফল্যের ক্ষেত্রে ইরস্নিয়, এরা মহা সম্মানিত। এই মহাগ্রন্থই আল্লাহ্‌র সন্তুষ্টি অর্জনের পথপ্রদর্শক। এই মহাগ্রন্থ তাদের জন্য মুক্তির নিশ্চয়তা দেয় যারা আন্তরিক ও গভীর প্রেমে এর আনুসরণ করে।
এই মহাগ্রন্থের যথার্থ অনুশীলনের মাধ্যমে আমরা যে শিক্ষা গ্রহণ করতে পারি তা হলঃ
-         এর অন্তর্নিহিত মর্মবাণী ও দিকনির্দেশনা;
-         এর মৌলিক বাণী ও ঐশ্বরিক নির্দেশনার বিষয়বস্তু;
-         যা কিছু আমাদের জন্য নিষেধ বা হারাম তা নিয়ন্ত্রনের বিধান;
-         আল্লাহ্‌র বিধান ও আহকামের সুস্পষ্ট বর্ণনা;
-         এর যৌক্তিকতার স্বপক্ষে পর্যাপ্ত উৎকর্ষ;
-         এর যথার্থতার প্রগাঢ়তা;
-         আমাদের জন্য যা কিছু বৈধ তার বর্ণনা;
-         মানবীয় শিষ্টাচারের সুনিপুণ ব্যাখ্যা;
অতএব আল্লাহ্‌ কুরআনের মাধ্যমে আমাদেরঃ
-         ঈমান প্রতিষ্ঠার নির্দেশ দিয়েছেন- বহু ঈশ্বরবাদ থেকে মুক্ত থাকার জন্য;
-         সালাত (দায়েমি ও ওয়াক্তিয়া) প্রতিষ্ঠার নির্দেশ দিয়েছেন – অহংকার ও ঔদ্ধত্য থেকে বিমুক্ত ও বিশোধিত থাকার জন্য;
-         দান – খয়রাতের নির্দেশ দিয়েছেন –নিজ অন্তরকে পরিশুদ্ধ করা এবং রিজিকের প্রসার ঘটানোর জন্য;
-         রোজা রাখার নির্দেশ দিয়েছেন –বিশ্বাসের ভিত দৃঢ় করার জন্য;
-         হজ পালনের নির্দেশ দিয়েছেন –দ্বীন কে নিরাপদ ও শক্তিশালী করার জন্য;
-         ন্যায়পরায়ণতার নির্দেশ দিয়েছেন –পরস্পরের মাঝে সংহতি বজায় রাখার জন্য;
-         আমাদের (আহালে বায়াত) মেনে চলার নির্দেশ দিয়েছেন –সুষ্ঠু শাসনকার্য পরিচালনা ও সংহতি সুদৃঢ় রাখার জন্য;
-         আমাদের (আহালে বায়াত) ধারাবাহিক নেতৃত্ব কে মেনে চলার নির্দেশ দিয়েছেন –তোমাদের ঐক্যমত অটুট রাখার ও অবিচ্ছন্নতার বিচ্যুতি প্রতিরোধের জন্য;
-         জিহাদ (রাসুল বা আহালে বায়াতের ইমামের আদেশে) করার নির্দেশ দিয়েছেন –ইসলামের মর্যাদা বৃদ্ধির জন্য;
-         ধৈর্যশীল ও সংযমী হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন –পরকালের পুরস্কার প্রাপ্তির জন্য;
-         সহানুভূতি, সহমর্মিতা ও সৎ কাজ করার নির্দেশ দিয়েছেন –জনগণের কল্যাণ নিশ্চিত ও নিরপেক্ষতাকে উৎসাহিত করার লক্ষে;
-         পিতামাতার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা ও তাদের অনুগত থাকার নির্দেশ দিয়েছেন –মহান আল্লাহ্‌র ক্রোধ থেকে নিজেকে বাঁচার জন্য;
এর পর ফাতেমা (সাঃ আঃ) বললেন, হে লোক সকল তোমরা অবগত আছ যে আমি ফাতিমা এবং আমার পিতা মুহাম্মদ। আমি যা বলি তাতে কখনো বৈপরীত্য খুঁজে পাবে না এবং আমার আমল ত্রুটিহীন। অবশ্যই তোমাদের মাঝ থেকেই তোমাদের জন্য একজন রাসুল এসেছেন। তাঁর ওপর অর্পিত প্রত্যাদেশ অত্যন্ত ভারী যা বহনে তোমরা অনেক কষ্টের সম্মুখীন হবে তোমাদের নিয়ে তিনি অত্যন্ত উদ্বিগ্ন এবং মুমিনদের প্রতি তিনি অত্যন্ত সদয় ও সহানুভূতিশীল; (তওবা-২৮)
তোমরা যদি শ্রদ্ধার সাথে তাঁর প্রতি দৃষ্টি নিবন্ধ করো এবং তাঁর মহিমান্বিত অবস্থান স্বীকার করো তাহলে তোমরা আনুধাবন করতে সক্ষম হবে যে তিনি শুধু আমারই পিতা, তোমাদের কোন নারীর নয় এবং আমার স্বামীর ভাই, তোমাদের কোন পুরুষের নয়। এর তাঁর সাথে এভাবে সম্পর্কিত হতে পারাটা কতই না সম্মানের!
তিনি মানব জাতির কাছে আল্লাহ্‌র বাণী পৌঁছিয়েছেন এবং আল্লাহ্‌র অসন্তুষ্টির ব্যাপারে সতর্ক করেছেন। তিনি বহু ঈশ্বরবাদের মতবাদকে ঘৃণার সাথে প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি মানব জাতি কে সত্যের পথে, মহান প্রভুর পথে আসার জন্য আহবান জানিয়েছেন, তাদের নিবিড় ভাবে পরামর্শ দিয়েছেন এবং যারপরনাই প্রাণান্তকর চেষ্টা করেছেন জেন তারা অন্ধকার ছেড়ে আলোর পথে ফিরে এসে। তিনি তাদের মূর্তি গুলো ধ্বংস করে দিয়েছেন এবং তাদের দর্প চূর্ণ করে দিয়েছেন। তিনি ততক্ষণ পর্যন্ত তাঁর সংগ্রাম অব্যাহত রেখেছেন যতক্ষণ পর্যন্ত না বাতিলের মিলিত শক্তি বিভক্ত হয় এবং তারা পরাজয় মেনে নিয়ে পৃষ্ঠপ্রদর্শন করতে বাধ্য হয়। অতঃপর অন্ধকারকে বিদীর্ণ করে আলো তার পথ করে নিল, যা সত্য কে তার আসল রুপে উন্মোচিত করল। সত্যের বাহকের দৃঢ় কণ্ঠ তখন হলো আরও দৃঢ় এবং তা ধীরে ধীরে স্তব্ধ করে দিল অবিশ্বাসীদের কুপ্ররোচনা ও সকল শয়তানি কর্মকাণ্ড।
এভাবেই অসৎ মতাদর্শের বিশ্বাসীরা ধ্বংস হয়ে গেল এবং আক্রোশ ও অবিশ্বাসের শেষ যোগসূত্রও বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল।  এরপর তোমরা কালেমা পাঠ করলে যা তোমরা তাদের কাছ থেকে যারা অর্ধ আহারে থাকলেও তাদের মুখমণ্ডল থাকত অজাগতিক এক আলোয় উতদ্ভাসিত।
সংকট পূর্ণ এই সন্ধিক্ষণে তোমরা ছিলে ভয়াবহ এক গহ্বরের প্রান্তসীমায়; (আল-ইমরান-১০৩)
তখন তোমরা ছিলে অসহায়, দুর্বল ও সংখ্যালঘুতোমরা ছিলে এক গ্রাস খাবারের সমতুল্য, যা মানুষের পক্ষে পানি দিয়ে গিলে খাওয়া অসম্ভব ছিল না। তোমরা ছিলে অঙ্গারের ন্যায়, যে কোন ব্যাক্তি তাকে নিমিষের মধ্যে নিশ্চিহ্ন করে ফেলতে পারত। তোমরা ছিলে তেমনই যা বিনা দ্বিধায় পদদলিত করা মোটেও কঠিন কাজ ছিল না। তোমরা এতটাই অপরিণত ও অমার্জিত ছিলে যে তোমরা ময়লা, দুর্গন্ধযুক্ত পানি পান করতে এবং প্রাণীর দেহ ও গাছের পাতা ছিল তোমাদের আহার্য। তোমরা ছিলে সবচেয়ে হীনাবস্থাসম্পন্ন এবং সবার কাছে প্রত্যাখ্যাত। তোমাদের নিয়ে এই ভয় ছিল যে, পাছে সবাই মিলে তোমাদের সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করে না ফেলে।
মহান আল্লাহ্‌ আমার পিতা মুহাম্মদের মাধ্যমে তোমাদের পরিত্রাণ দান করেছেন। অনেক প্রতিকূলতা পেরিয়ে, অনেক উত্থান-পতন, যন্ত্রণা ও তিক্ততার সম্মুখীন হয়ে এবং পশুসম ভাড়াটে বাহিনী, লোলুপ স্বভাবের নেকড়েতুল্য ও ভয়ঙ্কর হিংস্র প্রকৃতির বিদ্রোহীদের সাথে যুদ্ধ করে তিনি এই সফলতা লাভ করেছেন। বার বার তারা যুদ্ধের আগুন প্রজ্বলিত করেছে আর আল্লাহ্‌ তা নির্বাপিত করেছেন (মায়েদা; ৬৮)।
উঠের পিঠে আরোহণ করে দ্রুত বেগে যেয়ে তাদের গলা চেপে ধরার জন্য রাসুল তাঁর চাচাত ভাই কে নিয়োগ করলেন। আর আলী তাদের মস্তক গুলো পদদলিত না করা পর্যন্ত, আপন তরবারি দিয়ে তাদের অগ্নিশিখা গুলো নির্বাপিত না করা পর্যন্ত কখনও যুদ্ধ ক্ষেত্র থেকে ফেরত আসেনি। আল্লাহ্‌র মাহত্য সমুন্নত রাখার জন্য তিনি কঠোর পরিশ্রম করেছেন। তার ইচ্ছা ও নির্দেশ সমুন্নত রাখার জন্য সর্বদা সংগ্রাম করেছেন। তিনি ছিলেন রাসুলের সবচেয়ে প্রিয় আপনজনতিনি ছিলেন বিশ্বাসীদের নেতা। ন্যায়ের স্বপক্ষে তিনি ছিলেন সদা প্রস্তুত, পরামর্শের ক্ষেত্রে ছিলেন আন্তরিক, আল্লাহ্‌র ইচ্ছা পূরণের লক্ষে ছিলেন সদা সন্ধানী, আল্লাহ্‌র পথে ছিলেন সার্বক্ষণিক অক্লান্ত পরিশ্রমে লিপ্ত এবং অবিশ্বাসীদের অভিযোগ ও অন্যায় আচরণের মুখামুখি হওয়ার জন্য সদা প্রস্তুত।
অথচ, তোমরা উচ্ছৃঙ্খল ভোগ-বিলাসে কাল যাপন করেছ। সবার ধরা ছোঁয়ার বাহিরে থেকে জীবনের আরাম আয়েশ ও সুখ শান্তি উপভোগ করেছ এবং অপেক্ষা করেছ সেই সময়ের যখন দিন আমাদের বিরুদ্ধে ঘুরে দাঁড়াবে এবং সেই দুঃসংবাদ কবে তোমাদের কানে পৌঁছাবে। বিপদের দিনে তোমরা সবসময় দূরে সরে থেকেছ এবং যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালিয়ে গেছ।
যখন আল্লাহ্‌ তার নবীগনের ও প্রিয় বান্দাদের পবিত্র ভূমিতে তার রাসুলের আগমন ঘতালেন তখন বিদ্বেষ, শত্রুতা, ও কপটতা তোমাদের মাঝে মাথাচাড়া দিয়ে উঠল যা ধর্মের পবিত্রতাকে আঘাত করতে শুরু করল। যারা নীরবে অসন্তোষ বয়ে বেড়াচ্ছিল তারা মাথাচাড়া দিয়ে উঠল। অখ্যত কুখ্যত অনেকেই মুখ খুলতে শুরু করল। অবিশ্বাসীরা গাধার ডাকের ন্যায় একে অন্যের সঙ্গে কণ্ঠ মিলাতে শুরু করল এবং তোমাদের সঙ্গে মিলিত হল। শয়তান এই সঙ্গে মাথা তুলে দাঁড়াল এবং তোমাদের আহ্বান জানাল। সে তার ছলনার ও প্রতারণার ডাকে তোমাদের কাছ থেকে দ্রুত সাড়া পেয়ে গেল। সে তোমাদের পদক্ষেপ নেয়ার জন্য উদ্বুদ্ধ করতেও সক্ষম হল। এরপর তোমরা রোষের আগুন জ্বালাতে শুরু করলে এবং ক্রোধের দাবানলে আত্মহারা হয়ে পড়লে। তোমরা অন্যের প্রাণী, অন্যের জলাধার ইত্যাদি জোরপূর্বক ব্যাবহার ও জবরদখল করতে শুরু করলে। এসব যখন ঘতছিল তখনও রাসুলের ওফাতের ঘটনা একেবারেই সদ্য ঘটে যাওয়া একটি বিষয়, যার নিদারুণ ব্যাথা তখনও মানুষের হৃদয় থেকে মুছে যায়নি এবং গভীর ক্ষত এতটুকু প্রশমিত হয়নি। এমনকি রাসুল কে তখনও সমাধিস্থ করা হয় নি।
পাছে কোন সামাজিক অশান্তি সৃষ্টি হয় এই খোঁড়া যুক্তি দাঁর করিয়ে তোমরা তোমাদের এই কাজগুলো অত্যন্ত দৃঢ়তার সংগে সম্পন্ন করে চলেছিলে। কিন্তু এর চেয়ে জঘন্যতম যুক্তি এর কি হতে পারে? সাবধান! তারাই ফিতনাতে লিপ্ত আছে। নিশ্চয় জাহান্নাম কাফিরদের গ্রাস করবে; (তওবা; ৪৯)।
হায়! সত্য পথ থেকে তোমরা কতই না দূরে সরে গিয়েছ! তোমরা এ কোন অপ্রত্যাশিত পথে পা বাড়িয়েছ! পথভ্রষ্ট হয়ে তোমরা এ কোন পথে চলতে শুরু করেছ? মহান আল্লাহ্‌র পবিত্র কুরআন তোমাদের হাতেই রয়েছে। এর ঘোষণা সুস্পষ্ট, এর হুকুম পরিষ্কার, এর পথ নির্দেশনা অত্যুজ্বল, এর বিধি-নিষেধ বিশিষ্ট পূর্ণ এবং এর আদেশ স্পষ্টত প্রতীয়মান। তথাপি তোমরা এই ধর্মগ্রন্থ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছ। তোমরা এ থেকে বিমুখ হতে চলেছ? নাকি তোমরা কোন পৃথক কোন ধর্মগ্রন্থ দ্বারা পরিচালিত হতে চাইছ! হায়, আফসোস!
অত্যাচারীরা পবিত্র কুরআনের পরিবর্তে কতই না নিকৃষ্ট এর আদর্শকে অনুসরণ করতে চলেছে; (ক্বাহাফ;৫০)    
যদি কেউ ইসলামের পরিবর্তে অন্য কোন ধর্মের অনুসরণ করে তবে তা তার নিক্ত কখনই গ্রহণযোগ্য হবে না, পরকালে তারা শুধু ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে; (আল ইমরান- ৮৫)
তোমরা সামান্যতম সময়ের জন্যও অপেক্ষা করোনি এই উষ্ট্রি (খেলাফত) তো নির্দিষ্ট সময়ে আপন পথেই নিজের দায় মুক্ত করত এবং শান্ত হয়ে যেত এবং সর্বসম্মত পথেই চলতে শুরু করত। তারপর তোমরা ফিতনার আগুনে ঘৃতাহুতি দিয়েছ এবং এর জ্বলন্ত অঙ্গারে ইন্ধন জুগিয়ে অগ্নিশিখার বিস্তার ঘটিয়েছতোমরা প্রতারক ও প্রবঞ্চক শয়তানের ডাকে সাড়া দিয়েছ। কারন তোমরা মহান আল্লাহ্‌র পবিত্র ধর্মের দীপ্তিমান আলোকরশ্মি নিভিয়ে দিতে এবং তার নির্বাচিত সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ, তার রাসুলের রেখে যাওয়া নিদর্শন ও সুন্নাত সমূহ মুছে দিতে চেয়েছিলে। দুধের ফেনা সরানোর উসিলায় তোমরা এখন মাখন খেয়ে নিয়েছ। তোমরা গোপন চক্রান্ত ও ছলনার আশ্রয় নিয়ে রাসুলের আহালে বায়াতের ক্ষতি করার পরিকল্পনা প্রণয়ন করেছ। আমরা এসব কিছুই ধৈর্যের সাথে এমন ভাবে সহ্য করে নিয়েছি অথচ খঞ্জরের আঘাতে ছিন্ন বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছি এবং আমাদের অন্ত্রগুলো বর্শার ফলায় বিদ্ধ হয়ে পড়েছে। এখন তোমরা দাবি করছ যে, উত্তরাধিকারী থেকে আমরা বঞ্চিত। তারা কি সেইসব কুসংস্কারাচ্ছন্ন পৌত্তলিকদের অধীনেই শাসিত হতে চায়?
বিশ্বাসীদের জন্য আল্লাহ্‌র চেয়ে শ্রেষ্ঠ বিচারক আর কে হতে পারে; (মায়েদা-৫০)।
তোমরা কি এইসব বিষয়ে অবহিত নও? নিশ্চয় তোমরা জানো? উজ্জল সূর্যের মত এ কথা তোমাদের কাছে সুস্পষ্ট যে আমি হলাম পবিত্র রাসুলের কন্যা। ওহে মুসলমানেরা! উত্তরাধিকার সুত্রে প্রাপ্ত আমার পৈত্রিক সম্পত্তি কি এভাবেই বেদখল হয়ে যাবে?
হে আবু কুহাফার সন্তান (আবু বকর)! আল্লাহ্‌র কিতাবে কি এ কথা লিখা আছে যে তুমি তোমার পিতার উত্তরাধিকারী হতে পারবে আর আমি আমার পিতার ক্ষেত্রে তা হতে পারব না? কতই না নিকৃষ্ট সব পন্থা উদ্ভবন করা হয়েছে; (মারিয়াম-২৭)।
মহান আল্লাহ্‌ এই ধর্মগ্রন্থ কি তোমরা সজ্ঞানে পরিত্যাগ ও উপেক্ষা করছ? পবিত্র এই গ্রন্থেই বলা হয়েছে, “সুলাইমান ছিলেন দাউদের উত্তরাধিকারী”; (আল-নামাল-১৬)। এবং নবী জাকারিয়ার (আঃ) ঘটনা বর্ণনা করার সময় উল্লেখ করা হয়েছে, “তোমার মহিমা আমাকে প্রদান করো এমন একজন প্রতিনিধি যিনি হবেন আমার উত্তরাধিকারী এবং ইয়াকুবের বংশেরও উত্তরাধিকারী”; (মারিয়াম-৫)।
আরও বলা হয়েছে, “আল্লাহ্‌র বিধান অনুসারে রক্তের সম্পর্কযুক্ত আত্মীয় স্বজন অন্যান্যদের থেকে বেশি অগ্রাধিকার পাবে”; (আনাফাল-৭৫)।
সন্তানদের উত্তরাধিকার সম্পর্কে আল্লাহ্‌র নির্দেশ হিসাবে ঐ মহান গ্রন্থে আরও বলা হয়েছে যে, “দুই কন্যার অংশের সমপরিমাণ হবে এক পুত্রের অংশ” (নিসা-১১)।
যদি কেউ ধনসম্পত্তি রেখে মারা যায় তবে ন্যায়পরায়ণতার সাথে তা পিতা মাতা ও নিকট আত্মীয় স্বজনদের মধ্যে অসিয়তের মাধ্যমে দান করে যায়। এটা তাদের কর্তব্য, যারা ঐশ্বরিক বিধানের প্রতি পরিপূর্ণ সজাগ থাকে এবং এর ব্যত্যয় থেকে নিজেদের সুরক্ষিত রাখে; (বাকারা-১৮০)।
তোমরা দাবি করছ যে, আমি আমার পিতার উত্তরাধিকারী নই এবং এতে আমার কোন অংশ নেই। কুরআনে কি আল্লাহ্‌ এমন কোন আয়াত নাজিল করেছেন যার ফলে আমার পিতাকে পূর্বোক্ত বিধান থেকে রহিত করা হয়েছে? নাকি তোমরা বলতে চাও যে, আমরা (রাসুল ও আমি) পৃথক দুই আদর্শ বা বিশ্বাসের অনুসারী এর তাই আমরা একে অপরের উত্তরাধিকারের কোন হক রাখি না? আমি এবং পিতা কি একি গোত্র, বংশ ও আদর্শের মানুষ নই? নাকি তোমরা কুরআনের সাধারন ব্যখ্যা ও বিশেষ তাৎপর্য সম্পর্কে আমার পিতা এবং আমার চাচাতো ভাই আলীর চেয়ে বেশি জ্ঞান রাখ? তাই যদি ভেবে থাক, তবে ফাদক কিংবা খেলাফত কিংবা উভয়ই প্রস্তুত রয়েছে, নিয়ে যাও। তবে মনে রেখো, কিয়ামতের দিন তোমাদের অবশ্যই এর মুখামুখি হতে হবে। সেদিন কতই না উত্তম হবে, ঐ শেষ বিচারের দিন, যেদিন স্বয়ং আল্লাহ্‌ হবেন বিচারক, যিনি সর্বশ্রেষ্ঠ এবং রাসুল হবেন ফরিয়াদি।
সে দিন অবিশ্বাসী ও বিপথগামীরা ক্ষতিগ্রস্থ হবে, সেদিন তাদের অনুতাপ কোন উপকারেই আসবে না; (জাসিয়া-২৭)।
মহান আল্লাহ্‌ প্রতিটি দানের বিপরীতেই রয়েছে আমাদের জবাবদিহিতা ও তার পরিণতি। শীঘ্রই তোমরা জানতে পারবে, কারা সেই দুর্ভাগা অসহনীয় কলঙ্কময় যন্ত্রণা যাদের গ্রাস করবে এবং তারা আল্লাহ্‌র চিরন্তন শাস্তি ভোগ করবে; (হুদ-৩৯)।
হজরত ফাতেমা আনসারদের উদ্দেশে বললেন, হে বীরপুরুষ নেতারা, হে জাতীয় সেনারা, হে ইসলামের রক্ষকেরা, আমার ন্যায্য অধিকারের ব্যাপারে তোমাদের এরূপ অনীহা ও দোদুল্যমানতার কারন কি? এই অন্যায়ের প্রতি তোমাদের সমর্থনের কারন কি? আমার পিতা আল্লাহ্‌র রাসুল কি তোমাদের বলেনি যে, প্রতিটি মানুষকে তার সন্তানের অধিকার ভোগের মর্যাদা দিতে হবে? কত স্বল্প সময়ের ব্যবধানেই না তোমরা সব কিছু বদলে দিয়েছ, কত দ্রুতই না তোমরা পথভ্রষ্ট হয়ে পড়েছ এবং বিচ্যুতির সিকার হয়েছ! অথচ আমার অধিকার প্রতিষ্ঠা ও আমার দাবি আদায়ে যথাযথ শক্তি ও সামর্থ্য তোমাদের রয়েছে। নাকি তোমরা ভাবতে বসেছ যে, মোহাম্মদ ওফাতের সাথে সব কিছুর সমাপ্তি হয়েছে। তাঁর ওফাত নিঃসন্দেহে একটি মহাদুর্যোগসম ঘটনা, অসহনীয় এই কষ্ট-যন্ত্রণা, গভীর এই বিচ্ছিন্নতা। তাঁর অনুপস্থিতি আমাদের ঐকে ফাটল ধরিয়েছে, তাঁর বিয়োগ-ব্যথায় পৃথিবী হয়ে পড়েছে অন্ধকারাচ্ছন্ন, গ্রহ-নক্ষত্র হয়ে পড়েছে শোকাচ্ছন্ন, সূর্য-চন্দ্র হয়ে পড়েছে গ্রাসাচ্ছন্ন, পাহাড়-পর্বতের শির নুয়ে পড়েছে, সকল প্রত্যাশা আজ হতাশায় পরিণত হয়েছে। তাঁর গৃহের পবিত্রতাকে অমান্য করা হয়েছে। তাঁর মহা প্রণয়ের পর যার যার প্রাপ্য সম্মান, শ্রদ্ধা পদদলিত করা হয়েছে। আল্লাহ্‌ শপত! এটাই রাসুলের ওফাত মানুষের জন্য গভীরতম দুঃখের ঘটনা এবং ভয়াবহতম এক যন্ত্রণার কারন। আর কোন কষ্টই এতটা অসহনীয় বা এত বেশি দুর্ভাগ্যজনক নয়।
হে কিলাহ’র(আনসার) সন্তানেরা! তোমরা যারা আমাকে দেখতে ও শুনতে পাচ্ছ, আমার চার পাসে সমবেত হয়ে আছ, আমার আহ্বান  তোমাদের কানে প্রবেশ করছে, তথাপি কি উত্তরাধিকার সুত্রে প্রাপ্ত আমার পিতার সম্পত্তি জবরদখল হয়ে যাবে? এখানে কি ঘটেছে তা তোমরা ভাল করেই জানো। তোমাদের রয়েছে যথেষ্ট জনবল, শক্তি, সম্পদ ও উপায়। তোমাদের হাতে মজুদ রয়েছে যথেষ্ট অস্ত্র সম্ভার। বার বার আমি আহ্বান জানাচ্ছি কিন্তু তাতে তোমরা সাড়া দিচ্ছ না। সাহায্যের জন্য এই আকুল আবেদন জা তোমরা শুনতে পাচ্ছ কিন্তু আমাদের উদ্ধারে এগিয়ে আসছ না। তোমাদের বীরত্ব সুবেদিত এবং অন্যের কল্যাণে এগিয়ে আসাটাও প্রশংসনীয়। তোমরা সেই নির্দিষ্ট গ্রোত্র যাদের পূর্ব থেকেই মর্যাদা প্রদান করা হয়েছে। আহালে বায়াতের পাশে থাকার জন্য রাসুল তোমাদেরই নির্বাচিত করেছেন। তোমরা অবিশ্বাসী আরবদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছ এবং অপরিসীম দুঃখ কষ্ট সহ্য করেছ। তোমরা যুদ্ধবাজ গোত্রগুলোর বিরুদ্ধে অবিরাম লড়াই করেছ এবং সবচেয়ে অনমনীয় মুশরিকদেরও ছত্রভঙ্গ করেছ এবং তাদের পালিয়ে যেতে বাধ্য করেছ। তোমরা কখনও আমাদের অবাধ্য হওনি, আমাদের পাশে থেকে আমাদের নেতৃত্বে ইসলামের বিজয় নিশ্চিত করেছ। জনগণ এর সুফল পেতে শুরু করেছিল। অবিশ্বাসীদের খোঁড়া যুক্তি ধুলায় মিশে গিয়েছিল এবং অন্যায় ও অসত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত তাদের দম্ভের প্রচণ্ডতা নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছিল। ধর্মের প্রতি অবিশ্বাস ও বহু ঈশ্বরবাদ অগ্নিশিখা প্রশমিত হয়ে গিয়েছিল। বিদ্রোহের কণ্ঠস্বর স্তিমিত হয়ে গিয়েছিল ইসলামের বিধান পুরোপুরি প্রতিষ্ঠা হয়েছিল।
আজ তোমরা কেন দ্বিধান্বিত হয়ে পড়েছ? যে সত্য পরিপূর্ণ ভাবে প্রকাশিত হয়েছিল আজ কেন তাকে তোমরা গোপন করছ? এতদূর অগ্রসর হওয়ার পর আজ কেন তোমরা প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করার পথে পা বাড়িয়েছ। ঈমান আনার পর আবার কেন তোমরা শিরকের দিকে ধাবিত হচ্ছ? যারা প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেছিল, রাসুলকে বহিষ্কার সিদ্ধন্ত নিয়েছিল এবং তোমাদের বিরুদ্ধচারন করেছিল তোমরা কি আজ তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে না। কি হল আজ তোমাদের? তোমরা কি তাদের ভয় পাও!
সত্যিকারের মুমিনের জন্য আল্লাহ্‌ ছাড়া এর কাউকে ভয় পাওয়া সমীচীন হবে না; (আত-তাওবা-৩১)।
আজ আমি দেখতে পাচ্ছি যে তোমরা সত্যের পথ থেকে দূরে সরে গিয়েছ। ন্যায্য অধিকারের আলোকে নেতৃত্ব যার প্রাপ্য তোমরা তাঁকে দূরে ঠেলে দিয়েছ। তোমরা আরাম আয়েশ ও সহজলভ্যতার সাথে সমঝোতা ক্রেছাবন দুঃখ কষ্টময় জীবন থেকে পালিয়ে সুখ সম্ভোগের জীবন বেছে নিয়েছ। যে আদর্শ তোমরা লালন ও ধারন করেছিলে তা তোমরা নিজেদের চোখের আড়াল করে দিয়েছ এবং যে সত্য গ্রহণ করেছিলে তা পরিত্যাগ করেছ।
যদি তোমরা এবং বিশ্বের সকলেই অকৃতজ্ঞ হয়ে যাও, তবু আল্লাহ্‌ কারো মুখাপেক্ষী নন এবং তিনি সকল প্রশংসার অধিকারী; (ইব্রাহিম-৮)।
ভুলে যেওনা, আমার যা বলার ছিল তা আমি বলেছি। সবকিছু জেনে শুনেই তোমরা আমাদের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছ। কারন তোমাদের অন্তর গুল এখন ষড়যন্ত্র ও বিশ্বাসহীনতায় পরিপূর্ণ হয়ে গেছে। সত্যি হতাশা ও বেদনা আমাকে এতটাই দহন করছিল যে, নিরুপায় হয়েই আমাকে এসব বলতে হয়েছে, আর তাই তো, দুঃখ ব্যথায় পরিপূর্ণ আমার অন্তরের কষ্ট কিছুটা লাঘব হল। পরিস্থিতির কারনে আমি যে প্রচণ্ড রাগে জর্জরিত ছিলাম তা কিছু তা কম হল। কারন আমি তোমাদের সামনে আমার যুক্তি সংগত দাবি উত্থাপন করতে পেরেছি, অন্যায়ের মুখোস খুলে দিয়েছি এবং সত্য কে উন্মোচিত করেছি, যেন তোমরা কেউ কোনদিন কোন অজুহাত দাঁড় করাতে না পার। অতএব তোমরা যদি এমনই চাও তাহলে এই খেলাফত এবং আর যা কিছু চাও, তা নিয়ে যাও এবং তা আঁকড়ে ধরে থাক। তবে স্মরণ রেখো, তোমাদের জন্য এই খেলাফত বাহন যথার্থই যন্ত্রণাদায়ক প্রমাণিত হবে। কেননা অন্যায় ভাবে দখলের স্থায়িত্ব কখনোই শুভ হয় না। আর পা-দানিগুলো অমসৃণ, এর আসন গর্তে পরিপূর্ণ। আল্লাহ্‌র অনন্ত ক্রোধের চিহ্নাবলি এতে লিপিবদ্ধ করা আছে। অনাদি কলঙ্ক এর অবিচ্ছেদ্য অংশ। আল্লাহ্‌র ক্রোধাগ্নিতে এই প্রজ্বলিত হবে, যা হ্রদয় কে করে দিবে অশান্ত। তোমরা যা কিছুই করো না কেন, সবই আল্লাহ্‌র দৃষ্টির অন্তর্ভুক্ত। যারা মিথ্যার পথে চলছে তারা অতি সত্বরই জানতে পারবে যে কত ভয়াবহ পরিণাম তাদের জন্য অপেক্ষা করছে। আমি তাঁরই কন্যা যিনি তোমাদের এক ভয়াবহ শাস্তির ব্যাপারে সাবধান করে গেছেন।
সুতরাং তোমরা তোমাদের মত কর্মসম্পাদন করতে থাক, আমরা আমাদের মতো চলি। আর অপেক্ষা করো, আমরাও অপেক্ষায় থাকব; (সূরা হুদ-১২১-১২২)।
এরপর আবু বকর (রাঃ) জবাবে বললেন, হে রাসুল কন্যা! নিঃসন্দেহে আপনার পিতা বিশ্বাসীদের জন্য ছিলেন স্নেহশীল, দয়ালু, সান্তনা দাতা ও সহানুভূতিশীল এবং অবিশ্বাসীদের জন্য রয়েছে আল্লাহ্‌র ভয়াবহতম শাস্তি এবং কঠোরতম প্রতিদান। গোত্রীয় বিচারে তাঁকে আমরা আপনার পিতা হিসাবে পাই, অন্য কোন নারীর নয় এবং নিঃসন্দেহে তিনি ছিলেন আপনার স্বামীর ভাই, অন্য কোন সুহ্রদের নয়। রাসুল আলী কে তাঁর ঘনিষ্ঠ সহচর হিসাবে স্থান দিতেন। এবং আলী রাসুলের সকল সংঘাতময় পরিস্থিতিতে সর্বাধিক সমর্থন প্রদান করতেন। আপনাকে যারা ভালবাসতে সক্ষম হয়েছে তারা অবশ্যই আশীর্বাদ প্রাপ্ত ও সৌভাগ্যবান। আর যারা বিরোধিতা করেছে তারা নিঃসন্দেহে অভিশপ্ত ও ধ্বংসপ্রাপ্ত। কারন আপনি রাসুলের পরিবারভুক্ত, যারা সর্বাধিক পবিত্র ও সর্বশ্রেষ্ঠ মর্যাদা সম্পন্ন হিসাবে নির্ধারিত। মঙ্গল ও করুণা প্রাপ্তির ক্ষেত্রে আপনারা (আহালে বাইত) আমাদের জন্য অনুসরণ যোগ্য। আপনারা আমাদের জন্য জান্নাত প্রাপ্তির পুরোধা। আর আপনি, নিঃসন্দেহে নারীদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠা। আপনি সর্বশ্রেষ্ঠ ও সর্বশেষ রাসুলের কন্যা। আপনি যা বলেন তা ই সত্য। জ্ঞানের সর্ব শিখরে আপনার অবস্থান। আপনার অর্জিত অধিকার থেকে আপনাকে বঞ্চিত করার কোন ইচ্ছাই আমাদের নাই এবং আপনার বানীর সত্যতা ও আমরা অস্বীকার করতে চাই না। আল্লাহ্‌র শপথ! আমি আল্লাহ্‌র রাসুলের মত ধারার বিপক্ষে এতটুকু ও অগ্রসর হই নি এবং তাঁর অনুমোদনের বিপরীতে ও কিছু করিনি। নেতৃত্বে অবস্থানকারীরা কখনোই জনগণের সাথে মিথ্যাচার করতে পারে না। আমি মহান আল্লাহ্‌কে সাক্ষ্য মানছি এবং তিনি সাক্ষী হিসাবে যথেষ্ট।
আমি আল্লাহ্‌র রাসুল কে বলতে শুনেছি, আমরা যারা আল্লাহ্‌র রাসুল তারা বংশধরদের জন্য কোন সোনা রুপা রেখে যাই না, না কোন বসত বাটি বা জমি জমা রেখে যাই। আমরা রেখে যাই শুধু ধর্ম গ্রন্থ, এর জ্ঞান ভাণ্ডার, পাণ্ডিত্য আর নবুয়াত। জীবিকা নির্বাহের জন্য অথবা দৈনন্দিন জীবনের বাস্তবিক চাহিদা পূরণের জন্য আমাদের যা কিছু আছে তা শাসকের নিয়ন্ত্রণে থাকবে এবং তিনি প্রয়োজনের আলোকে সেগুলি ব্যবহার করবেন। আপনি যা দাবি করছেন তা আমরা যুদ্ধসামগ্রী ক্রয় করার জন্য সংরক্ষণ করেছি যেন মুসলিমরা আর সাহায্যে ভালভাবে যুদ্ধ করতে পারে, অবিশ্বাসীদের বিরুদ্ধে জিহাদে শরিক হতে পারে এবং যে সকল বিদ্রোহী মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে তাদের পুরোপুরি দমন করতে পারে। এটা আমার একার সিদ্ধন্ত নয়; সকল মুসলমানের সর্বসম্মতিক্রমে এই সিদ্ধন্ত নেয়া হয়েছে। আমি যে সিদ্ধান্ত নিয়েছি তাতে কোন বল বা শক্তি প্রয়োগ করা হয় নি। আর এই দেখুন, এগুলো আমার সম্পত্তি। এখানে যা কিছু রয়েছে সবই আমি আপনাকে দিয়ে দিলাম। আমি এগুলো আপনাদের কাছে কখনো ফেরত চাইব না। এগুলো কারো জন্য সংরক্ষণ করে রাখার দরকার নাই। আপনি আপনার পিতার গোত্রের প্রধান এবং সবচেয়ে অগ্রগণ্য। আপনার বংশধরদের জন্য আপনি বৃক্ষ স্বরূপ এবং শ্রদ্ধেয়জন। আপনি যা বলবেন তা অস্বীকার করার কিংবা নবীকন্যা হিসাবে আপনার সম্মান ও মর্যাদা ক্ষুণ্ণ করব এমন দুঃসাহস আমাদের নাই। আমার ব্যাক্তিগত মতামত যা-ই হোক না কেন, এক্ষেত্রে আপনার সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত বলে গণ্য হবে। কিন্তু আপনি কি প্রত্যাশা করেন যে, এই বিষয়ে আমি আপনার পিতার বক্তব্যের বিপক্ষে অবস্থান নেব?
এর পর ফাতিমা (রাঃ) বললেনঃ
সকল প্রশংসা একমাত্র আল্লাহ্‌র। আবু কুহাফা তোমার বক্তব্য কতই না অযৌক্তিক ও অস্বাভাবিক। আমার পিতা কখনোই পবিত্র কুরআনের সাথে অসঙ্গতিপূর্ণ কোন কিছু বলেননি বা করেননি। তিনি এর নির্দেশেরও কখনো কোন বিরোধিতা করেননি। বরং তিনি পূর্ণ আস্থার সাথে পরিপূর্ণ ভাবে একে অনুসরণ করেছেন এবং এর প্রতিটি পারা ও আয়াত অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছেন। আপনারা কি তবে বিশ্বাস ভঙ্গ করে মিথ্যা উদ্ভাবনের মাধ্যমে অন্যায় ভাবে তাঁকে দোষারোপ করার জন্য একত্র হয়েছেন? তাঁর ওফাতের পর আপনাদের এসব পদক্ষেপ তাঁর জীবদ্দশায় তাঁকে হত্যার চক্রান্তের সাথে সংগতি পূর্ণ মনে হচ্ছে। এখন এই গ্রন্থই আমাদের বিচারক যা সত্য মিথ্যার প্রভেদ সুস্পষ্ট ভাবে তুলে ধরেছে। এখানে {জাকারিয়া (আঃ)সম্পর্কে} বলা হয়েছেঃ
“আমার কাছ থেকে উত্তরাধিকার সুত্রে প্রাপ্ত হবে এবং ইয়াকুবের পরিবার থেকে”; (মারিয়াম-৬)।
আরও বলা হয়েছে,
“সুলায়মান প্রাপ্ত হয়েছিলেন দাউদ থেকে”; (আল-নামাল-১৬)।
আল্লাহ্‌ এভাবেই যার যার প্রাপ্য অংশের সুস্পষ্ট বর্ণনা দিয়েছেন। উত্তরাধিকারীর ক্ষেত্রে কি বিধান হবে তাও বলেছেন। পুরুষ ও নারীর ক্ষেত্রে বণ্টনের পরিমাণ কি হবে তাও বেলেছেন। এভাবেই আল্লাহ্‌ অবিশ্বাসীদের সকল খোঁড়া যুক্তি চূর্ণ করে দিয়েছেন। আগামী প্রজন্মের জন্য এভবেই সকল দ্বিধা দ্বন্ধ ও সন্দেহ দূর করেছেন। নিশ্চয় আপনার বিবেক আপনার সাথে প্রতারনা করছে এবং আপনাকে ভুল পথে পরিচালিত করছে। কিন্তু আমি অত্যন্ত সুচিন্তিত ভাবেই আমার অবস্থান গ্রহণ করেছি।
“তুমি যখন কোন সিদ্ধান্ত আরোপ করো তখন তুমি আল্লাহ্‌র সাহায্য প্রার্থনা করো”; (ইউসুফ-১৮)।
এরপর আবু বকর (রাঃ) বললেনঃ নিশ্চয় আল্লাহ্‌ সত্যের পথে রয়েছেন এবং তাঁর রাসুল ও রাসুলের কন্যাও সত্য কথা বলছেন। নিঃসন্দেহে আপনি জ্ঞান আলোকের সূতিকাগার নেতৃত্ব ও করুণার উৎসস্থল, বিশ্বাসের স্তম্ভ এবং আল্লাহ্‌র চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের প্রস্রবণ ধারা। আমি আপনার যুক্তি অস্বীকার করছি না বা আপনার বক্তব্য প্রত্যাখ্যান ও করছি না। কিন্তু এখানে আপনার ও আমার মাঝে উপস্থিত মুসলমানেরা রয়েছে, যারা আমাকে এই খেলাফতে অধিষ্ঠিত করেছে এবং যে মতামত আমি ব্যক্ত করেছি তা এদেরই সম্মতিক্রমে। কারন আমি নিজের মত বা ধারনা যে নির্ভুল তৎসম্বন্ধে অতিমাত্রায় অনড় স্বভাবের নই কিংবা স্বনির্ধারিত বা স্বেচ্ছাচারী কিংবা স্বার্থ সাধনে ব্যাস্ত এমন প্রকৃতির কোন ব্যক্তি নই। এর এগুলোই আমার স্বপক্ষের যুক্তি।
এরপর ফাতেমা (সাঃ আঃ) বললেনঃ
হে মুসলমানেরা! তোমরা মিথ্যার আশ্রয় গ্রহণ করেছ এবং অতিশয় ঘৃণ্য ও অনিষ্টকর এক কর্মযজ্ঞ দেখেও চোখ বন্ধ করে আছ। তোমরা কি পবিত্র কুরআনকে গভীর ভাবে পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ করো না? নাকি তোমাদের অন্তর গুলো মোহর অঙ্কিত হয়ে গেছে; (মুহাম্মদ-২৪)।
বস্তুত তোমাদের অন্তর গুলো অসৎ কর্মের আতিশয্যে ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে গেছে যা করতে তোমরা অভ্যস্থ; (মুতাফফিফিন-১৪)।
তোমাদের শ্রবণশক্তি ও দৃষ্টি শক্তি গুলো ফাঁদের জালে আটকে গেছে। তোমরা যে সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছ তা অত্যন্ত অনৈতিক ও অধার্মিকতা পূর্ণ। তোমরা চলেছ অসৎ পথে। পারস্পারিক সমঝোতার মাধ্যমে তোমরা বিদ্বেষকে বেছে নিয়েছ। আল্লাহ্‌র শপথ! বেশি ভারী হয়ে উঠবে তোমাদের জন্য এই বোঝা বহন করা এবং ধ্বংস হবে এর শেষ পরিণতি। একদিন সকল পর্দা উন্মোচিত হবে, পর্দার আড়ালে পুঞ্জিভূত সকল দুঃখ কষ্ট, যন্ত্রণা বেদনা, অন্যায় অত্যাচার পরিস্ফুটিত হয়ে পড়বে। সেদিন আল্লাহ্‌র পক্ষ থেকে এর এমন এক প্রতিদান তোমরা পাবে যা তোমরা ধারনাও করতে পারছ না।
যারা মিথ্যার ওপর অটল ছিল তারা সেদিন ধ্বংস প্রাপ্ত হবে; (মুমিন-৭৮)।
ক্ষমা প্রত্যখানঃ
আবু বকর(রাঃ) এবং উমর (রাঃ) আলীর (আঃ) সাহায্যে ফাতিমার (সাঃ আঃ) সঙ্গে সাক্ষাতের অনুরধ করলে ফাতিমা (সাঃ আঃ) অনুমতি দিলেন। তারা ফাতিমা (সাঃ আঃ) সামনে উপস্থিত হলে তিনি অন্য দিকে মুখ ঘুরিয়ে রাখলেন। তাদের কর্মের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করলে ফাতিমা (সাঃ আঃ) প্রশ্ন করলেন আমি তোমাদের রাসুল (সাঃ) এর কিছু কথা বলব, তোমরা কি তা গ্রহণ ও মান্য করবে?
“অবশ্যই” তারা জবাব দিলেন।
ফাতিমা (সাঃ আঃ) বললেন, আমি আল্লাহ্‌র কসম দিয়ে জিজ্ঞাসা করছি, তোমরা রাসুলকে (সাঃ) বলতে শুনেছ, ফাতিমার সন্তুষ্টি আমার সন্তুষ্টি আর ফাতিমার ক্রোধ আমার ক্রোধ। আবার, যে আমার কন্যা ফাতিমাকে ভালবাসে সে পক্ষান্তরে আমাকেই ভালবাসে, যে আমার কন্যা ফাতিমাকে সন্তুষ্ট করে, সে আমাকেই সন্তুষ্ট করে। তোমরা কি শোন নি?
হ্যাঁ, আমরা রাসুল (সাঃ) কে এমনটা বলতে শুনেছি। তারা নিশ্চিত করলেন।
ক্ষিপ্রতার সাথে ফাতিমা (সাঃ আঃ) আবু বকর (রাঃ) ও তার সাথিদের উদ্দেশ করে বললেন, আমি আল্লাহ্‌ ও তার ফেরেশতাদের সাক্ষী করে বলছি যে, তোমরা আমাকে অসন্তুষ্ট করেছ এবং আর কোনদিন সন্তুষ্ট করতে পারবে না। অবশ্যই আমি রাসুলের (সাঃ) সাথে মিলিত হয়ে তোমাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করব। তার পর আরও তীব্র ভাষায় ফাতিমা (সাঃ আঃ) তাদের উদ্দেশ করে বলেন, আল্লাহ্‌র কসম আমি প্রত্যেক নামাজে তোমাদের ওপর আল্লাহ্‌র লানাত প্রদান করব। ফলে আবু বকর (রাঃ) ও উমর (রাঃ) ফাতিমার (সাঃ আঃ) সন্তুষ্টি অর্জন না করেই ফিরে গেলেন।    
হজরত জয়নাব বিনতে আলী (রাঃ), আবু তালেব আত-তাব্রিজি। (পৃষ্ঠা ৭৩-৯৫) 
 
back to top